ডাকছ বাবা!
হ্যাঁ। কিরীটীবাবুকে একবার বৌমার কাছে নিয়ে হ্যাঁ।
বৌদি তো এখনও তেমনি বোবা হয়ে আছে বাবা, স্বাতী বললে। কথাটা বলে স্বাতী যেন একটু বিরক্তির সঙ্গেই কিরীটীর মুখের দিকে তাকাল।
কিরীটী সস্মিতভাবে বললে, আপনার ভয় বা চিন্তার কোন কারণ নেই স্বাতীদেবী, ওঁকে আমি কোনরকম বিরক্ত করব না।
স্বাতী নিরাসক্ত কণ্ঠে বলল, আসুন। .
দুখানা ঘরের পরের ঘরটার মধ্যেই দীপিকা ছিল। কিরীটী স্বাতীর সঙ্গে সঙ্গে সেই ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল। বিবাহের পূর্বে স্বাতী এই ঘরটাতেই থাকত, বিবাহের পর যখন এখানে আসে এই ঘরেই থাকে।
দীপিকার জ্ঞান হবার পর সকলে দীপিকাকে স্বাতীর ঘরেই নিয়ে এসেছিল। বীরেন মুখার্জী যেমন দেখে এসেছিলেন, ঠিক সেইভাবেই বসে ছিল তখনও দীপিকা, মাথাটা নীচু করে। দৃষ্টি ভূমির ওপরে নিবদ্ধ।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিরীটী একবার দীপিকাকে দেখে নিল। এবং তার অভিজ্ঞ দৃষ্টিতাকে বুঝিয়ে দেয়, দীপিকার জ্ঞান ফিরে এলেও সে তার স্বাভাবিক চেতনা ফিরে পায়নি। এও বুঝতে পারে কিরীটী, নিদারুণ কোন মানসিক আঘাতেই তার মানসিক চেতনা লুপ্ত হয়েছে। তাকে। প্রশ্ন করে কোন লাভই হবে না। কিরীটী লক্ষ্য করে আরও, দীপিকার কপালের বাঁদিকে একটা কালসিটা।
সামনের কিছু চূর্ণ বিপর্যস্ত কুন্তল স্থানভ্রষ্ট হয়ে কপালের ওপর এসে পড়েছে।
কিরীটী পকেট থেকে হীরকখণ্ডটি বের করে স্বাতীর দিকে এগিয়ে ধরে বললে, স্বাতী দেবী, দেখুন তো এটা চিনতে পারেন কিনা?
স্বাতী সোনায় বসানো হীরকখণ্ডটি হাতে নিয়ে দেখেই বলল, কোথায় পেলেন এটা?
জানেন এটা কার?
এটা তো বৌদির সিঁথি-মৌরের সঙ্গে ছিল। মা দিয়েছিলেন এটা বিয়ের পর আশীর্বাদে।
সিঁথি-মৌরটা কোথায়?
খুলে রেখেছি।
কোথায় দেখি?
স্বাতী এগিয়ে গিয়ে আলমারি থেকে সিঁথি-মৌরটি বের করে আনল। দেখা গেল স্বাতীর ধারণা মিথ্যে নয়। সিঁথি-মৌরের সঙ্গে যে ছোট্ট সোনার এস দিয়ে এটা লাগানো ছিল, সেই এটা আছে তখনও।
স্বাতী আবার বলল, হ্যাঁ, এটার সঙ্গেই লাগানো ছিল হীরেটা। কোথায় পেলেন এটা? ওপরের ঘরে?
কিরীটী স্বাতীর প্রশ্নের কোন জবাকনা দিয়ে কেবল বলল, এটা রেখে দিন। আপনাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি স্বাতী দেবী?
কি?
আপনিই তো আজ রাত্রে আপনার বৌদিকে ওপরে পৌঁছে দিয়ে আসেন?
হ্যাঁ।
ঘরে ঢুকেছিলেন?
না। সিঁড়ি থেকেই আমি চলে এসেছিলাম।
সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় কোন শব্দ বা চিৎকার শুনেছিলেন?
না।
কতক্ষণ বাদে চিৎকার শোনেন?
মিনিট পনের-কুড়ি বাদে বোধ হয়।
কি রকম চিৎকার?
ভয় পেলে যেমন চিৎকার করে।
বিয়ের আগে দীপিকাদেবী এ বাড়িতে আসেননি?
কতবার এসেছে—দাদার ক্লাস-ফ্রেণ্ড ছিল তো বৌদি।
জানি। আচ্ছা আপনাদের এক সভাই আছেন, জানেন?
জানি।
দেখেছেন তাঁকে কখনও?
