মৃতের ঝুলন্ত শিথিল মুখখানি ঈষৎ উত্তোলিত হল আমার হাতের মধ্যে। বুঝলাম মৃত্যু বেশিক্ষণ ঘটেনি। এখনও মৃতদেহে রাইগার মর্টিস্ সেট ইন্ করেনি। আমার হস্তপ্ত টর্চের আলোয়, সেই মুহূর্তে উত্তোলিত মুখখানির মধ্যে যেটা আমার দুচোখের প্রখর দৃষ্টির সামনে সুস্পষ্ট হয়ে উঠল, সেটা হচ্ছে মিত্রা সেনের প্রসাধন-চিহ্নিত সমগ্র মুখখানি জুড়ে নীলাভ একটি ছায়া। আর বিস্ফারিত দুটি চক্ষু, ঈষৎ বিভক্ত দুটি ওষ্ঠের প্রান্ত বেয়ে একটি লালা ও রক্তমিশ্রিত কালচে ধারা নেমে এসেছে।
সঙ্গে সঙ্গে আমার নিজের অজ্ঞাতেই যেন মনের ভেতর থেকে কে আমায় বলে উঠল, বিষ! কোন তীব্র বিষেই তার মৃত্যু ঘটেছে!
তীব্র কোন বিষের ক্রিয়াতেই মৃত্যু।
মনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিতটা বোধ হয় অকস্মাৎ মুখ দিয়েই আমার অজ্ঞাতে অস্ফুটে শব্দায়িত হয়ে উঠেছিল : বিষ!
সঙ্গে সঙ্গে দু-তিনজনের কণ্ঠ হতে প্রতিশব্দের মতই যেন দু-অক্ষরের কথাটি উচ্চারিত হয় : বিষ!
হ্যাঁ, বিষেই মৃত্যু হয়েছে। ক্ষীণ অথচ স্পষ্টকণ্ঠে বললাম আমি।
কথা বললে এবারে বিশাখা, আত্মহত্যা! সুইসাইড!
সুইসাইডও হতে পারে, হোমিসাইডও হতে পারে! কথা হচ্ছে, বিষ যখন মৃত্যুর কারণ এবং মৃত্যু যখন সকলেরই আমাদের অজান্তে আকস্মিকভাবে ঘটেছে, এখুনি সর্বাগ্রে আমাদের একটা পুলিসে সংবাদ দেওয়া কর্তব্য।
আমার কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই প্রার চার-পাঁচটি কণ্ঠ হতে যুগপৎ অস্ফুটে উচ্চারিত হল : পুলিস!
হ্যাঁ, পুলিসে এখুনি একটা সংবাদ দিতে হবে বৈকি।
বিশাখা চৌধুরী বললে, পুলিস! পুলিস কেন?
বললাম তো, সাসপিসাস্ ডেস্! আপনারা একজন কেউ যান, পুলিসে একটা ফোন করে দিন। নিকটবর্তী থানা যেটা সেখানে ফোন করলেই হবে।
সকলের মুখের দিকে তাকিয়েই কথাটা আমি বললাম। কিন্তু কারোর মধ্যেই যেন সাড়া পেলাম না।
পরস্পর তারা বারেকের জন্য পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে যেন সকলে নিশ্চল পূর্ববং দাঁড়িয়েই রইল।
বুঝলাম কেউ এগুবে না।
তখন আমিই শ্ৰীমন্ত পালের মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, চলুন শ্ৰীমন্তবাবু, ফোনটা কোনখানে আমাকে দেখিয়ে দেবেন চলুন।
চলুন, বারে ফোন আছে। শ্ৰীমন্ত পাল মৃদুকণ্ঠে যেন অনিচ্ছার সঙ্গেই কথাটা উচ্চারণ করলেন।
স্থানত্যাগের পূর্বে আমি সকলকে সম্বোধন করে বললাম, একটা কথা বলা প্রয়োজন, পুলিস না আসা পর্যন্ত অর্থাৎ তাদের বিনানুমতিতে যেন এখান থেকে বাইরে কেউ যাবেন না।
বাইরে যাব না! অভিনেত্রী সুমিত্রা চ্যাটার্জী প্রশ্ন করলেন আমাকে।
না। এ অবস্থায় পুলিস এসে এখানে না পৌঁছানো পর্যন্ত, বুঝতেই তো পারছেন, এ বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার মধ্যে রিস্ক আছে। যদি শেষ পর্যন্ত মিত্রা সেনের মৃত্যুর ব্যাপারটা সুইসাইড না হয়ে হোমিসাইড প্রমাণ হয়, হয়তো আপনাদের প্রত্যেককেই আলাদা আলাদা ভাবে পুলিসের জবানবন্দির সম্মুখীন হতে হবে। আপনারা তাহলে অপেক্ষা করুন। আমি একটা ফোন করে দিয়ে আসি। আর একটা কথা, মৃতদেহের আশেপাশে কেউ যেন যাবেন না, মৃতদেহ স্পর্শও যেন কেউ করবেন না।
কিন্তু আপনি সত্যসিন্ধুবাবু এত কথা জানলেন কি করে? হঠাৎ মনোজ দত্ত আমাকে প্রশ্ন করলেন।
আমি?
