স্থানীয় সোর্স যারা আছে, তাদের দিয়ে এখনও পর্যন্ত কাজের কাজ কিছু হয়নি। অশ্বডিম্বই প্রসব করেছে। এমন একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হল, যে একসময় পুলিশের সবচেয়ে দাপুটে সোর্স ছিল মধ্য এবং পূর্ব কলকাতায়, বহু মামলার সমাধানে উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল যার। এই প্রাক্তন সোর্স বেশ কয়েক বছর হল নিজের ছোটখাটো স্টেশনারির ব্যবসা শুরু করেছে ট্যাংরায়। পুলিশের সঙ্গে খবর আদানপ্রদানে নিষ্ক্রিয় অনেকদিন হল, কিন্তু লালবাজারের অনুরোধ বলে কথা। সক্রিয় হল আরেকবার।
সোর্সের আসল নাম উহ্য থাক। নাম ধরা যাক আমজাদ। কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হল আমজাদকে। খবর চাই, ‘মা’ দিয়ে শেষ হচ্ছে তিন অক্ষরের নাম, এমন অবিবাহিতা তরুণী কে কে আছেন গোপালের বাড়ির কাছাকাছি, তপসিয়া-বেনিয়াপুকুর এলাকায়, সে যে ধর্মেরই হন না কেন, যে সম্প্রদায়েরই হন না কেন।
ইংরেজিতে একটা কথা আছে না, ‘ফর্ম ইজ় টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ় পার্মানেন্ট’। সব পেশার ক্ষেত্রেই সারসত্যি এটা। অন্য সোর্সরা খাবি খাচ্ছিল, কিন্তু আমজাদ খবর আনল চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই।
কী খবর? নাম এমন অনেকই আছে। অসংখ্য। সেলিমা, আসমা, আলিমা, রহিমা …। কিন্তু বয়সের হিসেব মিলছে শুধু তিনজনের সঙ্গে। কুড়ি-একুশের অবিবাহিতা তরুণী বলতে পাওয়া যাচ্ছে তিনটে নাম। সালমা হায়দার, ফতিমা জাভেদ আর রেশমা আলি।
সে না হয় হল। কিন্তু স্রেফ একটা আন্দাজের উপর কি আর ওভাবে দুম করে বাড়ি চলে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায় কোনও তরুণীকে? আরও খবর চাই ওঁদের ব্যাপারে। বাড়িতে কে কে আছে, কে কী করেন, পাড়ায় কার কী ধারণা ওদের ব্যাপারে, কারও বিষয়ে প্রেমঘটিত কিছু জানা যাচ্ছে কি না, এইসব।
হোমওয়ার্ক করেই এসেছিল আমজাদ। জানাল, সালমার বিয়ে আগামী এপ্রিলে। সম্বন্ধ করে। প্রস্তুতি শুরু হয়েছে পাত্র-পাত্রী উভয় পক্ষের পরিবারেরই। কোনও জটিলতার খবর নেই। ফতিমা যথেষ্ট উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে। কলকাতার অভিজাত কলেজে ইংরেজি অনার্স পড়ছে। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রেমঘটিত কিছু জানা যাচ্ছে না।
—আর রেশমা?
