এতক্ষণে যেন শিখেন্দুর কাছে কিরীটীর কথার তাৎপর্যটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেও বলে ওঠে, সত্যিই তো, ঠিকই তো আপনি বলেছেন কিরীটীবাবু, ঘরের দরজাটা তো খোলা থাকার কথা নয়—
অথচ আপনি খোলাই আছে-দেখেছিলেন?
হ্যাঁ।
যাক সে কথা, তারপর ঘরে ঢুকে আপনি কি দেখেছিলেন?
দীপিকা মেঝের ওপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।
না।
কি বলছেন?
বলছি এই যে, দীপিকাদেবী ঘরের মেঝেতে পড়ে ছিলেন না।
তবে কোথায় ছিল সে? কথাটা বলে কেমন যেন একটু বোকার মতই চেয়ে থাকে শিখেন্দু কিরীটীর মুখের দিকে।
বাথরুমের মধ্যে। সেখান থেকে তাঁর অচৈতন্য দেহটা আপনি বুকে করে তুলে এনে পরে ঘরের মেঝেতে শুইয়ে দিয়েছিলেন, তাই নয় কি?
কিন্তু–
আমি জানি শিখেন্দুবাবু, আমার অনুমান মিথ্যে নয়। আমি যা বললাম সেই রকমই ঘটেছিল।
শিখেন্দু নীরব।
তাহলে মনে হচ্ছে, অবিশ্যি এবারেও আমার অনুমানই দ্বিতীয় অনুমান, দীপিকাদেবী ঘরে ঢুকবার পর দরজা বন্ধ করে দেন ঘরের, কিন্তু নির্বাণীতোষকে ঘরের মধ্যে দেখতে পান না। খুঁজতে খুঁজতেই তখন গিয়ে বাথরুমে ঢোকেন, বাথরুমের আলোটা নেভানো ছিল সম্ভবত, আলোটা জ্বালবার পর তাঁর স্বামীর মৃতদেহটা তাঁর দৃষ্টিতে পড়ে, সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে তিনি মুহূর্তে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। আর তাই যদি হয় তো ঘরের দরজাটা খুলে দিয়েছিল কে?
কে? প্রতিধ্বনির মতই যেন শিখেন্দু কথাটার পুনরাবৃত্তি করল।
একজনের পক্ষেই সেটা খুলে দেওয়া সম্ভব ছিল—
কে? কার কথা বলছেন?
হত্যাকারী। শান্ত নির্লিপ্ত কণ্ঠে কিরীটী কথাটা যেন উচ্চারণ করল।
হত্যাকারী!
হ্যাঁ, অথচ তাকে আপনি দেখেননি
না।
তাহলে সে কোন্ পথে এ বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল? এবং কখন? শুধু তাই নয় শিখেন্দুবাবু, ওই সঙ্গে আরও তিনটে প্রশ্ন আসছে
প্রশ্ন! আরও তিনটে?
তাই-ই। প্রথমত হত্যাকারী তখনও উপরেই ছিল, কিন্তু কেন? কেন সে হত্যা করার পরও চলে গেল না? দ্বিতীয়, হত্যাকারীকে সম্ভবত দীপিকাদেবী দেখেছেন, দেখতে পেয়েছিলেন; কথা হচ্ছে হত্যাকারী দীপিকাদেবীর পরিচিত কেউ, না কোন তৃতীয় অপরিচিত ব্যক্তি? এবং তৃতীয়ত, আকস্মিকভাবে স্বামীর মৃতদেহটা আবিষ্কার করা মাত্রই জিনি চিৎকার করে উঠে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন, না হত্যাকারীকে চিনতে পেরেই, চিৎকার করে জ্ঞান হারিয়েছিলেন?
শিখেন্দু যেন একেবারে বোবা। তার মুখে কোন কথাই নেই।
শুনুন শিখেন্দুবাবু, যতদূর আমি বুঝতে পারছি, অবিশ্যি কোন বিশেষ চিকিৎসকই দীপিকাদেবীকে পরীক্ষা করে বলতে পারবেন, বর্তমানে ঘটনার আকস্মিকতায় বা নিষ্ঠুরতায় যাই হোক, তাঁর সম্পূর্ণ স্মৃতি বিলুপ্ত হয়েছে। এবং হত্যাকারীকে খুঁজে বের করতে হলে সর্বাগ্রে ওঁর স্বাভাবিকতা, স্বাভাবিক চেতনা ফিরে আসা একান্ত দরকার এবং আমার মনে হয় সে ব্যাপারে আপনিই সবচাইতে বেশি সাহায্য করতে পারবেন।
আমি?
