কাজ শুরুর আগে প্রথামাফিক ড. বসু বললেন শাহ্জামলকে, ‘বডির জামাকাপড় ভাল করে দেখে নিয়েছেন তো?’ উদ্ধারের পর দেহ যদি প্রাথমিকভাবে অজ্ঞাতপরিচয় থাকে, খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে হয় মৃতের পোশাক-আশাক। বিশেষ করে ‘tailoring mark’। রেডিমেড কেনা পোশাক হলে আলাদা কথা, কিন্তু পোশাক যদি বানানো হয় মাপজোক দিয়ে কোনও টেলর-এর দোকান থেকে, পরিধেয়র কোনও একটা জায়গায় সেই দোকানের নাম সেলাই করা থাকে সাধারণত। সেই চিহ্ন দেখে সংশ্লিষ্ট দোকানে গিয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর করে মৃত অজ্ঞাতপরিচয়ের পরিচয় জানা যায় হামেশাই। এক্ষেত্রেও দেখা হয়েছিল দেহ উদ্ধারের পর। পাওয়া যায়নি কোনও ‘টেলরিং মার্ক’। পকেটেও পাওয়া যায়নি কিছু। তা ছাড়া, ময়নাতদন্ত শুরু হচ্ছে যখন, ততক্ষণে থানা মারফত মৃতের পরিচয় জেনে গিয়েছেন শাহ্জামল।
তবু কী মনে হল শাহ্জামলের, বললেন, ‘দেখা হয়েছে, স্যার, আরেকবার দেখে নিচ্ছি না হয়…।’
প্রাক্-পোস্টমর্টেম মৃতদেহকে খুঁটিয়ে দেখায় একটা বড় ভূমিকা থাকে সরকারি হাসপাতালের ডোমেদের। যাঁদের সক্রিয় সাহায্য ছাড়া কোনও ময়নাতদন্তই হওয়ার নয়। অস্বাভাবিক মৃত্যুর কতশত দেহ আসে সরকারি হাসপাতালে। সেই দেহগুলি ডাক্তারবাবুর টেবিলে কাটাছেঁড়ার জন্য পৌঁছনোর আগে পর্যন্ত ডোমেদের কাজ থাকে বহুবিধ। ফের গোপালের পোশাক নেড়েচেড়ে দেখার সময় এমনই একজন ডোমের নজরে এসেছিল ব্যাপারটা, শাহ্জামলকে বলেছিলেন দেহকে বিবস্ত্র করার সময়, ‘স্যার, প্যান্টের এই জায়গাটা একটু কেমন যেন ফোলা লাগছে।’
কোন জায়গাটা? এমনিতে সাদা চোখে জিন্সের পকেটে কিছু নেই। কিন্তু ভাল করে হাতড়ে দেখলে একটা জায়গা সত্যিই একটু ফোলা লাগছে। শাহ্জামল দেখলেন মন দিয়ে এবং দ্রুত আবিষ্কার করলেন পকেটের ভিতর আলগাভাবে সেলাই করা আরেকটা ছোট পকেট। সেলাইটা ছিঁড়ে গেল হাতের আলতো টানেই। পকেটের ভিতরের পকেট থেকে বেরল ছোট্ট লাইটার একটা।
আরে, প্রথমবারের চেকিংয়ে কীভাবে মিস হয়ে গেল এটা? শাহ্জামল হামলে পড়লেন লাইটারটার উপর। যাতে দেখা যাচ্ছে সোনার জলে লেখা একটা অক্ষর। উঠে গেছে কিছুটা। কিন্তু পড়া যাচ্ছে। ‘মা’।
এই বয়সের যুবকের জিন্সের পকেটে আলাদা সেলাই করে লুকিয়ে রাখা লাইটারে ‘মা’? লাইটারটা আরও মন দিয়ে দেখলেন শাহ্জামল, দেখালেন ড. বসুকেও। সাদা চোখেই দিব্যি বোঝা যাচ্ছে আরও দুটো অস্পষ্ট অক্ষরের ছাপ। অপটু হাতের সোনার জলের কাজ। মোট তিনটে অক্ষর লেখা ছিল লাইটারে। প্রথম দুটো অক্ষর উঠে গেছে। পড়ে আছে ‘মা’।
