কিরীটী দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল, শিখেন্দু পালারের দিকে চলে গেল। যতীশ সামন্ত তখনও পালারেই ছিল, শিখেন্দু তাকে ডেকে এনে শিবতোষের অফিসঘরটা খুলিয়ে নিল।
আসুন!
আগে শিখেন্দু, পশ্চাতে কিরীটী অফিসঘরে প্রবেশ করল এবং শিখেন্দু ঘরের আলোটা জ্বালাতে চাইলে, কিরীটী তাকে বাধা দিয়ে বললে, ভোর হয়ে গিয়েছে শিখেন্দুবাবু, ঘরের জানলাগুলো খুলে দিন বা পদগুলো সরিয়ে দিন—আলো জ্বালাতে হবে না।
শিখেন্দু আলো আর না জ্বালিয়ে ঘরের জানলার পর্দাগুলো সরিয়ে দিতেই জানলার কাঁচের সার্শিপথে দিনের আলো এসে ঘরে প্রবেশ করল। দেখা গেল কিরীটীর অনুমান মিথ্যে নয়। ঘরের মাঝখানে বিরাট একটি সেক্রেটারিয়াট টেবিল, গোটা দুই ফোন, কলমদানী, অ্যাশট্রে আর ছোট দামী একটা ফটোর ফ্রেমে এক মহাত্মার ফটো, শিবতোষের গুরুদেব। ঘরের চারপাশে গোটাচারেক স্টিলের আলমারি, দেয়ালে গাঁথা একটি আয়রন-সেফ। টেবিলের উপরে কিছু ফাইল-পত্র রয়েছে।গোটাসাতেকচেয়ার একদিকেছটাচেয়ার ও অন্যদিকে একটি রিভলবিং চেয়ার। বোঝা গেল, শিবতোষ ঐ চেয়ারটাতেই বসেন। ঘরের সংলগ্ন বাথরুম। বাথরুমের দরজা বন্ধ।
বসুন শিখেন্দুবাবু!
শিখেন্দু বসল। কিরীটীও পাশেই একটা চেয়ারে বসল।
পাইপটা কিরীটীর নিভে গিয়েছিল। লাইটারের সাহায্যে পুনরায় পাইপের মাথায় অগ্নিসংযোগ করে মৃদু একটা টান দিয়ে বললে, বুঝতেই পারছেন শিখেন্দুবাবু, ব্যাপারটা র্যাদার ডেলিকেট, তাই একটু নিরিবিলিতে আপনাকে নিয়ে এলুম।
শিখেন্দু কোন জবাব দিল না। ক
য়েকটি প্রশ্ন আপনাকে আমি করতে চাই।
বেশ তো করুন।
কাল রাত্রে ফুলশয্যার ব্যবস্থা তিনতলায় নির্বাণীতোষবাবুর শোবার ঘরেহ য়েছিল দেখলাম—
হ্যাঁ। ও তো তিনতলাতেই থাকত, তাই।
তিনতলায় বুঝি কেউ থাকে না?
পাঁচটা ঘরের তিনটে ঘর খালিই পড়ে থাকে তিনতলায়। দুটো ঘর পাশাপাশি নির্বাণীতোষ ব্যবহার করত বেল।
বৌ বসানো হয়েছিল নিচের সামনে দোতলার একটি ঘরে?
হ্যাঁ।
তার মানে তিনতলায় কারো কোন দরকারই ছিল না যাবার?
কারো বলে কোন কথা নয়, বরাবরই নির্বাণীতোষ তিনতলায় কারো যাওয়া পছন্দ করত। তাই কেউ বড় একটা যেত না।
কেন? পছন্দ করত না কেন?
ও চিরদিনই একটু নির্জনতাপ্রিয় ছিল। গোলমাল হৈচৈ পছন্দ করত না।
তাহলে তো পছন্দ না হবারই কথা। বলেইহঠাৎ যেন প্রশ্নটা করল.কিরীটী, আপনি কাল রাত্রে তিনতলায় কবার গিয়েছিলেন?
আমি—তিনতলায়?
হ্যাঁ।
একবার মাত্র গিয়েছিলাম।
মনে করে দেখুন তো শিখেন্দুবাবু! একবার নয়, অন্ততঃ দুবার নিশ্চয়ই গিয়েছিলেন। কিরীটীর গলার স্বর যেন অদ্ভুত শান্ত, অদ্ভুত নির্লিপ্ত। প্রশ্নটা করে কিরীটী তাকিয়ে থাকে শিখেন্দুর মুখের দিকে।
আমি কাল রাত্রে একবারই গিয়েছিলাম তিনতলায় চিৎকার শোনবার পর, মনে আছে আমার। তার আগে আমি তিনতলায় একবারও যাইনি।
যাননি?
