অশোক রায়! কই না, তাকে তো এখনো পর্যন্ত দেখিনি!
খোঁজ নে, আমি আসছি। হ্যাঁ ভাল কথা, ক্লাবের প্রেসিডেন্টের খবর কি?
এখনও খবর নিতে পারিনি।
কেউ যেন না সটকাতে পারে। Keep an eye!
হ্যাঁ, সে ব্যবস্থা করেছি।
যাচ্ছি আমি।
ফোন রেখে বের হয়ে এলাম। শ্ৰীমন্ত পাল পার্টিশনের সুইং-ডোরের অল্প দূরেই দাঁড়িয়েছিলেন। এবং ঘরের মধ্যে যাঁরা টেবিলে বসে ড্রিঙ্ক করছিলেন তাঁরা দেখলাম পূর্ববৎ নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। বুঝলাম এ-ঘরের নরনারীদের মধ্যে এখনও দুঃস্বপ্নের ধাক্কাটা এসে পৌঁছয়নি।
কিন্তু সত্যিই অশোক রায়কে তো এতক্ষণ পর্যন্ত আজ এখানে আসা অবধি একবারও দেখিনি। মিত্রা সেন এসেছিল অথচ জোড়ের অন্যটি অশোক রায় আসেননি এ তত হতে পারে না— বিশেষ করে আজ শনিবার। মিত্রা সেনের অনিবার্য উপস্থিতির রাত যখন, তখন অশোক রায়ের আসাটাও অনিবার্য।
বিশেষ করে ঐ সঙ্গে আরও একট কথা মনে পড়ল। মাত্র আগের দিনেই কিরীটীর মুখে শুনেছি মিত্রা ও অশোকের বিবাহের ব্যাপারটা স্থির হয়ে গিয়েছে। সে অবস্থায় আজকের রাত্রে মিত্রা সেন এসেছে অথচ অশোক রায় আসেননি এবং শুধু আসাই নয়, মিত্রা সেন বিষপ্রয়োগে নিহত অথচ অশোক রায় অনুপস্থিত। কথাটা ভাবতে ভাবতেই শ্ৰীমন্ত পালের দিকে এগিয়ে গেলাম।
চলুন মিঃ পাল, প্রেসিডেন্টের ঘরে একবার যাওয়া যাক।
আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদুকণ্ঠে শ্ৰীমন্ত পাল বললেন, চলুন।
ঘর থেকে বের হয়ে অপরিসর প্যাসেজটা দিয়ে পাশাপশি যেতে যেতে আমিই আবার প্রশ্ন করলাম, অশোক রায়কে দেখছি না, তিনি কি আজ আসেননি নাকি?
কই, আমি তো তাঁকে আজ দেখিনি একবারও।
কখন আপনি এসেছেন আজ?
রাত সাড়ে নটার পর।
আপনি যখন হলঘরে এসে ঢোকেন কাকে কাকে দেখেছিলেন সেখানে, মনে আছে?
হ্যাঁ।
মিত্রা সেন তাদের মধ্যে ছিলেন কি?
না। তাকেও দেখিনি।
তবে কে কে ছিলেন তখন হলঘরে?
মহারানী,সুধীরঞ্জন, সুমিত্রা চ্যাটার্জী, নিখিল ভৌমিক, মনোজ দত্ত, সোমেশ্বর আর রমা মল্লিক ছিল।
বিশাখা ছিলেন না?
না, কই! তাকে দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না!
ভাল করে মনে করে দেখুন, আর কাউকে হলঘরের মধ্যে দেখেননি?
আমার বেশ মনে আছে। আর কাউকে তখন হলঘরের মধ্যে দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। পাশাপাশি চলতে চলতেই বললেন শ্ৰীমন্ত পাল।
চলুন একবার প্রেসিডেন্টের ঘরে যাওয়া যাক, বললাম আমি।
চলুন।
সরু প্যাসেজটা ডান দিকে বাঁক নিয়েছে। ডান দিকে ঘুরতেই সামনে একটা দরজা আমার চোখে পড়ল।
দরজার গায়ে একটা সাদা বেকালাইটের প্রেস বাটন আছে দেখলাম।
শ্ৰীমন্ত পালই এগিয়ে গিয়ে দরজার গায়ে প্রেস বাটনটা টিপলেন।
ধীরে নিঃশব্দে আমাদের চোখের সামনে দরজাটা খুলে গেল।
দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ভিতর থেকে আহ্বান শোনা গেল, আসুন।
প্রেসিডেন্ট রাজেশ্বর চক্রবর্তীর গলা।
প্রেসিডেন্টের ঘরের যে দ্বারপথটি সেদিন আমার নজরে পড়েছিল, সেটা ছাড়াও এটি তাহলে ঘরে যাবার অন্য আর একটি দ্বার।
এ ধরনের আরও দ্বারপথ আছে কিনা তাই বা কে জানে!
