যে আজ্ঞে।
বড় রাস্তায় আসতেই একটা খালি ট্যাক্সি পেয়ে গেল শিখেন্দু। ট্যাক্সিতে উঠে বসে বললে, শিয়ালদার দিকে চলিয়ে সদারজী।
কলেজের কাছাকাছিই সারকুলার রোডের ওপরে একটা মেসেছাত্রজীবন কাটিয়েছে শিখেন্দু। কলেজ-হোস্টেলে কখনও সে থাকেনি। পাশ করার পরও ঐখানেই রয়ে গিয়েছে।
ওরা তিনজনই নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজের ছাত্র।
নির্বাণীতোষ বরাবর বাড়িথেকেই পড়াশুনা করেছে। দীপিকাথেকেছেকলেজেরকম্পাউণ্ডের মধ্যে, লেডিজ হোস্টেলে।
দিন পনের হল তার বাবা বিয়ের ব্যাপারে সপরিবারে দিল্লী থেকে এসে বালিগঞ্জ অঞ্চলেই বাড়ি ভাড়া করে আছেন, ইদানীং দীপিকা সেখানেই ছিল।
হোস্টেলে পাশাপাশি দুটো ঘরে ওরা চারজন থাকে; ও আর সঞ্জীব একটা ঘরে, পাশের ঘরে নির্মল ও পরেশ।
ঘরে ঢুকে দেখে জানলাপথে রোদ এসে পড়েছে, সঞ্জীব তখনও শয্যায় শুয়ে ঘুমোচ্ছে। পাশবালিশটা জড়িয়ে।
সঞ্জীব—এই সঞ্জীব!
শিখেন্দুর ডাকে সঞ্জীব চোখ মেলে তাকাল, কে?
ওহ—ওহ—
বিরক্ত করিস না শিখেন্দু, একটু ঘুমোতে দে। সঞ্জীব আবার চোখ বুজলে।
এদিকে খবর শুনেছিস?
পরে শুনব, সঞ্জীব ঘুম-জড়ানো গলায় কথাটা বলে আবার ঘুমোবার চেষ্টা করে।
ওঠ–শোন্-নির্বাণী মারা গেছে, এই–
সঙ্গে সঙ্গে যেন লাফিয়ে উঠে বসল শয্যার উপরে সঞ্জীব, অ্যাঁ! কি বললি? কে মারা গেছে?
নির্বাণী মারা গেছে, নির্বাণীতোষ মল্লিক।
কি যা-তা জোক্ করছিস এই সকালবেলা! সঞ্জীব বললে।
জোক নয়, সত্যি—হি হ্যাজ বিন ব্লুটালি মাডারড, সঞ্জীব।
মার্ডারড! সঞ্জীব কথাটি বলে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে যেন শিখেন্দুর মুখের দিকে।
হ্যাঁ।
সত্যি–সত্যি বলছিস শিখেন্দু? সঞ্জীব যেন কথাটা তখনও বিশ্বাসই করতে পারছে না।
শিখেন্দু তার খাটের ওপর বসে সঞ্জীবের মুখের দিকেই চেয়ে থাকে। সঞ্জীব চিরকালই পাতলা, বোগা। গায়ের রংটা যেমন টকটকে ফর্সা, মুখখানিও তেমনি সুন্দর, যেন একটা মেয়েলী ছাপ আছে মুখে। পরনে লুঙ্গি, গায়ে একটা গেঞ্জি। চোখেমুখে প্রসাধনের চিহ্ন, ঠোঁটে লিপস্টিকের রক্তিমাভা।
কাল তুই বৌভাতের নিমন্ত্রণে যাসনি? শিখেন্দু জিজ্ঞাসা করল।
কখন যাব! থিয়েটারই তো শেষ হল রাত সাড়ে বারোটায়! বলেই তো ছিলাম, কাল আমাদের পাড়ার ক্লাবে থিয়েটার আছে। বহ্নিশিখা নাটকে আমাকে কল্যাণীর রোল করতে হয়েছে।
পাড়ার ক্লাব মানে পাইকপাড়ায় ওরা দীর্ঘদিন ধরে আছে, মানে ওর বাবা রাধিকা বসু মশাই। ঐ পাড়াতেই সঞ্জীবের জন্ম, পাড়ার ক্লাবের থিয়েটারে ও বরাবর ফিমেল রোল করে এসেছে। মানায়ও ওকে ফিমেল রোলে চমৎকার এবং অভিনয়ও করে খুব ভাল।
সঞ্জীব বলল, অত রাত্রে কেউ কোথাও নিমন্ত্রণ খেতে যায়! তাছাড়া ভীষণ টায়ার্ড লাগছিল, ফিরে এসে দেখ না মুখের মেকআপও ভাল করে তুলতে পারিনি, কোনমতে একটু মেকআপ তুলেই শুয়ে পড়েছি। কিন্তু এইমাত্র তুই যা বললি তা সত্যি!