ময়নাতদন্তের পর ড. বসু জানালেন, মৃতের হাতের তালুর ক্ষতচিহ্নগুলি ‘defensive wounds’, আক্রমণ প্রতিরোধ করতে গিয়ে পাওয়া আঘাত। প্রাথমিকভাবে যা আন্দাজ করেছিল পুলিশ, ডাক্তারবাবু সহমত হলেন তাতে। ‘আততায়ী’ নয়, সম্ভবত ‘আততায়ীরা’। গোপাল-হত্যার নেপথ্যে এক নয়, আছে একাধিক। খুন হওয়ার সম্ভাব্য সময়? খুব সম্ভবত দিন চার-পাঁচ আগে। মানে ৬ বা ৭ ফেব্রুয়ারি।
ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের উপর এই মামলার তদন্তভার ন্যস্ত হওয়ারই ছিল। দেহ উদ্ধারের দিনদুয়েকের মধ্যেই ডিডি-কে দায়িত্ব দিলেন নগরপাল। গোয়েন্দাবিভাগের হোমিসাইড শাখার তরুণ সাব-ইনস্পেকটর সুশান্ত ধর (বর্তমানে গোয়েন্দাবিভাগেরই অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার) নিযুক্ত হলেন তদন্তকারী অফিসার হিসেবে।
কে খুন হয়েছেন, জানা আছে। আর আছে খুন হওয়া ব্যক্তির পকেটে পাওয়া একটা লাইটার, যাতে তিন অক্ষরের একটা নাম লেখা ছিল সোনার জলে। শেষ অক্ষর, ‘মা’। ওই তিন অক্ষরের নামটা যে মৃত গোপালের প্রেমিকার, সেটা আঁচ করতে আইনস্টাইনের মেধার দরকার হয় না। দিদি বা বোনস্থানীয় কারও দেওয়া উপহার হলে ওভাবে লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন হত না।
লাইটারটা প্রেমিকা উপহার দিয়েছিলেন, নাকি নিজেই কিনে নাম লিখিয়েছিলেন গোপাল, সেটা পরের কথা। জরুরি কথা হল, এই প্রেমের কথা বাড়ির লোককে গোপাল কোনওমতেই জানতে দিতে চাননি বলেই জিন্সের মধ্যে অত সন্তর্পণে সেলাই করে লুকিয়ে রাখা।
বাড়ির লোক সত্যিই জানতেনও না। গোপালের পরিবারের প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করা হল বিস্তারিত, কোনও বান্ধবী, কোনও প্রেমিকার কথা জানতেন? টের পেয়েছিলেন কোনওভাবে কিছু? একই উত্তর এল মা-বাবা-দাদাদের কাছ থেকে, ‘না, তেমন কিছু তো শুনিনি! কিছু যদি থেকেও থাকে, আমরা জানতাম না।’
যে কুরিয়ার সংস্থায় কাজ করতেন গোপাল, তার কর্মীদের সঙ্গেও কথা বলা হল। পাড়ায় যে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে মাঝেমাঝে সময় কাটাতেন বলে জানা গেল, তাঁদের সঙ্গেও কথা বললেন সুশান্ত-শাহ্জামল। নিটফল শূন্য। ওঁরাও কিছু জানেন না।
পরিবার-পরিজন বা বন্ধুবান্ধব, কেউ কিছু জানতেন না বলে তো আর লাইটারটা মিথ্যে হয়ে যায় না। ‘ক্লু’ বলতে ওই লাইটার ছাড়া আর আছেটা কী? সুশান্ত ঠান্ডা মাথায় ভাবতে বসলেন। শেষ অক্ষর ‘মা’, এই দিয়ে তিন অক্ষরের কী কী নাম হতে পারে মেয়েদের? তনিমা, প্রতিমা, চন্দ্রিমা, অণিমা, পরমা, সরমা…. ভাবতে বসলে এমন অজস্র-অগুনতি। একপ্রকার তো খড়ের গাদায় সূচ খোঁজাই। হয় নাকি ওভাবে?
