ওসি মোবাইলে ধরলেন ডিসি ইএসডি (ইস্টার্ন সাবার্বান ডিভিশন)-কে, ‘স্যার, মল্লিকবাজারের কবরখানায় একটা বডি পাওয়া গেছে। পি.ও দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ক্লিয়ার কেস অফ মার্ডার। মেরে পুঁতে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু গর্তটা খুবই শ্যালো খুঁড়েছিল। পা বেরিয়ে এসেছে। হোমিসাইডকে এখনই খবর দেওয়া দরকার।’
নিজে ঘটনাস্থলে রওনা দেওয়ার আগে ডিসি ডিডি (ডেপুটি কমিশনার, ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট, কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দাপ্রধান)-কে ফোনেই ব্রিফ করলেন ডিসি ইএসডি, ‘আমি স্পটে যাচ্ছি স্যার। ওসি হোমিসাইডকে একটু বলে দিন। ফোটোগ্রাফার, ফরেনসিকস…।’
লালবাজার থেকে ওসি হোমিসাইড সদলবলে স্পটে চলে এলেন দ্রুতই। ফোটোগ্রাফার ছবি তুললেন নানান অ্যাঙ্গল থেকে। মাটি খুঁড়ে মৃতদেহ তোলা হল উপরে। জল দিয়ে ভাল করে ধোয়ামোছার পর স্পষ্ট হল দেহের অবয়ব। বছর কুড়ি-বাইশের এক যুবক। গলায় গভীর ক্ষতচিহ্ন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে যেমন হয়। হাতের তালুতেও ক্ষতচিহ্ন একাধিক। মুখের ডানদিকটা থেঁতলে গিয়েছে অনেকটা। ওই সিমেন্টের স্ল্যাব দিয়ে মুখে আঘাত করে চেহারাটা বিকৃত করে দিতে চেয়েছিল খুনি বা খুনিরা। পোশাক বলতে জিন্স আর ফুলহাতা সোয়েটার। তার নীচে স্যান্ডো গেঞ্জি।
তৈরি হল ‘সিজ়ার লিস্ট’। যাতে থাকল খোঁড়া জায়গাটার কাছেই পড়ে থাকা বুটজুতো, লাল-কালো ছোপ লাগা মাটির কিছু অংশ। এবং তার সংলগ্ন ছোপবিহীন মাটির নমুনা কিছু (ফরেনসিক পরিভাষায় যাকে বলে ‘control earth’, যার সঙ্গে দাগ-লাগা অংশের তুলনা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা, দুটি নমুনাই একই জমির কি না। এই প্রমাণ জরুরি বিচারপর্বে)। বাজেয়াপ্ত হল সিমেন্টের স্ল্যাবটাও।
ইতিমধ্যে এসে গিয়েছেন ডিসি ডিডি স্বয়ং। নিজে দাঁড়িয়ে তদারকি করেছেন পুরো প্রক্রিয়ার। সব শেষ করে যখন দেহ তোলা হচ্ছে গোয়েন্দাবিভাগের সিডি (কর্পস ডিসপোজাল) ভ্যানে, বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমেছে। সাড়ে ছ’টা বাজে প্রায়। রাতে আর ময়নাতদন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। পরের দিন দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবেই।
থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেন আর্নল্ড সাহেব। তদন্তের বল গড়াতে শুরু করল। থানার সঙ্গে যৌথভাবে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের হোমিসাইড শাখার অফিসারদের সমন্বয়ে।
বেনিয়াপুকুর থানা। কেস নম্বর ৩২। তারিখ ১০/২/৯৪। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২/২০১ ধারায় মামলা। খুন এবং প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ।
