সূর্যদের এবং বাবুলালদের ডেরা থেকে বাজেয়াপ্ত হওয়া শাবলে যা ‘tool marks’ ছিল, তার ফরেনসিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছিল, বাড়ির চারতলার কোলাপসিবল গেট আর ওয়ার্কশপের শাটার ভাঙতে ওই শাবলগুলোই ব্যবহৃত হয়েছিল। সুরজিৎ-বিশ্বজিৎ-তাপসকে চিহ্নিত করা যায়নি শনাক্তকরণ প্যারেডে।
মামলার কিনারা হওয়ার পর বিশেষ ‘ট্রায়াল মনিটরিং’ টিম গঠন করেছিলেন পুলিশ সুপার। যে টিমের নেতৃত্বে ছিলেন সুমনজিৎ এবং প্রবীর, সঙ্গে ছিলেন বিচারপ্রক্রিয়ার সম্পর্কে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা আছে, জেলার এমন কিছু অফিসার। টিমের কাজ ছিল চার্জশিট পেশের পর বিচারের প্রতিটি পর্যায়ে প্রতিটি ছোটখাটো বিষয়ে দৈনন্দিন নজর রাখা। উদ্দেশ্য একটাই, পদ্ধতিগত নানা বিলম্বে যেভাবে বছরের পর বছর গড়িয়ে যায় বহু মামলা, এক্ষেত্রে যেন কোনওভাবেই না হয়।
সাপ্তাহিক বিভাগীয় পর্যালোচনা হত বিচার চলাকালীন। প্রতি পনেরো দিন অন্তর ‘স্ট্যাটাস রিপোর্ট’ জমা পড়ত অ্যাডিশনাল এসপি আর এসপি-র কাছে। নিয়মিত বৈঠক হত সরকারি আইনজীবীদের সঙ্গে। বিবাদী পক্ষের সম্ভাব্য স্ট্র্যাটেজি ভোঁতা করে দেওয়ার কলাকৌশল তৈরি হত নিবিড় অধ্যবসায়ে।
ফলও মিলেছিল এত খাটাখাটনির। বিচারপর্ব সম্পন্ন হয়েছিল আশাতীত দ্রুততায়, ব্যারাকপুর দায়রা আদালতের ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্টে। ২০১০-এর ৮ জানুয়ারি রায়দানের দিন ধার্য হয়েছিল। কিছুটা বিপত্তি অবশ্য ঘটে গিয়েছিল রায়দানের সপ্তাহদুয়েক আগে। আসামিদের হাজিরার দিন ছিল ব্যারাকপুর কোর্টে। জেল থেকে আদালতে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় পড়ে ব্যারাকপুর পুলিশের প্রিজ়ন ভ্যান। জোর ধাক্কা লাগে একটা টেম্পোর সঙ্গে। ভ্যানের পিছনের দরজাটা ভেঙে যায়। ডামাডোলের মধ্যে লাফ দিয়ে পালায় গণপত, সতীশ আর বনওয়ারি।
চিরুনিতল্লাশি শুরু হয়েছিল অবিলম্বে। পালাতে হলে রেলপথেই পালাবে, এই আন্দাজে হাওড়া আর শিয়ালদা জিআরপি-কে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল। মেইল করে দেওয়া হয়েছিল পলাতকদের ছবি। দুই স্টেশনে পৌঁছে গিয়েছিল জেলা পুলিশের টিমও। আন্দাজটা মিলে গিয়েছিল সতীশের ক্ষেত্রে। যে ওই রাতেই হাওড়া স্টেশন থেকে দূরপাল্লার ট্রেনে ওঠার আগে প্ল্যাটফর্ম থেকেই ফের গ্রেফতার হয়েছিল। গণপত আর বনওয়ারিকে ধরা যায়নি। অনেক চেষ্টা হয়েছিল ধরার। ফের টিম পাঠানো হয়েছিল ধানুপুরায়। পাওয়া যায়নি। ফেরারই থেকে গিয়েছিল দু’জন।
রায় বেরিয়েছিল নির্দিষ্ট দিনেই। সূর্য গোলদার, রতন তরাই, বাবর আলি মণ্ডল, শ্রীকান্ত দে এবং শিশুপাল-বলবীর-বাবুলাল-সতীশ-ভগবান-প্রেম পালকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছিল আদালত। প্রমাণাভাবে খালাস পেয়েছিল সুরজিৎ দাস, বিশ্বজিৎ মণ্ডল এবং তাপস বিশ্বাস।
রায়ে বিচারপতি লিখেছিলেন, ‘I hold that this case belongs to the rarest of the rare category and death sentence for all the convicts would be the adequate punishment in this case, and they are harmful to the society and the society does not require them any more for their dreadful activities, and if the sentence for life imprisonment is given to them, they would do similar harm against the society in future’.
মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদন করেছিল সাজাপ্রাপ্তরা। উচ্চ আদালতে শাস্তির মাত্রা কমে দাঁড়িয়েছিল যাবজ্জীবন কারাবাসে।
.
ধরা পড়ার পর পুরো গ্যাংটা যখন ছিল চোদ্দোদিনের পুলিশি হেফাজতে, এক সন্ধেয় ডিআইজি প্রেসিডেন্সি রেঞ্জ এসেছিলেন বীজপুর থানায়। সঙ্গে পুলিশ সুপার সহ অন্য পদস্থ আধিকারিকরা। আলোচনা চলছিল কেসটা নিয়ে।
একসময় প্রবীর একটু ইতস্তত করেই বললেন এসপি-কে, ‘স্যার, বিদ্যুৎকে, মানে বিমলবাবুর ছেলেকে একবার থানায় আনা যায়?’ এসপি-র জিজ্ঞাসু দৃষ্টির উত্তরে প্রবীর বললেন, ‘আসলে হয়েছে কী স্যার, ডাকাতরা ধরা পড়েছে, এটা তো বিদ্যুৎও শুনেছে সবার মুখে। বিমলবাবু সকাল থেকে তিনবার ফোন করেছেন। বলছেন, ছেলে বায়না ধরেছে, মা-কে যে লোকটা ধাক্কা দিয়েছিল, আমি দেখেছিলাম। আমাকে দেখাতে নিয়ে চলো।’ একটু থেমে প্রবীর যোগ করলেন, ‘আসলে ছেলেটা এখনও ট্রমার মধ্যে আছে তো… স্কুল যাচ্ছে না। চুপচাপ হয়ে গেছে ঘটনার পর থেকে। লোকটাকে দেখলে যদি মনটা একটু…।’
এসপি এক মিনিট ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘নিয়ে এসো।’
প্রবীর নিজে গাড়ি নিয়ে গেলেন। নিয়ে এলেন আট বছরের বিদ্যুৎকে। সঙ্গে এলেন বিমলও। থানারই একটা ঘরে শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার চটজলদি ব্যবস্থা করা হল। বাবুলালকে দাঁড় করানো হল ঘরটায়। ওই ঘরেরই বাইরে একটা জানালা একটু ফাঁক করে বিদ্যুৎকে দেখানো হল ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকা বাবুলালকে। প্রায় এক মিনিট একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বিদ্যুৎ। তারপরই মুখ ফিরিয়ে নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিমলকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল, ‘ও মা-কে মারল কেন বাবা?’
প্রবীর ওদের দু’জনকে নিয়ে এলেন ওসি-র চেম্বারে। কান্না থামার পর বিদ্যুৎ একটু শান্ত হয়েছে যখন, এসপি বললেন প্রবীরকে, ‘বাবুলালকে নিয়ে আসুন এখানে। আর লাঠি আনুন তো একটা।’ বাবুলাল আসার পর এসপি উঠে গিয়ে বিদ্যুতের কাঁধে হাত রেখেছিলেন। বলেছিলেন, ‘তুমি এই লোকটাকে চাইলে শাস্তি দিতে পারো। এই নাও লাঠি।’ বিদ্যুৎ তাকিয়েছিল এসপি-র মুখের দিকে। লাঠিটা হাতেও নিয়েছিল। তিরিশ সেকেন্ড পর রেখে দিয়েছিল টেবলে। পুলিশ সুপারের হাত চেপে ধরে বলেছিল, ‘তোমরা ওকে জিজ্ঞেস করো, মা-কে ও নীচে ফেলে দিল কেন? মা তো কিছু করেনি! কেন মেরে ফেলল?’ বলে ফের কেঁদে ফেলেছিল অঝোরে।
