—দেখুন, একটা কথা শুরুতেই বলে নিই। আপনাদের ভয়ের কোনও কারণ নেই। আমি শুধু কয়েকটা জিনিস জানতে এসেছি। রেশমা যতটুকু জানেন, বললে আমাদের সুবিধে হয় একটা কেসের ব্যাপারে।
রেশমা মুখ তুলছেন না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে মেয়ের হয়ে বাবাই উত্তর দিলেন, ‘ হ্যাঁ হ্যাঁ, বলুন না!’
সুশান্ত এবার সোজা তাকান রেশমার দিকে।
—আপনি গোপাল রায় বলে কাউকে চেনেন?
নামটা উচ্চারণ করা মাত্র শরীরী ভাষা বদলে যায় বছর কুড়ির রেশমার। ফোঁপাতে শুরু করেন। তরুণীর মা-বাবা ততক্ষণে ঘাবড়ে গেছেন মেয়ের রকমসকম দেখে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় দেখাচ্ছে ওঁদের। সুশান্ত একটা চাপা শ্বাস ফেলেন স্বস্তির। ঠিক জায়গাতেই এসেছেন, নিশ্চিত।
কান্নার বেগ ক্রমে বেড়ে চলেছে রেশমার। সুশান্ত বোঝেন, মেয়েটিকে শান্ত করা প্রয়োজন সবার আগে। তাকান সঙ্গে আসা মহিলা কনস্টেবলের দিকে। যিনি সঙ্গে সঙ্গে বুঝে যান, কী করণীয় এখন। এগিয়ে গিয়ে পিঠে হাত রাখেন রেশমার। সুশান্ত মুখ খোলেন ফের।
—রেশমা, আপনি প্লিজ় শুনুন একটু মন দিয়ে। আমরা শুধু জানতে চাইছি, আপনি গোপাল রায় নামের কাউকে চিনতেন কিনা। শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বললেই হবে। আমি কথা দিচ্ছি, এই মামলায় কোনওভাবে আপনার নাম জড়াবে না। কোর্টকাছারির কোনও ঝামেলা থাকবে না। শুধু সত্যিটা বলুন।
রেশমা নিরুত্তর। মা-বাবা স্তব্ধ হয়ে চেয়ে আছেন মেয়ের মুখের দিকে। দমবন্ধ অবস্থা ঘরে। সুশান্তই ফের কথা শুরু করেন।
—গোপাল যে খুন হয়েছে, বডি পাওয়া গেছে কবরখানা থেকে, শুনেছেন নিশ্চয়ই?
ফের কান্নার দমক। এবার আর থামানোর চেষ্টা করলেন না সুশান্ত। পকেট থেকে লাইটারটা বের করে ধরলেন রেশমার সামনে।
—এই লাইটারটা গোপালের পকেট থেকে পাওয়া গেছে। এর উপর সোনার জলে একটা নাম…।
কথা শেষ করতে পারেন না সুশান্ত। লাইটারটা দেখেই মুখ ঢেকে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেন রেশমা। সুশান্ত পরমুহূর্তেই উঠে দাঁড়ান, রেশমার মা-বাবাকে বলেন, ‘আপনারা মেয়েকে একটু ভিতরে নিয়ে যান, একটু শান্ত করুন। তারপর ওর সঙ্গে কথা বলব। আমরা অপেক্ষা করছি। একটা কথা প্লিজ় মনে রাখুন, আমার প্রশ্নগুলোর জবাব দিলেই হবে । আবার বলছি, সরকারিভাবে কোনও ঝামেলায় জড়াতে হবে না আপনাদের মেয়েকে। আপনাদের পরিবারকে। শুধু সত্যিটা বললেই হবে।’
কিছুটা ধাতস্থ হয়ে রেশমা ফের সুশান্তের মুখোমুখি হলেন প্রায় চল্লিশ মিনিট পরে। রেশমার চোখমুখ ফুলে গেছে এরই মধ্যে। বোঝা যাচ্ছে, গত আধঘণ্টা অঝোরে কেঁদেছেন। রেশমার মা-বাবার অবস্থা দেখেও খারাপ লাগে সুশান্তর। দু’জনকেই বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। দেখানোরই কথা। কারও সাতে-পাঁচে না-থাকা ছাপোষা পরিবার এঁদের। সেখানে বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎই এক সন্ধেয় বাড়িতে পুলিশ আসছে। আর মা-বাবা আবিষ্কার করছেন, তরুণী মেয়ের সঙ্গে গোপন প্রেম ছিল এক স্থানীয় যুবকের। যে কিনা খুন হয়ে গেছে কয়েকদিন আগে।
