কিরীটী ঘর ছেড়ে চলে যাবার পরও অনেকক্ষণ শিখেন্দু চেয়ারটার উপর স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।
কিরীটী রায়ের কথাই সে ভাবছিল, কি করে মানুষটা জানতে পারল যে সে-ই বাথরুম থেকে অচৈতন্য দীপিকাকে বুকে করে ঘরের মধ্যে নিয়ে এসেছিল!
মুখে স্বীকার না করলেও কথাটা তো মিথ্যা নয়। সে-ই সর্বপ্রথমে তিনতলায় গিয়েছিল, ঘরের দরজাটা খোলা দেখে ভিতরে গিয়ে ঢোকে সোজা। দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ থাকলে কি করত সে জানে না, তবে খোলা পেয়েও তার মনে ঐ মুহূর্তে কোন প্রশ্নই জাগেনি, কেন দরজাটা খোলা রয়েছে! ঘরে ঢুকে ঘরের মধ্যে কাউকে না দেখতে পেয়ে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে ওর নজরে পড়ে বাথরুমের দরজাটা খোলা, ভিতরে আলো জ্বলছে।
কোন রকম চিন্তা বা ইতস্তত না করেই সে গিয়ে বাথরুমে ঢুকেছিল। ঢুকেই য়ে দৃশ্যটা তার চোখে পড়ে, নিবণীতোষের ছোরাবিদ্ধ রক্তাক্ত দেহটার পাশেই দীপিকার দেহটা পড়ে আছে অচৈতন্য।
ঘটনার আকস্মিকতায় ও ভয়াবহতায় সে যেন হঠাৎ বিমূঢ় নিশ্চল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু একটু পরেই তার স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি ফিরে আসে, তখন সে প্রথমে নির্বাণীতোষকে পরীক্ষা করে, সে মৃত দেখে তার পর পরীক্ষা করে দীপিকাকে। সে জ্ঞান হারিয়েছে।
কয়েকটা মুহূর্ত অতঃপর সে ভেবে পায় না কি করবে। তারপর নীচু হয়ে গভীর মমতায় দীপিকার অচৈতন্য শিথিল দেহটা বুকের উপর তুলে নিয়ে শোবার ঘরে এসে ঢোকে। সেই সময়ই সিঁড়িতে পায়ের শব্দ পায়, তাড়াতাড়ি তখন সে দীপিকার অচৈতন্য দেহটা মেঝেতেই নামিয়ে দেয়, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই শিবতোষবাবু এসে ঘরে প্রবেশ করেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, কি ব্যাপার, বৌমা….
একটু থতমত খেয়ে গিয়েছিল শিখেন্দু প্রথমটায়, কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলেছিল, বুঝতে পারছি না কিছু কাকাবাবু, ঘরে ঢুকে দেখি দীপিকা পড়ে আছে।
কিন্তু কিরীটীবাবু সত্যটা অনুমান করলেন কি করে? আগের একটা কথা যা কিরীটীবাবু বলে গেলেন, নির্বাণীতোষের শয়নঘরের দরজাটা খোলা ছিল কেন? সত্যিই তো, কেন খোলা ছিল? স্বাভাবিকভাবে তো বন্ধ থাকারই কথা। তবে কি ক্লান্ত দীপিকা দরজাটা ঘরে ঢুকবার পর তাড়াতাড়িতে বা অন্যমনস্কতায় ভিতর থেকে লক্ করতে ভুলে গিয়েছিল! না, সেই সময়ই সন্দেহজনক কিছু তার চোখে পড়ায় বা শব্দ শোনায় সে দরজাটা লক্ করবার কথা ভাববারও সময় পায়নি!
কিন্তু এ সবই তো গেল যুক্তিতর্কের কথা। হত্যা রহস্যের মীমাংসার ব্যাপারে যুক্তিতর্কের কথা—স্বভাবতই যাকিরীটীবাবুর মত তীক্ষ্ণবুদ্ধি লোকের মনে উদয় হয়েছে, হওয়াটা স্বাভাবিক।
হত্যাকারী কে?
কে হত্যা করল নির্বাণীতোষকে? আর কেনই বা হত্যা করল? নির্বাণী চিরদিনই সাদাসিধে সরল প্রকৃতির মানুষ, কারও সঙ্গে কখনও মনোমালিন্য হয়নি, ঝগড়া বিবাদও করেনি। সবাই তাকে বরাবরই ভালবেসেছে। তবে তাকে এইভাবে হত্যা করল কেন?