হ্যাঁ, আপনি।
কিন্তু কেমন করে?
আপনার ভালবাসা দিয়ে, যে ভালবাসা এতকাল ধরে এবং এখনও নিঃশব্দে ফন্তুর মত আপনার মনের মধ্যে বয়ে চলেছে।
না, না–সহসা যেন অস্ফুট চিৎকার করে ওঠে শিখেন্দু, পারব না—আমি পারব না কিরীটীবাবু, ক্ষমা করুন, আপনি যা বলছেন সে আমার দ্বারা হবে না।
হবে। হতেই হবে। নির্বাণীতোষ আপনার বন্ধু, আর ফিরে আসবে না কোনদিনই, কিন্তু একবার দীপিকার কথা ভাবুন তো, এখন না হয় তিনি বেঁচেও মরে আছেন, কিন্তু যখন তাঁর মনের ঐ বর্তমান কুয়াশা কেটে যাবে, তখন তাঁর অবস্থাটা কি হবে! আপনার ভালবাসাই যে আজ তাঁর জীবনের একমাত্র আশা। বাঁচবার একটিমাত্র পথ। আপনার ভালবাসা—আপনার স্নেহ দিয়ে ওঁর ঐ অহল্যার ঘুম আপনাকেই ভাঙাতে হবে। যা হবার তা তো হয়েছেই, কিন্তু ওঁকে জানতে দিন, ও যেন জানতে পারে, পৃথিবীটা আজও ওঁর কাছে শুকিয়ে যায়নি। জীবনের সব কিছু নির্বাণীতোষের সঙ্গে সঙ্গেই নিঃশেষ হয়ে যায়নি। সমস্ত অর্থ মিথ্যে হয়ে যায় নি।
আপনি জানেন না কিরীটীবাবু, দীপু কি গভীরভাবে ভালবাসত নিবুকে। যে মুহূর্তে ও সজ্ঞানে উপলব্ধি করতে পারবে নিবু নেই, ওর কাছে বেঁচে থাকার প্রশ্নটাই মিথ্যে হয়ে যাবে।
কিরীটী শান্ত গলায় প্রত্যুত্তর দিল, না, শিখেন্দুবাবু, যাবে না। মানুষই মানুষকে চরম দুঃখ দেয় আর মানুষই চরম দুঃখকে বুক পেতে নেয়। আর তাই আজও জীবন এত দুঃখ এত বিপর্যয় ও এত আঘাতের পরও মিথ্যে হয়ে যায় নি। আজও মানুষ তাই বাঁচার চেষ্টা করে, পৃথিবীতে তারা বেঁচে আছে, শেষ হয়ে যায়নি। আপনার কাছে তাই আমার অনুরোধ, দীপিকার এতবড় দুর্দিনে আপনি ওঁর কাছ থেকে দূরে সরে থাকবেন না।
শিখেন্দুর দুই চোখের কোল বেয়ে তখন নিঃশব্দে দুটি ধারা তার গণ্ড ও চিবুককে প্লাবিত করে দিচ্ছে।
আমি এবারে উঠব শিখেন্দুবাবু, শিবতোষবাবুকে বলে দেবেন, এ নিষ্ঠুর হত্যারহস্যের মীমাংসা করবার আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব। আর আমার বাড়ির ঠিকানা তো আপনি জানেন, ফোন নম্বরটাও গাইড় থেকে দেখে নেবেন। আমি কিন্তু আপনার পথ চেয়েই থাকলাম।
কিরীটী উঠে ঘরের দরজা ঠেলে বের হয়ে গেল।
পারলারে আর প্রবেশ করল না। সোজা পোর্টিকোতে গিয়ে গাড়িতে উঠে বসে হীরা সিংকে বলল, নিজের কোঠী চল।
বীরেন মুখার্জী তখনও তাঁর জবানবন্দি নেওয়া শেষ করতে পারেন নি।
বাড়ির সকলেরই জবানবন্দি দেওয়া হয়ে গিয়েছিল, সে-সময় তিনি যতীশ সামন্তকে নিয়ে পড়েছিলেন।
