টিভি-র ‘সিআইডি’-জাতীয় জনপ্রিয় ক্রাইম সিরিজ় হলে হয়তো দেখা যেত, ‘মা’ দিয়ে শেষ হচ্ছে, এমন তিন অক্ষরের নামের যত তরুণী আছেন শহরে, তার তালিকা ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তৈরি করে ফেলছেন তদন্তকারীরা। এবং তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে দ্রুত চিহ্নিত করে ফেলছেন মৃতের প্রেমিকাকে। কিন্তু কল্পনা কল্পনায় থাকে। বাস্তব বাস্তবেই। ওভাবে ‘রিল লাইফে’ হয়। ‘রিয়েল লাইফে’ নয়।
ডাক পড়ল স্থানীয় সোর্সদের। গোপালের ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে খুঁটিনাটি খবর চাই। আর খবর! ঘটনার আটচল্লিশ ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পরও সোর্সরা জানাতে পারল সেটুকুই, যেটুকু হয় জানাই ছিল, বা আন্দাজ করা যাচ্ছিল। একুশ বছরের গোপালের পড়াশুনো বেশিদূর হয়নি। কুরিয়ার সার্ভিসের ‘ডেলিভারি বয়’-এর সামান্য চাকরি। রোজগারও সামান্যই। মধ্যবিত্ত পরিবার গোপালদের। দুই দাদা, তাদের পরিবার, আর মা-বাবা। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর সুযোগ ছিল না গোপালের। নেহাতই ছাপোষা দিনযাপন। কোনও বান্ধবীর সন্ধান? জানা যাচ্ছে না এখনও।
সুশান্ত একটু হতাশই হয়ে পড়ছিলেন। তদন্ত কতটা এগোল, ডিসি ডিডি ঘণ্টায় ঘণ্টায় ‘মনিটর’ করছেন, খোদ নগরপাল খোঁজ নিচ্ছেন দৈনিক। অথচ ওই লাইটারেই এখনও আটকে আছে যা কিছু। আটকে যে থাকবে না বেশিদিন আর, তদন্তের গাড়ি হঠাৎই যে চলতে শুরু করবে গড়গড়িয়ে, দেহ উদ্ধারের তিনদিন পরে সকালে লালবাজারে ঢোকার সময়ও ভাবতে পারেননি সুশান্ত।
ডিডি বিল্ডিংয়ে ঢোকার মুখেই দেখা ওসি ওয়াচ-এর সঙ্গে। গোয়েন্দা বিভাগের অভিজ্ঞ অফিসার। দারুণ চালান ‘ওয়াচ সেকশনটা’, যার কাজ মূলত শহরের পকেটমারদের উপর নজরদারি এবং গ্রেফতার। সুশান্তকে খুবই পছন্দ করেন ভদ্রলোক। চোখাচোখি হতেই পিঠে হাত রাখলেন, ‘কী রে, কী খবর?’
সুশান্ত ম্লান হাসেন, ‘চলছে স্যার।’
ওসি ওয়াচ একটু থমকান। তাকান সুশান্তর মুখের দিকে, ‘চলছে মানে? তোর বয়সে তো দৌড়নোর কথা। ওই কবরখানার কেসটা নিয়ে চাপে আছিস বুঝি? কিছু হল ওটার?’
সুশান্ত মাথা নাড়েন।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে প্রবীণ ফের পিঠে হাত রাখেন নবীনের, ‘আরে, হবে হবে। অত তাড়াতাড়ি ধৈর্য হারালে চলে? এই দ্যাখ না, একটা পিকপকেট গ্যাং মাথা খারাপ করে দিয়েছিল গত দেড় মাস ধরে। রোজ ঝাড় খাচ্ছিলাম ডিসি-র কাছে। অপারেট করছিল শিয়ালদা স্টেশন চত্বরে। প্রতি সপ্তাহে অ্যাট লিস্ট দুটো করে পিকপকেটের কেস। নতুন গ্যাং। হদিশই পাচ্ছিলাম না। গতকাল বিকেলে ফাইনালি ধরা পড়েছে।’
সুশান্ত পকেটমার ধরার বৃত্তান্তে উৎসাহ পাচ্ছিলেন না তেমন। এমনিতেই মনটা দমে আছে। তবু কৃত্রিম কৌতূহল দেখাতেই হল, ‘দারুণ খবর স্যার। নতুন গ্যাং?’
