এত এত কী খেলে হে?
কত কী! কলকাতায় কত যে খাবার জিনিস। কতো রকমের যে, চোখে দেখলে বিশ্বাস হয় না, চেখে দেখতে হয়। দোকানে দোকানে থরে থরে সাজানো। রকমারি সন্দেশ। অবশ্যি রসকদম আর খাজার মতন মেঠাই এখানে মেলে না তা ঠিক, কিন্তু তাহলেও তাদের চেয়ে কোনো অংশে কম যায় না। তাছাড়া ঐ রাবড়ি! কী জিনিস যে ভাই। বলতেই আমার জিভের জল চলকে ওঠে। এক সন্দেশের দোকানে পুরু দুধের সর পাওয়া যায় কিনা শুধিয়েছিলাম, পেলে রসগোল্লা কুচিয়ে তার সঙ্গে মিশিয়ে খেতাম। সে যে কী চমৎকার খেতে কী বলব! তা, রসগোল্লা সেখানে অঢেল ছিল, বেশ বড়ো বড়ো সাইজেরই, তারা বলল যে, ওগুলো রসগোল্লা নয় ভাই, রাজভোগ। বুঝলাম যে রসগোল্লারই এক রাজসংস্করণ। কিন্তু তার কুচিকুচির সঙ্গে মেশাবো যে সেই দুধের সরই মিললো না। বলল যে সর আর ক্ষীর একাকার করে একটা জিনিস আছে নাকি তাদের সেটা একবার চেখে দেখতে পারি ইচ্ছে করলে। ভাঁড়ে ভরে দিল-হাতে হাতে পরীক্ষা করে দেখলাম–জিভ আর কানের বিবাদ মিটিয়ে…রসগোল্লা আর সরের সংমিশ্রণের চেয়েও সেটা ভাই আরো চমৎকার। সেই জিনিসটারই নাম রাবড়ি। অ্যাতো রাবড়ি এই কদিনে খেয়েছি না…চলো, আজ তোমায় খাওয়াবো।
আমার খাওয়া! সে কয় : তার চেয়েও ঢের খাসা খাসা খাবার আছে কলকাতায়। রেস্টুরেন্টে পাওয়া যায়।
রেস্টুরেন্ট! সে আবার কী ভাই?
সেও একরকমের খাবারের দোকান। তবে অন্য ধরনের খাবার–অন্য কায়দার দোকান। চেয়ার-টেবিলে সাজানো-সেখানে বসে খেতে হয় সব।
কী খাওয়ায় সেখানে? কী কী খাবার পাওয়া যায় শুনি?
চপ কাটলেট! কারি কোর্মা, মোগলাই-পরোটা…আরো কতো কী! যেয়োনা আমার সঙ্গে আজ, যাবে? আমি তোমায় খাওয়াব না হয়।
আচ্ছা আচ্ছা, হবেখন। প্রথম দিন আমিই আজ খাওয়াই…তারপর আরেকদিন তুমি আমায় খাওয়াবে, কেমন? তুমি আমায় খবর কাগজের আপিসে নিয়ে যাও তো আগে…টাকা রোজগারের ব্যবস্থা করি…তারপর খাওয়াদাওয়ার দিন তো পইে আছে সামনে। কিন্তু ভাই, একটা কথা। আমরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পাশাপাশি কাগজ বেচব কিন্তু। আমি তোমার খদ্দের ভাঙিয়ে তোমার লাভের কড়িতে ভাগ বসাতে চাই না।
তা কেন? তা কেন? তাতে আমি কিছু মনে করব না।
না ভাই। কলকাতায় কাগজ বেচার কি জায়গা নেই আর? তবে বিকেলের দিকে একটা। নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট সময়ে এসে আমরা মিলব। কোনো রেস্টুরেন্টে কি কোনো বায়স্কোপে? :
বায়স্কোপও তুমি দ্যাখো নাকি? দেখেচ নাকি?
বাঃ, আমার অতো টাকা কি খালি খালি খেয়েই উড়ে গেল নাকি? এলমো দি মাইটীর সিরীয়াল দেখেছি–এমন রোমাঞ্চকর, কী বলব! আর চার্লি চ্যাপলিন ম্যাকসেনেটের দুতিন রীলের কমিক ছবি–এমন হাসির যে! দেখনি তুমি?