খুন অনেকই হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের কৌতূহল আর আগ্রহের নিরিখে এই খুনটা ছিল একেবারে অন্যরকম। ভরদুপুরে শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত কবরখানা থেকে খুন হওয়া যুবকের দেহ উদ্ধার। যে সময়ের কথা লিখছি, তখন ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সর্বময় উপস্থিতি ছিল না সমাজজীবনে। কিন্তু খবরের কাগজ তো ছিলই। যাতে ফলাও করে প্রচারিত হতে থাকল খুনের বিবরণ এবং পুলিশি তদন্তের সম্ভাব্য গতিপ্রকৃতি। কাজ বাড়ল ক্রাইম রিপোর্টারদের। দ্রুত কিনারা করার চাপও যথানিয়মে বাড়ল পুলিশের উপর।
প্রথম কাজ দেহ শনাক্ত করা। শিকারের পরিচয় পেলে তবেই না শিকারির খোঁজ। কে খুন হলেন জানা গেলে তবেই না ‘কেন-কীভাবে’-র দিকে এগনো। দেহ অজ্ঞাতপরিচয়ের হলে যা প্রচলিত প্রথা, শহরের সমস্ত থানায় বার্তা পাঠানো হল রাত্রেই, কলকাতা এবং তার আশেপাশে কোনও যুবক কি নিরুদ্দেশ হয়েছেন গত কয়েকদিনের মধ্যে? মিসিং ডায়েরি হয়েছে কোনও? উত্তর নেতিবাচক।
ইতিবাচক দিশা মিলল ঘটনার পরের দিন দুপুরে। পার্ক সার্কাস ময়দানে মালির কাজ করতেন এক ভদ্রলোক। তাঁর দুই ছেলে, জ্যোতি রায় এবং রাম রায় বেনিয়াপুকুর থানায় এসে জানালেন, তাঁদের ছোটভাই গোপাল রায় একটি কুরিয়ার সার্ভিস সংস্থায় ডেলিভারির কাজ করে। গত ৬ তারিখ বেরিয়েছিল কাজে। ফেরেনি এখনও। শহরের বাইরে যেতে হয় মাঝেমধ্যে গোপালকে। দু’-তিনদিনের মধ্যেই ফিরে আসে সচরাচর। এবার পাঁচদিন হয়ে গেল, ফেরেনি। কোনও আপদবিপদ হয়নি তো, এই আশঙ্কায় থানায় মিসিং ডায়েরি করতে আসা।
ওসি শুনলেন, এবং ছবি দেখালেন আগের দিন কবরখানা থেকে উদ্ধার হওয়া দেহের। যা একঝলক দেখেই দুই ভাইয়ের কান্না জানিয়ে দিল, খুন হওয়া ব্যক্তি গোপালই। শনাক্তকরণ-পর্ব সম্পন্ন।
সেদিনই বিকেলে নীলরতন সরকার হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শুরু হল গোপালের দেহের। উপস্থিত বেনিয়াপুকুর থানার সাব-ইনস্পেকটর শাহ্জামল মণ্ডল। সরকারিভাবে ডাক্তারবাবুর সই হয়ে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পুলিশের হাতে আসতে সময় লাগে কিছুটা। তাই জটিল মামলায় ময়নাতদন্তের সময় তদন্তকারী অফিসারদের হাজির থাকাটাই রীতি। রিপোর্ট যখন আসার, আসুক। কিন্তু পোস্টমর্টেমের পরেই ডাক্তারবাবুর সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিক জেনে নিতে হয়, কী থাকতে চলেছে রিপোর্টে। তদন্তের গতিপথ নির্ধারণে সুবিধে হয় অনেক।
পোস্টমর্টেম করার কথা হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান, প্রথিতযশা চিকিৎসক ড. রবীন বসুর। যাঁর কাছে মূলত দুটো জিনিস জানার ছিল শাহ্জামলের। এক, খুনের সম্ভাব্য দিন আর সময়। দুই, দেহের আঘাতের সমস্ত খুঁটিনাটি দেখে কী মনে হচ্ছে? খুনি এক, না একাধিক? একজনের পক্ষে সম্ভব বছর পঁচিশের শক্তসমর্থ যুবককে মেরে, মুখ থেঁতলে দিয়ে, মাটি খুঁড়ে এভাবে পুঁতে দেওয়া? থিয়োরিটিক্যালি অসম্ভব নয়। কিন্তু প্র্যাকটিক্যালি?