হ্যাঁ, আমাকে এখুনি আবার স্নান করে বেরুতে হবে। দীপা একেবারে বোবা হয়ে গিয়েছে, বোধ হয় স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে।
হবেই তো, বেচারী! হাউ স্যাড, ফুলশয্যার রাত্রেই!
কি করে মেরেছে বেচারীকে জানিস সঞ্জীব!
কি করে?
একটা ছোরা একেবারে পিঠের বাঁ দিকে আমূল বসিয়ে দিয়েছে।
বলিস কি! কি করে মারল, বাড়িভর্তি লোক ছিল—কে মারল কেউ কিছু জানতেই পারল না!
শিখেন্দু সংক্ষেপে তখন সমস্ত ঘটনাটা বলে গেল।
সঞ্জীব যেন একেবারে হতবাক। বললে, সত্যি আমি যেন এখনও ভাবতেই পারছি না ব্যাপারটা শিখেন্দু।
কেবল তুই কেন, কেউই আমরা ভাবতে পারছি না! নির্মল কোথায়? নির্মলকে ডাক—
সঞ্জীব নির্মলকে নাম ধরে ডাকতেই সে পাশের ঘর থেকে এসে এদের ঘরে ঢুকল। গালে শেভিং ক্রিম লাগান, হাতে সেফটি রেজার, অর্ধেক কামাতে কামাতেই ওদের ডাকে ঘরে এসে ঢুকল, কি ব্যাপার? শিখেন্দু কখন ফিরলি?
নির্বাণীতোষ খুন হয়েছে কাল রাত্রে, জানিস? শিখেন্দু বললে আবার।
খুন হয়েছে—নির্বাণী? কি কি বলছিস তুই শিখেন্দু?
এবারে সঞ্জীবই ব্যাপারটা বললে নির্মলকে।
তুই কাল রাত্রে কখন নির্বাণীদের বাড়ি থেকে চলে এসেছিলি? শিখেই প্রশ্নটা করল।
আ—আমি তো—মানে আমি তো বোধ হয় দশটার পরই চলে এসেছি, তখন তো নির্বাণী প্যাণ্ডেলেই ছিল। নির্মল বলল।
হ্যাঁ, নির্বাণী আগাগোড়াই প্যাণ্ডেলে ছিল। রাত পৌনে এগারটা নাগাদ আমাকে বলল তার বড় মাথা ধরেছে। তাই আমি বললাম, আমাদের বন্ধু বান্ধবরা তো সবাই এসে গেছে, এক সঞ্জীব বাকি; সে এলে আমি খাইয়ে দেবখন, তুই যা, ওপরে চলে যা, শিখেন্দু বলল।
তারপর? সঞ্জীব শুধাল।
নির্বাণী ওপরে চলে যায়।
তারপর?
আর পৌনে বারোটা নাগাদ দীপা ওপরে গিয়েছিল, তারপরেই ব্যাপারটা জানা গেল! শিখেন্দু বলল।
ওঃ! নির্মল বলল।
তাহলে মনে হচ্ছে পৌনে এগারটা থেকে রাত পৌনে বারোটা, ঐ একঘন্টা সময়ের মধ্যেই কোন এক সময় নির্বাণীকে কেউ খুন করে গিয়েছে। সঞ্জীব বলল।
ইতিমধ্যে পরেশও এসে ঘরে ঢুকেছিল এবং সব শুনেছিল, ওরা তিনজন কেউ লক্ষ্য করেনি; হঠাৎ ঐ সময় পরেশ বলল, নির্মল তো অনেক রাত্রে ফিরেছিস, রাত বোধ হয়। তখন সাড়ে বারোটারও বেশী হবে, আমি পৌনে বারোটায় প্রায় শুয়েছি, কিন্তু ঘুমোই নি। দশটার পরই যদি তুই নির্বাণীদের বাড়ি থেকে চলে এসে থাকিস তো তোর ফিরতে এত দেরি হল কেন রে?
বাসে যা ভিড়! নির্মল বলল।
অত রাত্রে বাসে ভিড়! পরেশ কথাটা বলে নির্মলের মুখের দিকে তাকাল এবং বলল, দেখ বাবা, চালাকি করো না, অতক্ষণ কোথায় ছিলে বল।
০৫. পরেশ চিরদিনই ডিটেকটিভ বইয়ের পোকা
পরেশ চিরদিনই ডিটেকটিভ বইয়ের পোকা। ইংরাজী বাংলা কোন ডিটেকটিভ বই-ই সে বাদ দেয় না এবং সুযোগ পেলেই ডিটেকটিভগিরি করে।