ক্কচিৎ কদাচ। আমি খালি ঘুরে বেড়াই। রাস্তায় রাস্তায় খালি খালি ঘুরে বেড়াতে এমন ভালো লাগে আমার। কতো কী দেখা যায় যে! সে জানায়।
আমারও রাস্তায় ঘুরতে ভালো লাগে খুব। যদি চেনাশোনা কাউকে নজরে পড়ে যায় কখনো।
কলকাতায় তোমার চেনা লোক আছে নাকি কেউ?
নেই আবার? আমার এক বন্ধুই থাকে আহিরিটোলায়। তার নাম রিনি।
রিনি! ভারী অত নাম তো! ডাকনাম হবে নিশ্চয়। কতত নম্বর আহিরিটোলা?
নম্বরটাই যে মনে নেই আমার। ভুলে মেরে দিয়েছি–যা আমার মেমারি ভাই! তোমার ঐ আহিরিটোলা কি বড় একটা রাস্তা?
নম্বর না জানা থাকলে কলকাতায় ঠিকানা খুঁজে বার করা ভারী মুশকিল! বলে ঠিকানা জানা থাকলেই মেলে না। তবে তোমার ঐ আহিরিটোলা তেমনটা বড় রাস্তা নয়–চৌরঙ্গী কি হ্যারিসন রোডের মতন না। তাহলেও নেহাত ছোট নয়–শ দুতিন বাড়ি আছে বোধহয় সেই রাস্তাটায়।
থাক না। সেখানেই আমার কাগজ বেচব আমি। রাস্তার এ-মোড় থেকে ও-মোড়। ও-মোড় থেকে এ-মোড়। সকাল থেকে সন্ধ্যে! তার মধ্যেও কি সে একটিবারের জন্যেও ঘরের বার হবে না? তাহলেই তো দেখা হয়ে যাবে তার সঙ্গে আমার।
তা হতে পারে। যদি তুমি সারাদিন ঐ কাগজের তাড়া বগলে করে রাস্তার এ-মোড় থেকে ও-মোড় আর ও-মোড় থেকে এ-মোড়-খালি খালি তাই করো যদি
তাহলে মোড়ে মোড়ে ঘুরে ঘুরে একদিন হয়ত বা বেঁচে উঠতে পারি চাই কি!
.
৩৬.
সেদিন সন্ধ্যের পরে ফর্বেস ম্যানসনে ফিরতে, দোতলায় উঠবার মুখেই বিপিনদার সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে গেল।
কোথায় ছিলে এতক্ষণ?
বেড়াচ্ছিলাম।
বেড়াচ্ছিলে? সেই দুপুরে খেয়েদেয়ে বেরিয়েছে, আর এখন রাত সাড়ে সাতটা। তাঁর হাতঘড়িটা দেখালেন : কী করছিলে এতক্ষণ?
বেড়াচ্ছিলাম।
এতক্ষণ ধরে বেড়াচ্ছিলে? কোথায় বেড়াচ্ছিল এত এত?
এখানে সেখানে–ইতস্তত। বলতে কোন ইতস্তত করি না।
তাঁর সঙ্গে ছেলেটি তাঁর কানে কানে কী যেন গুজগুজ করল। অনুচ্চ সেই গুঞ্জনধ্বনি দিব্যকর্ণে ধরা পড়ল আমার।
একটা স্পাই। ইলিসিয়াম রো-এ গেছল মনে হয়। তার ফিসফিসানি আমার কানে আসে।
ইলিসিয়াম রো-এ গেছলে তুমি? বিপিনদার চোখ মুখ গলা রীতিমতন কড়া।
কোথায় যে ইলিসিয়াম তাই আমি জানি না। জিনিসটা কী ঐ ইলিসিয়াম? আমি জানতে চাই।
যদি কোনো খাবার জায়গা কিংবা জিনিস হয় তাহলে যেতে কিংবা খেতে আমার দ্বিধা নেই, মনে মনে জানাই।
সেখান থেকেই আসা হচ্ছে আর কোথায় তা তুমি জানো না? বিপিনদা আরো কঠিন।
ন্যাকা! সেই ছেলেটি উতোর গায়–নেকু!
