নির্মলবাবুকে বের হয়ে যেতে দেখেছ?
ঠিক লক্ষ্য করিনি বাবু, মিথ্যে বলব কেন।
কিরীটী আবার প্রশ্ন করল, রাত্রে কাকে তুমি তিনতলায় যেতে দেখেছ—মনে করে বলতে পার গোকুল?
বড়দিদিমণি বার দুই, ছোটদিদিমণি একবার উপরে গিয়েছিলেন। তাছাড়া শিখেদাদাবাবুও এবার গিয়েছিলেন। আর একজন বৌ, নীল রঙের দামী শাড়ি পরনে, মাথায় ঘোমটা ছিল, উপরে যেতে দেখেছি।
শিখেন্দুদাদাবাবু কখন তিনতলায় গিয়েছিলেন গোকুল?
রাত দশটা হবে তখন কি তার দু-চার মিনিট পরেও হতে পারে।
তাঁকে নেমে আসতে দেখেছিলে?
না। কখন আবার নেমে এসেছেন দেখিনি।
আর সেই বৌটি?
শিখেন্দুদাদাবাবুর উপরে যাবার বোধ হয় আধ ঘণ্টাখানেক পরে।
ঠিক সময়টা তোমার মনে আছে?
আজ্ঞে না। তবে ঐরকমই মনে হয়।
তাঁকে নেমে আসতে আবার দেখেছিলে?
না।
দেখনি?
না।
দাদাবাবু ওপরে যাবার পরেও নেমে আসতে দেখনি?
না।
দাদাবাবু কখন ওপরে গিয়েছিলেন?
ঐ বৌটি ওপরে যাবার কিছু আগেই।
রাত পৌনে এগারোটা—তারও আগে?
ঐ রকমই হবে বোধ হয়, ঠিক আমার মনে নেই।
হুঁ। আচ্ছা গোকুল, যে বৌটি ওপরে গিয়েছিল, তাকে দেখলে চিনতে পারবে?
আজ্ঞে না। মাথায় ঘোমটা ছিল। ওপরে উঠবার সময় পিছন থেকে দেখেছি, ঠিক দেখতে পাইনি।
এ বাড়িতে উৎসবে যোগ দিতে বাবুর আত্মীয়-পরিজন যাঁরা এসেছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কি?
বলতে পারব না, তাঁদের তো আমি সকলকে চিনি না—একমাত্র প্রায়ই আসা-যাওয়া করেন যাঁরা তাঁদের ছাড়া। গতকাল আর আজ তো অনেকেই এসেছেন, গিয়েছেন।
একপাশে দাঁড়িয়েছিল শিবতোষের সরকার ও প্রাইভেট সেক্রেটারী যতীশ সামন্ত।
কিরীটী তার দিকে তাকাল, যতীশবাবু।
কিছু বলছিলেন?
এ-বাড়িতে আত্মীয়-পরিজনদের মধ্যে অল্পবয়সী বৌ অনেক আছেন, তাই না?
সে-রকম কেউ আছেন বলে তো আমি জানি না—যাঁরা সাধারণত এসে থাকেন মধ্যে মধ্যে তাঁদের মধ্যে—তবে আজ তো অনেক আত্মীয়-পরিজনই এসেছিলেন উৎসবে, তাঁদের মধ্যে কেউ হতে পারেন।
কিরীটী যেন কি ভাবছিল, অন্যমনস্কভাবে মৃদু কণ্ঠে বললে, তা অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু সে বৌটি যে-ই হোক, সে তিনতলায় গিয়েছিল কেন? তিনতলায় তো যাবার কথা নয় কারো! ঠিক আছে মিঃ মুখার্জী, অ্যাম সরি টু ডিসটাব ইউ, আপনি আপনার কাজ করুন।
বীরেন মুখার্জী মধ্যখানে কিরীটীর প্রশ্নোত্তরে একটু বিরক্তই হয়েছিলেন, কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ করলেন না। আরও কয়েকটা মামুলী প্রশ্ন করে অন্য ভৃত্য রাজেনকে ডেকে দেবার জন্য গোকুলকে বললেন।
গোকুল চলে গেল।
রাজেন একটু পরেই ঘরে এসে ঢুকল।
গোকুলের চেহারাটা মোটাসোটা বেঁটে। একটু গোলগাল এবং রং কালো। রাজেন ঢ্যাঙা, লম্বা, রোগা। শুকনো পাকানো চেহারা। গোকুলের চোখের চাউনি ভাসা-ভাসা, একটু যেন বোকা-বোকা মনে হয় ওকে চোখের দিকে তাকালে, কিন্তু রাজেনের চোখের দৃষ্টিতেই বোঝ যায় লোকটা চালাক-চতুর। গোকুলের মত নিরীহ সরল হাবাগবা নয়।
তোমার নাম রাজেন? বীরেন মুখার্জী প্রশ্ন করলেন।
আজ্ঞে–রাজেন সাধু।
এ বাড়িতে কতদিন কাজ করছ?