না।
না শিখেন্দুবাবু, মনে পড়ছে না আপনার, আপনি আগেও একবার তিনতলায় গিয়েছিলেন।
গিয়েছিলাম!
হ্যাঁ।
কখন? কে বললে? কেউ বলেছে আপনাকে কথাটা?
কেউ বলেছে বা ওপরে যেতে কেউ আপনাকে দেখেছে কিনা, সেটাও নিছক সত্য-মিথ্যে যাচাইয়ের প্রশ্ন শিখেন্দুবাবু। তার মধ্যে যেতে চাই না। আমি শুধু জিজ্ঞাসা করছি, কখন আপনি ওপরে গিয়েছিলেন?
বলছি তো ওপরে আমি আগে যাই-ই নি। চিৎকার শোনবার পরই গিয়েছিলাম।
রাত সাড়ে নটা নাগাদ একবার যাননি?
না।
নির্বাণীতোষবাবু আপনার অভিন্ন-হৃদয় বন্ধু ছিলেন, সেদিক দিয়ে নিশ্চয়ই আপনি চান তাঁর হত্যাকারী ধরা পড়ুক?
নিশ্চয়ই চাই।
শুধু তাই নয়, দীপিকাও আপনার বান্ধবী—শুধু বন্ধুপত্নীই নয়।
নিশ্চয়ই তাই।
তাহলে তো আমাকে এই নিষ্ঠুর হত্যার তদন্তের ব্যাপারে সাহায্য করা আপনার কেবল কর্তব্যই নয়, আপনার মানবিকতার কাছে সেটা সত্যের একটা দাবিও। কথাগুলো এমন শান্ত গলায় ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল কিরীটী যে স্পষ্টতই শিখেন্দুকে একটু যেন বিমূঢ়ই করে দিয়েছে বলে কিরীটীর মনে হল।
শিখেন্দু বললে, আপনি ঠিক কি বলতে চাইছেন আমি বুঝতে পারছি না।
দীপিকা তো আপনার সহপাঠিনী? তাঁর প্রতি কি, ক্ষমা করবেন, কথাটা আপাতত রূঢ় হলেও না বলে পারছি না, কোনদিন আপনার কোন দুর্বলতাই দেখা দেয়নি?
শিখেন্দু এবার মাথা নীচু করল।
জবাব দিন আমার প্রশ্নের শিখেন্দুবাবু? এখানে এই ঘরের মধ্যে আমরা ছাড়া আর তৃতীয় ব্যক্তি কেউ নেই এবং এও আপনাকে কথা দিচ্ছি, কেউ একথা জানবে না, জানতে পারবে না।
শিখেন্দু একেবারে চুপ।
বুঝলাম। জবাব আমি পেলাম।
কিন্তু আপনি বিশ্বাস করুন কিরীটীবাবু, দীপিকা আর নির্বাণীতোষ পরস্পরকে ভালবাসে এ-কথা জানতে পারার পর–
আপনাকে আপনি গুটিয়ে নিয়েছিলেন। বন্ধুত্বের দুর্লভ পরিচয়ই দিয়েছেন।
আমি চেয়েছিলাম, ওরা পরস্পর পরস্পরকে যখন ভালবাসে ওরা সুখী হোক। কি
রীটীর মনে হল, শিখেন্দুর গলার স্বরটা যেন বুজে এল।
শিখেন্দুবাবু!
কিরীটীর ডাকে শিখেন্দু ওর দিকে মুখ তুলে তাকাল।
০৪. আর একটা প্রশ্নের জবাব চাই
আর একটা প্রশ্নের জবাব চাই।
কিসের জবাব?
চিৎকার শুনে আপনিই সবার আগে তিনতলায় যান। তাই তো?
এবং বোধ হয় নির্বাণীতোষের শয়নঘরের দরজা খোলা দেখে সোজাই গিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকেছিলেন?
হ্যাঁ।
সেটাই আমার কাছে যেন কেমন আশ্চর্য মনে হচ্ছে—
কেন?
দীপিকা দেবী ঘরে ঢুকেও ঘরের দরজা খুলে রেখে দিয়েছিলেন, সেটা একটু অস্বাভাবিক নয় কি!