শ্ৰীমন্ত পালের সঙ্গে সঙ্গে আমি প্রেসিডেন্টের ঘরে গিয়ে প্রবেশ করলাম।
প্রেসিডেন্ট আমাদের দিকে পিছন ফিরে টেবিলের সামনে বসে একতাড়া ভাউচার সই করতে ব্যস্ত ছিলেন।
একটা ব্যাপার ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই লক্ষ্য করেছিলাম। পশ্চাতের দ্বারের পাল্লাটি বন্ধ হবার সঙ্গে সঙ্গে যেন একেবারে দেওয়ালের গায়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। বাইরের থেকে প্রবেশদ্বারটি বোঝা গেলেও আকৃতি ও দ্বারের বৈশিষ্ট্য থেকে ভিতর থেকে সেটা বোঝবারও উপায় নেই। সমস্ত দ্বারপথটি জুড়ে দেওয়ালের গায়ে আঁকা রয়েছে একটি নৃত্যরতা চৈনিক সুন্দরীর নিখুঁত প্রতিকৃতি। বুঝলাম বাইরে থেকে জানা গেলেও ঘরের ভিতর থেকে দ্বারপথটি বোঝবার কোনও উপায় বা চিহ্ন নেই। তা থেকে স্পষ্টই প্রমাণ হয় যে ঐটি একটি গোপন দ্বারপথ।
ভাউচারগুলি সই করতে করতেই পূর্ববৎ চেয়ারে উপবিষ্ট অবস্থায় প্রেসিডেন্ট আমাদের দিকে দৃষ্টিপাত না করেই বললেন,কি খবর শ্রীমন্তবাবু?
শ্ৰীমন্ত পালের দিকে না তাকিয়েই বুঝলাম প্রেসিডেন্ট তাঁকে চিনতে পেরেছেন তা সে যে ভাবেই হোক।
সত্যসিন্ধুবাবু মানে সুব্রতবাবু—
শ্ৰীমন্ত পালের কথা শেষ হবার পূর্বেই চকিতে মুখ তুলে তাকালেন প্রেসিডেন্ট আমাদের দিকে। কালো চশমার অন্তরালে সেই মুহূর্তে তাঁর চোখের দৃষ্টির মধ্যে কি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল না টের পেলেও তাঁর চকিত শিরোত্তোলন ও তাকাবার ভঙ্গী থেকেই বুঝেছিলাম, আমার নামটা তাঁর কানে আকস্মিক ভাবেই প্রবেশ করেছে।
সুব্রতবাবু! সত্যসিন্ধুবাবুর সঙ্গে সুব্রতবাবুর কি সম্পর্ক?
সেই শুভ্রকেশ শান্ত চেহারা।
কথা বললাম এবারে আমিই, আমার নাম ও পরিচয়ের ব্যাপারে আমি গোপনতার আশ্রয় নিয়েছিলাম, মিঃ প্রেসিডেন্ট। তার জন্য আমি দুঃখিত–
গোপনতার আশ্রয় নিয়েছিলেন তার জন্য আপনি দুঃখিত মিঃ সুব্রত রায়! কিন্তু কেন বলুন তো? একটা সুতীক্ষ্ণ শব্দভেদী বাণের মতই যেন প্রেসিডেন্টের শান্ত কণ্ঠ হতে উচ্চারিত প্রশ্নটা আমাকে এসে বিদ্ধ করল।
আপনার সে প্রশ্নের জবাব দেবার আগে আপনাকে একটা দুঃসংবাদ জানাতে চাই মিঃ চক্রবর্তী।
কিন্তু আমার কথার ধার দিয়েও যেন গেলেন না রাজেশ্বর চক্রবর্তী। আপন মনেই বললেন, অজ্ঞাতকুলশীল!! সুধীরঞ্জন is responsible বলতে বলতে টেবিলের গায়ে একটা অদৃশ্য বোম বোধ হয় টিপলেন।