তা আজ্ঞে—দশ বছরের কিছু বেশি হবে।
কিরীটী সোফার উপরে বসে পাইপে অগ্নিসংযোগ করে টানতে থাকে।
তুমিও কি সন্ধ্যে থেকে ওপরেই ছিলে?
আজ্ঞে না—আমি নিচের প্যাণ্ডালে ছিলাম। দাদাবাবু আমাকে সেখানেই থাকতে বলেছিলেন।
রাজেন, নিমন্ত্রিত পুরুষ ও মহিলারা কি সব এক প্যাণ্ডালে বসেই খেয়েছেন?
আজ্ঞে না। মেয়েদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা ছিল। সামনের দিকের প্যাণ্ডালে পুরুষরা খেয়েছেন, পিছনের প্যাণ্ডালে মেয়েরা।
তুমি কোন্ প্যাণ্ডালে ছিলে?
দুপ্যাণ্ডালেই আমি ছুট ছুটে বেড়িয়েছি দাদাবাবুর সঙ্গে সঙ্গে।
দাদাবাবু তাহলে দুপ্যাণ্ডালেই যাতায়াত করছিলেন?
আজ্ঞে।
ওই সময় কিরীটী পাইপটা হাতে নিয়ে প্রশ্ন করল, রাজেন, তুমি যখন দাদাবাবুর সঙ্গে সঙ্গেই ছিলে, তখন নিশ্চয়ই তোমার মনে আছে কখন দাদাবাবু প্যাণ্ডাল ছেড়ে চলে যান?
বোধ হয় রাত এগারটায়, তাঁর বন্ধুদের শেষ ব্যাচ খেয়ে চলে যাবার পর,–রাজেন বললে।
আর শিখেন্দুদাদাবাবু?
আরও আধঘণ্টা পরে।
শিখেন্দুবাবু তখন কোথায় ছিলেন?
দাদাবাবুর পাশেই।
রাজেন, নীল রঙের দামী শাড়ি পরা কোন অল্পবয়সী বৌকে দেখেছ?
আজ্ঞে অনেকের পরনেই নীল শাড়ি ছিল, আর অল্পবয়সী বৌও অনেক এসেছিল।
তোমার দাদাবাবুর মাথা ধরেছিল জান?
আজ্ঞে না।
তোমার দাদাবাবুর মাথা ধরেছিল বলেই তো শিখেন্দুদাদাবাবু তাঁকে ওপরে চলে যেতে বলেছিলেন!
আমি বলতে পারব না বাবু।
রাত্রি শেষ হয়ে এসেছিল ইতিমধ্যে। জানলাপথে প্রথম ভোরের আলো ঘরে এসে প্রবেশ করে।
বীরেনবাবু, কিরীটী বললে, আমি এবার যাব। আমি ওপরে যাচ্ছি। শিবতোষবাবুকে একবার বলে আসি। কিরীটী উঠে পড়ল।
বীরেন মুখার্জী কোন কথা বললেন না।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই শিখেন্দুর সঙ্গে মুখখামুখি হয়ে গেল কিরীটীর। শিখেন্দু নেমে আসছিল।
আমি আপনার সঙ্গেই দেখা করতে যাচ্ছিলাম শিখেন্দুবাবু। কিরীটী বললে।
আমার সঙ্গে!
হ্যাঁ। কোথাও আমরা বসতে পারি? কিছু কথা ছিল আমার।
কথা?
হ্যাঁ। একটু নিরিবিলি হলেই ভাল হয়। কিরীটী বললে।
নিচে কাকাবাবুর অফিসঘরে আমরা বসতে পারি। আর ওপরের কোন ঘরে যদি বসতে–
না। ওপরে নয়। নিচেই চলুন।
বেশ চলুন। শিখেন্দু বললে।
নিচের তলায় একেবারে দক্ষিণপ্রান্তে শিবতোষের অফিসঘর। কিন্তু দরজাটা আটকানো দেখা গেল।
আপনি এখানে একটু দাঁড়ান কিরীটীবাবু, যতীশবাবুর কাছে বোধ হয় ঘরের চাবি আছে—তাঁকে বলছি ঘরটা খুলে দিতে।
