কী উত্তর দিতেন পুলিশ সুপার? কী বলতেন ডিআইজি? কী-ই বা বলার ছিল উপস্থিত অফিসার-কর্মীদের? কিছু দৃশ্য থাকে, ভিতরটা একেবারে দুমড়ে-মুচড়ে চৌচির করে দেয়। গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসে আচমকা। কিছু মুহূর্ত আসে, যখন আবেগ অবাধ্যতা করে। এ ছিল তেমন দৃশ্য, তেমন মুহূর্ত। ডিআইজি-এসপি থেকে শুরু করে থানার সেন্ট্রি কনস্টেবল, চোখের জল আটকাতে পারেননি কেউই। চেষ্টাও করেননি।
পুলিশ তো পরে। উর্দি তো পরে। পেশাদার তো পরে। আগে তো মানুষ!
একটু নাটকীয় শোনাল হয়তো শেষ দু’-তিনটে বাক্য। শোনাক।
৪. গোরস্থানে আজও সাবধান
ভোকাট্টা!
খেল খতম ঘুড়িটার। কাটা পড়েছে প্রতিপক্ষ ঘুড়ির মাঞ্জার ধারে। হাওয়ায় পাক খেতে খেতে এলোমেলো নেমে আসছে নীচে। দেখেই লাটাই হাতে ছুট লাগিয়েছিল বারো বছরের অশোক। অনেকক্ষণ জ্বালিয়েছে এই পেটকাটি চাঁদিয়ালটা। এতক্ষণে জারিজুরি শেষ। কেটে গেছে। এবার কাজ বলতে ঘুড়িটাকে ধরা। ওই তো, পড়েছে! ঘুড়িটা তুলে সামনে তাকাতেই হাত-পা অসাড় হয়ে গেল অশোকের। আরে, ওটা কী?
দুটো পা। ভরদুপুরে বেরিয়ে আছে বহু পুরনো কবরের ভিতর থেকে। গাছপালা-ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে ঠিকরে পড়েছে দুপুররোদ। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে পরনের জিন্সের একঝলক। ঘুড়ি-লাটাই ওখানেই ফেলে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট দিল অশোক। থামল গিয়ে সোজা অফিসঘরের কাছে।
‘লছমনচাচা, ও লছমনচাচা!’
দুপুর তিনটে তখন। এই সময়টায় ঘণ্টাখানেক ভাতঘুমের অভ্যেস আছে মধ্যপঞ্চাশের লছমনের। অশোকের চিলচিৎকারে কাঁচাঘুমের দফারফা। চোখ কচলাতে কচলাতে বেরিয়ে এলেন। ধমক দেবেন ভেবেছিলেন, কিন্তু থেমে গেলেন অশোকের চোখমুখ দেখে। হাসিখুশি ছেলেটা ভয়ে কাঠ হয়ে গেছে যেন। লছমন এগিয়ে গিয়ে হাতটা ধরলেন অশোকের, ‘আরে ক্যায়া হুয়া?’
অশোক নিরুত্তর। হাত-পা কাঁপছে ছেলেটার। হাঁফাচ্ছে। চোখমুখ ফ্যাকাশে। লছমন একটু ঘাবড়েই গেলেন এবার। অশোকের কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিলেন, ‘বাতা তো সহি, হুয়া ক্যায়া?’
.
কাহিনি সিকি শতক আগের, ১৯৯৪-এর ফেব্রুয়ারির।
সূত্রপাত, ১৮৪, এজেসি বোস রোডে। মল্লিকবাজারের কাছে খ্রিস্টান কবরস্থানে। প্রায় একশো বিঘে জমির বিস্তারে যার অবস্থান, বহু স্মৃতির ধারক ও বাহক হয়ে। চারদিকে উঁচু দেওয়াল। যার কিছু অংশ ইতিউতি ভাঙা। ভিতরে বড় বড় আম-পাইন-মহুয়া-বট-অশ্বত্থের ছায়ায় শায়িত বহু কবরস্থ শরীর, অনন্ত শান্তিতে। পুরনো সেই দিনের কথায় আগ্রহীরা তো বটেই, এমনিও রোজই এখানে ঘুরতে আসেন দেশি-বিদেশি ট্যুরিস্টরা। এমন জায়গা আর ক’টাই বা আছে কলকাতা শহরে, যার প্রতিটি ইঞ্চি-সেন্টিমিটার-মিলিমিটারে ইতিহাস তার পায়ের ছাপ রেখে গেছে আলগোছে?