হ্যাঁ—these are all law points! আমি পূর্বে কিছুদিন লালবাজারে স্পেশাল ব্রাঞ্চে চাকরি করেছিলাম।
C. I. D.? অস্ফুট কণ্ঠে বললেন মনোজ দত্ত।
আর নিজের আত্মপরিচয় গোপন রাখা বৃথাই, তাই এবারে স্পষ্টকণ্ঠে জবাব দিলাম, হ্যাঁ মিঃ দত্ত, তবে সরকারী নয়, বে-সরকারী শখের সত্যসন্ধানী আমি। কিরীটী রায়ের নাম শুনেছেন?
কিরীটী রায়! একসঙ্গে সকলের কণ্ঠ হতেই নামটা উচ্চারিত হল।
হ্যাঁ, কিরীটী রায়ের সহকারী আমি সুব্রত রায়।
সে কি! অস্ফুট আর্তকণ্ঠে বললে এবারে বিশাখা চৌধুরী।
তাই বিশাখা দেবী। সত্যসিন্ধু আমার ছদ্মনাম, ছদ্মপরিচয়। আমি সুব্রত রায়। বলেই শ্ৰীমন্ত পালের দিকে এবারে তাকিয়ে বললাম, চলুন মিঃ পাল, we must inform the police!
একটা আকস্মিক বজ্রপাতের মতই যেন আমার সত্যকার পরিচয়টা সমস্ত পরিস্থিতিটাকে বিমূঢ় বিস্ময়ে একেবারে বরফের মতই জমাট বাঁধিয়ে দিয়েছিল।
বিমূঢ় নিশ্চল মানুষগুলোর মুখের দিকে আর না তাকিয়েই এবারে আমি শ্ৰীমন্ত পালকে নিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালাম।
১৩. বারের মধ্যে চার-পাঁচজন নরনারী
বারের মধ্যে চার-পাঁচজন নরনারী টেবিলের সামনে বসে ড্রিঙ্ক করছিল। একপাশে একটা ঘেরা কাঁচের পার্টিশন ভোলা জায়গায় ফোন ছিল। পার্টিশনের মধ্যে ঢুকে সর্বাগ্রে নিকটবর্তী থানায় পরিচিত থানা অফিসার রজত লাহিড়ীকে দুঃসংবাদটা দিয়ে কিরীটীকে ফোনে ডাকলাম।
হ্যালো! কিরীটী রায় কথা বলছি। তারে কিরীটীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
আমি সুব্রত, বৈকালী সঙ্ঘ থেকে বলছি রে।
কি ব্যাপার?
মিত্রা সেন খুব সম্ভবত murdered!
সংবাদটা শুনে কিন্তু অপর পক্ষের কণ্ঠে কোনরূপ বিস্ময় প্রকাশ পেল না। শান্ত প্রত্যুত্তর শোনা গেল : শেষ পর্যন্ত murdered! কিন্তু এতটা ঠিক তো আশা করিনি? নিজের পরিচয় দিয়েছিস নাকি?
হ্যাঁ, এইমাত্র দিলাম।
এত তাড়াতাড়ি! আর একটু পরে দিলেই হত। যাকগে, থানায় সংবাদ দিয়েছিস?
হ্যাঁ, রজত লাহিড়ীকে জানিয়েছি। তিনি এক্ষুনি আসছেন।
অশোক রায় ঐখানেই আছে তো?