রেশমার বাবা কোনওমতে আমতা-আমতা করে বললেন, ‘আপনার যা জিজ্ঞেস করার আছে, করুন। যা জানে বলবে ও। আমরা জানতাম না এই গোপাল বলে ছেলেটির কথা। এখন জিজ্ঞেস করে মালুম হল।’
রেশমা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়েই বললেন, যতটুকু জানতেন। সুশান্ত যেমনটা আন্দাজ করেছিলেন আমজাদের থেকে খবর পাওয়ার পর, ঘটনাক্রম মোটামুটি তেমনই। রেশমা এবং গোপাল প্রেমে পড়েছিলেন পরস্পরের। প্রেমপর্বের দেখাসাক্ষাৎ হত অত্যন্ত গোপনে এবং কদাচিৎ। দুই পরিবারের কেউই জানতে পারেননি। পাড়াপ্রতিবেশীরাও নয়। রেশমার প্রবল প্রণয়প্রার্থী ছিল নাদিরও। রেশমাকে ‘প্রেমপ্রস্তাব’ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল একাধিকবার। রেশমা সাড়া দেননি। নাদির অবশ্য হাল ছাড়েনি। নানান ছুতোনাতায় মরিয়া চেষ্টা করেই যেত রেশমার মনোযোগ পাওয়ার।
এই নাদির কিছুদিন আগে সন্ধের দিকে এন্টালির ‘জেম’ সিনেমার কাছে একসঙ্গে দেখে ফেলে রেশমা-গোপালকে। পরের সন্ধেতেই টিউশন থেকে ফেরার পথে রেশমার পথ আটকায় নাদির। গোপালের সঙ্গে কিসের এত ভাব ? সরাসরি জবাবদিহি দাবি করে রেশমার কাছে। উত্তেজিত বাক্যবিনিময় হয়।
লাইটারটা গোপালকে উপহার দিয়েছিলেন রেশমাই। তবে তার উপর সোনার জলে ‘রেশমা’ লেখার ব্যাপারটা জানতেন না। মানে, নামটা গোপালই লিখিয়েছিলেন। এবং সযত্নে রেখে দিয়েছিলেন প্রেমের স্মারক হিসেবে।
রেশমাদের বাড়ি থাকে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠার সময় মেজাজটা ফুরফুরে লাগে সুশান্তের। যাক, কেসটা এখন ‘ডিটেকশন’-এর দোরগোড়ায়। খুনের সম্ভাব্য মোটিভ পাওয়া গেছে। নাদিরকে ধরতে পারলে দুইয়ে দুইয়ে চার হওয়া এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
অপেক্ষা স্বল্পস্থায়ীই হল। আমজাদ ঠিকই বলেছিল, ‘লোকাল সেয়ানা’। ‘লোকালিটি’ ছেড়ে পালিয়ে আর কতদিন? ১৭ ফেব্রুয়ারি, দেহ উদ্ধার হওয়ার ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় ধরা পড়ল নাদির। আমজাদ পাকা খবর দিয়েছিল। সন্ধেবেলায় পার্ক সার্কাস স্টেশনে লোক রাখতে বলেছিল সুশান্তকে। ট্রেন থেকে নামতেই চিনিয়ে দিয়েছিল পঁচিশ বছরের নাদিরকে।
স্টেশন থেকে সোজা লালবাজারে নিয়ে গিয়ে জেরা শুরু হয়েছিল নাদিরের। যার বাঁ হাতের তর্জনীতে স্পষ্ট ক্ষতচিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। এটা কী করে হল? শিশুর সারল্য নিয়ে নাদির বলল, এন্টালিতে গাড়ি সারাইয়ের যে গ্যারেজে কাজ করে, সেখানে কিছুদিন আগে টিনের পাতে লেগে কেটে গিয়েছিল। বোঝাই যাচ্ছিল, ডাহা মিথ্যে। তবু নিয়ে যাওয়া হল গ্যারেজে। মিথ্যে ধরা পড়ল। এরপর গুছিয়ে একটা থাপ্পড়, এবং যাবতীয় প্রতিরোধ শেষ।