প্রবেশদ্বারের পাশেই খ্রিস্টান বেরিয়াল বোর্ডের সেক্রেটারির অফিস। পূর্বদিকে ক্রিমেটোরিয়াল স্ট্রিট, আর তার পাশেই জনবহুল জাননগর বস্তি। সেক্রেটারি সাহেবের অফিসের কাছেপিঠে মালি আর কবরখননকারীদের ছোট ছোট কোয়ার্টার। তাঁদের পরিবারের ছেলেপুলেদের কাছে কবরস্থানের বিস্তৃত প্রাঙ্গণই এক পৃথিবী খুশি। এক কবর থেকে অন্য কবরের আড়ালে লুকোচুরি, আগডুম-বাগডুম, ঘুড়ি ওড়ানো, ভোকাট্টা।
ওই ভোকাট্টা থেকেই শুরু।
শীতের এক বিকেল-ছুঁইছুঁই দুপুরে ঘুড়ি ধরতে গিয়েই কবরস্থানের দীর্ঘদিনের এক কর্মীর কিশোর পুত্র অশোকের চোখে পড়ল ওই অদ্ভুতুড়ে দৃশ্যটা। কবর থেকে বেরিয়ে থাকা দুটো পা। আতঙ্কিত অশোক ছুটে এসে ঘুম ভাঙাল তার ‘লছমনচাচার’। লছমন সিং, যিনি এই কবরস্থানের কর্মী হিসেবে কাজ করছেন প্রায় বছর তিরিশ হয়ে গেল। পড়িমরি করে দৌড়লেন লছমন এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ চোখ পলকের দেখায় বুঝে নিল, বড়সড় গণ্ডগোল আছে কোনও। এখানে কবর দেওয়া বন্ধ হয়ে গেছে সে প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর হবে। তা ছাড়া কবরের মৃতদেহ রাখা হয় মাটির অনেক গভীরে, যাতে কুকুর-শিয়াল নাগাল না পায় আর দেহপচনের দুর্গন্ধও বাইরে না আসে। এ দেহ কবরের নয়। হতেই পারে না! এখনই সেক্রেটারি সাহেবকে খবর দেওয়া দরকার।
‘খ্রিস্টান বেরিয়াল গ্রাউন্ড’-এর সেক্রেটারি টেরেন্স স্ট্যানলি আর্নল্ড অফিসেই ছিলেন। লছমনের মুখে সব শুনলেন। ঘটনাস্থলে এসে দেখলেন এবং কালবিলম্ব না করে দ্রুত অফিসে ফিরেই ডায়াল করলেন বেনিয়াপুকুর থানায়। ওসি-র জিপ মল্লিকবাজারের কবরখানার সামনে এসে ব্রেক কষল আর্নল্ড সাহেবের ফোন পাওয়ার মিনিট পনেরোর মধ্যেই।
দেশ বা বিদেশের যে-কোনও পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যখন তদন্ত-পদ্ধতি বিষয়ে পড়ানো হয়, একটা চ্যাপ্টার তুলনায় বেশি গুরুত্ব পায়। ঘটনাস্থলের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ। পুলিশি পরিভাষায়, ‘একজামিনেশন অফ দ্য পি.ও’। পি.ও, অর্থাৎ ‘প্লেস অফ অকারেন্স’।
ওসি ‘পি.ও’ দেখলেন অনেকটা সময় নিয়ে। কবরখানার দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের দেওয়াল থেকে সত্তর-আশি মিটার দূরে জায়গাটা। নির্জন, শুনশান। একেবারে প্রান্তসীমায়। চট করে নজরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। যে বা যারাই ঘটনাটা ঘটিয়েছে, স্থান নির্বাচনে বুদ্ধি খরচ করেছে যথেষ্ট।
একজোড়া পা যেখান থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে, তার থেকে বেশ কিছু ফুট দূরে জংলা ঘাসজমির উপর ছোপ ছোপ শুকনো লালচে-কালো দাগ। ফরেনসিক পরীক্ষা করলে তবেই বৈজ্ঞানিক শিলমোহর পড়বে, তবে ওই দাগ যে শুকিয়ে আসা রক্তেরই, তাতে প্রাথমিকভাবে কোনও সংশয় ছিল না একাধিক খুনের মামলার তদন্তের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ওসি-র। একটু দূরেই পড়ে আছে একজোড়া কালো বুটজুতো। তার পাশে একটা মাঝারি সাইজ়ের সিমেন্টের স্ল্যাব। তাতেও শুকিয়ে রয়েছে লালচে-কালো দাগ। এটাও রক্ত না হয়ে যায় না। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করতে হবে স্রেফ নিয়মরক্ষার জন্যই।