সকাল হয়ে গিয়েছে, প্রায় সাড়ে ছটা বাজল।
অফিসঘর থেকে বেরুতেই যতীশ সামন্ত সামনে এসে দাঁড়াল, শিখেন্দুবাবু!
বলুন।
দারোগাবাবু আপনাকে একবার ডাকছেন।
কেন?
বোধ হয় আপনার জবানবন্দি নেবেন।
চলুন।
আপনি যান, কর্তাবাবু ডাকছেন, আমি একবার ওপরে যাব। সামন্ত বললে।
কাকাবাবুকে বলে দেবেন কিরীটীবাবু চলে গেছেন।
আচ্ছা।
শিখেন্দু এগিয়ে গিয়ে পারলারে প্রবেশ করল।
শিখেন্দুকে ঘরে প্রবেশ করতে দেখে বীরেন মুখার্জী মুখ তুলে তাকালেন, আসুন শিখেন্দুবাবু, বসুন।
শিখেন্দু বসল।
বীরেন মুখার্জী প্রশ্ন করলেন, আপনি আর শিবতোষবাবুই মৃতদেহ প্রথমে আবিষ্কার করেন?
হ্যাঁ।
এঁদের মানে শিবতোষবাবুর ফ্যামিলির সঙ্গে আপনার দীর্ঘদিনের পরিচয়,তাই না?
হ্যাঁ, আমি ওঁর বন্ধুর ছেলে।
আচ্ছা, আপনি তো নির্বাণীতোষবাবুর সহপাঠী ছিলেন, তাঁর কোন শত্রু ছিল বলে জানেন?
না।
কখনও কারও সঙ্গে মনোমালিন্য, ঝগড়াঝাঁটি বা মারামারি হয়নি তাঁর?
না।
তবে যে কেন লোকটাকে অমন ক্রুয়েলি হত্যা করা হল বুঝতে পারছি না! কাউকে আপনার এ ব্যাপারে সন্দেহও হয় না?
না।
ব্যাপারটা দেখছি যেমন স্যাড তেমনি জটিল। তারপর একটু থেমে বললেন বীরেন মুখার্জী, মসেস মল্লিক তো কোন প্রশ্নের জবাবই দিলেন না আর দীপিকাদেবী তো মনে হচ্ছে প্রচণ্ড শোকে মেমারিই হারিয়েছেন! ঠিক আছে ওঁরা সুস্থ হয়ে উঠুন, তারপর এক সময় মাসা যাবে। বিশেষ করে দীপিকাদেবীকে আমি কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই। এখন তাহলে মামি উঠব।
একটা অনুরোধ আছে আপনার কাছে মিঃ মুখার্জী। শিখেন্দু বললে।
বলুন?
সংবাদপত্রে যেন ব্যাপারটা না ছাপা হয়। বুঝতেই পারছেন এত বড় একটা ফ্যামিলির প্রেসটিজ
না না—আমরা কিছু বলব না। কিন্তু পাড়াপড়শীরা তো আছে, সংবাদপত্রের নিউজরিপোর্টারদের কি আর কিছু জানতে বাকি থাকবে!
আর একটা কথা—
বলুন?
ডেড বডি কখন পেতে পারি?
বুঝতেই পারছেন তো, ব্যাপারটা মাডার কেস-তদন্ত না হলে তো পাবেন না দেহ। একটু পরেই এসে ডেড বডি নিয়ে যাবে। তবে চেষ্টা করব আজই যাতে পান। শিবতোষবাবুর সঙ্গে তো ডি.সি.-র পরিচয় আছে, তাঁকেই একবার বলতে বলুন না ওঁকে ফোনে। আচ্ছা চলি।
শিখেন্দুরও নিজেকে অতিশয় ক্লান্ত লাগছিল।
সারাটা রাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি, চোখ দুটো জ্বালা করছিল, ঘর থেকে বেরুতেই রাজেনের সঙ্গে দেখা হল।
রাজেন, আমি একবার মেসে যাচ্ছি, ঘণ্টা-দেড়েকের মধ্যেই ফিরব–কেউ খোঁজ করলে বোলো।