‘আর বলিস না! নতুন গ্যাং-ই। দুটো মেয়ে। মহিলাদের চট করে কেউ পকেটমার বলে সন্দেহ করে না। সেটার অ্যাডভান্টেজ নিচ্ছিল। গীতা নস্কর আর উইলমা ফার্নান্ডেজ। বাড়িতে সার্চ করে অনেক রিকভারি হয়েছে। পিক আওয়ার্সে শিয়ালদা স্টেশন থেকে বেরনোর ভিড়ের মধ্যে মিশে গিয়ে কাজ সারত।’
সুশান্তকে বলতেই হয়, ‘কনগ্র্যাচুলেশনস স্যার।’
ওসি ওয়াচ ঢুকে পড়েন নিজের ঘরে। আর সুশান্ত হাঁটা দেন নিজের অফিসের দিকে। একটু পরেই ডাক পড়বে ওসি হোমিসাইড-এর ঘরে। জানতে চাওয়া হবে মামলার অগ্রগতি। কী বলবেন? এই তো শুনলেন, একটা পকেটমার গ্যাং ডিটেক্ট করতেই দেড় মাস লেগে গেল ‘ওয়াচ সেকশন’-এর। আর খুনটা তো হয়েছে এই সেদিন। সময় লাগবে না একটু?
আত্মপক্ষ সমর্থনে সাজানো যুক্তিগুলো সুশান্তের নিজেরই নড়বড়ে লাগছিল। অপরাধের গুরুত্ব বিচারে পকেটমারির সঙ্গে এই ধরনের সাড়া ফেলে দেওয়া খুনের কোনও তুলনা হয়? পিকপকেটের তুলনায় খুন নিয়ে কর্তারা বেশি মাথা ঘামাবেন, স্বাভাবিক। চাপ তো আসবেই দ্রুত সমাধানের। হইচই তো কম হচ্ছে না।
সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ নড়েচড়ে বসলেন সুশান্ত। নামদুটো কী যেন বললেন ওসি ওয়াচ? গীতা আর উইলমা। উইলমা? নামটা চার অক্ষরের অবশ্য, কিন্তু ‘মা’ দিয়ে শেষ। খ্রিস্টান নাম। লাইটার উদ্ধারের পর ‘প্রতিমা-সুরমা-তনিমা’ ইত্যাদিই মাথায় এসেছিল। কিন্তু এমন তো হতেই পারে, গোপালের সঙ্গে ভিন্ন ধর্মের কোনও তরুণীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। বেনিয়াপুকুর-তপসিয়া এলাকায় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরই সংখ্যাধিক্য। এই অ্যাঙ্গলে ফের একবার খোঁজখবর করলে হয় না? আলোর রেখা যখন দূরবিন দিয়েও দেখা যাচ্ছে না, অন্ধকারে ঢিল ছুড়তে ক্ষতি কী আর?
সুশান্ত আলোচনা করলেন ওসি হোমিসাইডের সঙ্গে। তিনি আইডিয়াটা শুনে বললেন, ‘দেখা যেতেই পারে খোঁজ নিয়ে। তবে একটা কথা বলি। তুমি আগে থেকে ধরেই নিচ্ছ, গোপালের বান্ধবী ওর থেকে ছোট হবে বয়সে বা সমবয়সি। বা দু’-এক বছর বড়। এমনও তো হতে পারে, উনি গোপালের থেকে দশ-বারো বছরের বড়। এবং কে বলতে পারে, হয়তো বিবাহিতাও। হয়তো স্থানীয় নন। হয়তো থাকেন গোপালের বাড়ি থেকে বহু দূরে। হয়তো কলকাতার বাইরে। অসম্ভব বা খুব অস্বাভাবিক কিছু কি?’
সুশান্তকে হতোদ্যম দেখায়, ওভাবে ভাবলে তো খোঁজার কোনও শেষ নেই স্যার। সেই খড়ের গাদায় সূচ খোঁজাই তো হল!’
ওসি হোমিসাইড থামিয়ে দেন সুশান্তকে, ‘আরে আমি একবারও বলছি না, তোমার আইডিয়াটা খারাপ। আমি শুধু পসিবিলিটিজ়গুলোর কথা বলছি। আগে থেকে কিছু প্রিজ়িউম না করতে বলছি। তবে আই এগ্রি উইথ ইউ, ডেফিনিট লিড যখন পাওয়া যাচ্ছে না, ট্রায়াল অ্যান্ড এরর মেথডে যাওয়া যেতেই পারে। লাগল তো লাগল, না লাগল তো না লাগল। ফোকাসটা ন্যারো করে এনেই চেষ্টা করো। স্থানীয় তরুণী এবং আনম্যারেড—টার্গেট বেস এটাই রাখো আপাতত। সার্কলটা এর থেকে বড় করা মানে ওই যেমন বললে, খড়ের গাদায় সূচ…। লাভ নেই।’