—এই রেশমার কিন্তু গল্প আছে স্যার। নাদির বলে ট্যাংরায় একটা ছেলে আছে। এই পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়স হবে। একটা গ্যারেজে মেকানিকের কাজ করে। খুচরো মস্তানির জন্য বছরখানেক আগে তপসিয়া থানা অ্যারেস্ট করেছিল। ‘কষ’ আছে চেহারায়। হেবি লম্বা-চওড়া।
সুশান্ত শুনতে থাকেন নিশ্চুপ। বলতে দেন আমজাদকে। গড়পড়তা সোর্সদের স্বভাব জেনে গিয়েছেন এতদিনে। আসল খবরে আসতে সময় নেয় ইচ্ছে করে। সুতো ছাড়ে ধীরে ধীরে। কিন্তু এই আমজাদ অন্য গোত্রের। ধান ভানতে শিবের গীতের গল্প করে না। পয়েন্টে আসে চট করে।
পয়েন্টে এল। এবং শুনে সুশান্ত উত্তেজনার ওম টের পেলেন শরীরে। আমজাদ বলল, ‘এই নাদির সাত তারিখ বিকেল থেকে মহল্লায় নেই স্যার। কোথায় কেটে গেছে বাড়ির লোকও বলতে পারছে না। বাড়িতে শুধু বলে গেছে, নতুন চাকরির খোঁজে কলকাতার বাইরে যেতে হবে। যে গ্যারেজে কাজ করে, তার মালিকও কিছু জানে না। এই নাদিরের সঙ্গে রেশমা বলে মেয়েটার হেব্বি বাওয়াল হয়েছিল হপ্তাদুয়েক আগে। চার নম্বর ব্রিজের কাছে।’
—রেশমার বাড়িতে কে কে আছে?
—আব্বু-আম্মা আর ছোট ভাই। আব্বুর জুতোর দোকান আছে একটা ছোট। রেশমা কলেজে পড়ে। ওর ভাই স্কুলে।
সুশান্ত খবরটা দ্রুত সাজিয়ে নিলেন মাথায়। ময়নাতদন্ত বলছে, খুনটা হয়েছে ৬ বা ৭ তারিখ। ৭ তারিখ বিকেল থেকে নাদির এলাকা থেকে বেপাত্তা। কেন? এই নাদিরের সঙ্গে কিছুদিন আগে রেশমা বলে স্থানীয় তরুণীর ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে। কী নিয়ে ঝগড়া? জানতে হবে। মৃত গোপালের জিন্সের পকেট থেকে পাওয়া লাইটারের শেষ অক্ষর ‘মা’। প্রথম দুটো অক্ষর কি তা হলে ‘রেশ?’ পুরো কথাটা ‘রেশমা’? গোপালের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল এই রেশমার? সেটা নিয়েই ঝগড়া নাদির-রেশমার? প্রণয়ঘটিত ঈর্ষার চেনা বাস, চেনা রুট?
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মুখ খোলেন সুশান্ত।
—নাদিরের খোঁজ লাগা। কোথায় যেতে পারে মনে হয়?
—লোকাল সেয়ানা স্যার। লোকালিটি থেকে পালিয়ে যাবে কোথায়? জাননগরে বাড়ি। পাড়ায় ফিরতেই হবে। আমি লেগে আছি স্যার। পেয়ে যাব।
—হুঁ, রেশমার বাড়িটা একজ়্যাক্টলি কোথায়?
.
তপসিয়া রোড সংলগ্ন একটা গলির মুখে একতলা বাড়ি। বাইরের সাদামাটা রংচটা দেওয়ালে চোখ বুলোলেই বোঝা যায়, এবাড়ির বাসিন্দারা মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত। সুশান্ত যখন একজন এএসআই এবং এক মহিলা কনস্টেবলকে নিয়ে সাদা পোশাকে পৌঁছলেন রেশমাদের বাড়ির সামনে, সন্ধে প্রায় সাড়ে সাতটা।
‘লালবাজার থেকে আসছি, একটু দরকার ছিল’ —শুনেই ঘাবড়ে গেলেন মাঝবয়সি গৃহকর্তা। সুশান্ত আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেন যথাসাধ্য, ‘চিন্তার কিছু নেই। রেশমা কি আপনার মেয়ে?’ এবার চূড়ান্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখায় ভদ্রলোককে, ‘হ্যাঁ, কেন? কী ব্যাপার?’ সুশান্ত বললেন, ‘ব্যাপার সামান্যই। আপনার মেয়ের সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।’
রেশমা বেরিয়ে এলেন। বসার ঘরের সোফায় কুঁকড়ে বসলেন মা-বাবার সঙ্গে। দৃশ্যতই অস্বস্তিতে। সুশান্ত কোনওরকম ভনিতা না করেই শুরু করলেন।