না। তিনি কখনও এখানে আসেননি।
ঐ সময় শিবতোষের বড় মেয়ে স্মৃতি এসে ঘরে ঢুকল।
ইনি? কিরীটী প্রশ্ন করে।
আমার দিদি, স্মৃতি।
আমার নাম কিরীটী রায়।
কিরীটী কথাটা বলারসঙ্গেসঙ্গেই স্মৃতি কিরীটীরমুখের দিকে তাকাল। একটুযেনশ্রদ্ধামিশ্রিত তার দৃষ্টি। কিরীটী রায় নামটা স্মৃতির অপরিচিত নয়। তার বাপের মুখে শুনেছে এবং শুনেছে ভদ্রলোকের প্রতি তাদের বাবার কি অগাধ শ্রদ্ধা।
আপনি কোন্ ঘরে থাকেন স্মৃতিদেবী?
পাশের ঘরেই।
আপনার দাদার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের বোধ হয় আপনি সকলকেই চেনেন?
যাঁরা এ বাড়িতে আসতেন তাঁদেরই কেবল চিনি। আর ঘনিষ্ঠতা দাদার কার সঙ্গে ছিল—একমাত্র শিখেন্দুদা ছাড়া বলতে পারব না।
এ বাড়িতে আপনার দাদার কাছে আর কে কে আসত?
নির্মলবাবু আর সঞ্জীববাবু।
তারা আপনার দাদারই সমবয়সী ছিল বোধ হয়?
নির্মলবাবু বোধ হয় একটু বয়সে বড় হবেন দাদার চাইতে, কারণ শুনেছিলাম—
কি শুনেছিলেন?
অনেকবার নাকি ফেল করেছেন নির্মলবাবু। মানুষটা যেমন হাসিখুশি, তেমনি আমুদে।
আচ্ছা তাঁরা এসেছিলেন নিশ্চয়ই উৎসবে?
স্বাতী বলতে পারে। কারণ যে-ঘরে বৌদিকে বসানো হয়েছিল,—দাদার বন্ধুরা কে কে প্রেজেনটেশন দিতে এসেছিলেন, ওই বলতে পারে। স্মৃতি বলল।
স্বাতীদেবী!
নির্মলবাবুকে দেখেছি, তাঁকে চিনতামও। কিন্তু আর যাঁরা এসেছিলেন, অনেকেই তো এসেছিলেন, কাউকেই আমি চিনতে পারিনি।
সঞ্জীববাবুকে দেখেননি?
মনে পড়ছে না।
ঠিক আছে, আপনাদের আর বিরক্ত করব না। আমি নিচে যাচ্ছি।
নিচের পারলারে যখন এসে কিরীটী প্রবেশ করল, বীরেন মুখার্জী তখন গোকুল ভৃত্যকে প্রশ্ন করছেন।
তাহলে গোকুল, তুমি বরাবরই দোতলায় ছিলে?
আজ্ঞে কাবাবুর হুকুম ছিল দোতলায় যেন সর্বক্ষণ আমি থাকি।
হঠাৎ ঐ সময় কিরীটী প্রশ্ন করল, গোকুল, তোমার দাদাবাবুর বন্ধু যারা এ বাড়িতে আসত, তাদের নিশ্চয়ই তুমি চেন?
সকলকে তো চিনি না আজ্ঞে,—গোকুল বলল, তবে দু-একজনকে চিনি।
তারা কে? কিরীটী আবার প্রশ্ন করল।
নির্মলবাবু, সঞ্জীববাবু, পরেশবাবু—আর শিখেন্দুবাবু তো এ বাড়ির লোক একরকম।
নির্মলবাবু, পরেশবাবু, সঞ্জীববাবু এসেছিলেন আজ?
আজ্ঞে নির্মলবাবু আর পরেশবাবু এসেছিলেন।
আর সঞ্জীববাবু আসেননি?
কই, তাঁকে তো দেখিনি।
পরেশবাবু আর নির্মলবাবু বৌকে যে-ঘরে বসানো হয়েছিল, সে ঘরে যাননি?
গিয়েছিলেন তা আজ্ঞে।
দেখেছ তাঁদের–বৌ যে-ঘরে ছিল সে-ঘরে ঢুকতে দুজনকেই?
দেখেছি বইকি বাবু।
কখন কে এসেছিলেন—একসঙ্গেই কি?
আজ্ঞে না। রাত আটটা সোয়া আটটা নাগাদ পরেশবাবুকে দেখেছি। আর নির্মলবাবু এসেছিলেন রাত তখন সাড়ে নটা কি পৌনে দশটা হবে।
