এমনি একটা পাহারোলার একটা গানের এক কলি এখনো মনে আছে আমার। পার্কে আমাদের ছেলেরা জয়ধ্বনি দিয়ে প্যারেড করছিল, তাতে যোগ না দিয়ে একটা বেঞ্চে চুপ করে বসে আমি দেখছিলাম আর আমার পাশেই বসেছিল হোমরাচোমরা এক কনেস্টবল মাথা নেড়ে বিচিত্র সুরলহরীর এক বাংলা গান ধরেছিল সে।
নৌতুন গাসে নৌতুন নৌতুন
ফুল ফুটিয়েছে!
আরে নৌতুন গাসে নৌতুন নৌতুন
ফুল ফুটিয়েসে…আরে, নৌতুন
গাসে নৌতুন নৌতুন…
পাহারোলা গান গাইছে! তাও আবার বাংলা গান! তার নৌতুনত্ব শ্রীকান্তর কাবুলিওয়ালার গানের মতই চমৎকৃত করেছিল আমাকে।
সেখানেই প্রায় আমার সমবয়সী একটি ছেলের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল আমার। খবরের কাগজ বেচত সে। হিন্দুস্থানীদের মতন বাঙ্গালীর ছেলেকে অমন অল্পবয়সে এই হকারের কাজে দেখা সেই আমার প্রথম।
আমায় অমনি অমনি সব কাগজে চোখ বুলোতে দিত সে। ভাব হয়েছিল তার সঙ্গে। প্রথম দিন তো চমকেই গেছলাম আমি আরে, বসুমতীর আবার এ কী চেহারা।
অবাক হবার মতই বটে। যে বসুমতীর আধখানায় শুয়ে বাকী অর্ধেক গা-মুড়ি দেওয়া যায়, তার এই বেজায় বেটেখাটো আবির্ভাব।
কী আবার চেহারা! ছেলেটি বলল : বসুমতী তো এইরকমই। চিরকালই এই রকম। সেও কম অবাক হয়নি আমার বিস্ময়ে।
আমার বিস্ময়ের কারণ ব্যক্ত করার পর সে জানালো, আরে, সে হচ্ছে গে সাপ্তাহিক বসুমতী, মফস্বল সংস্করণের, আর এটা যে দৈনিকতা দেখছ না! সব দৈনিকেরই এইরকমই চেহারা এখন।
দেখলাম বটে, আনন্দবাজার, অমৃতবাজার সব অভিন্ন আকারে প্রকাশিত। ভারতবর্ষই যেকালে নতুন রূপ ধরতে যাচ্ছে তখন বসুমতী যে চেহারা পালটাবে তা আর বিচিত্র কী?
গোটা দুনিয়াটাই পালটাতে যাচ্ছে গান্ধিজীর মাহাত্মে।
তুমি এই বয়সে কাগজ বেচছ যে? ইস্কুলে পড়ো না?
পড়ি বই কি। মতি শীলের কলেজে পড়ি আমি। আর অবসরের সময় এই কাগজ বেচে দু পয়সা উপায় করি।
কলেজে পড়ো তুমি? বলল কী হে? বিস্ময়ের ওপর বিস্ময়!–তুমি যে আমার চেয়েও ছোট গো!
এমন কি আর ছোটো! তাছাড়া, নামে কলেজ হলেও আসলে ওটা আমাদের ইস্কুলই। ফ্রী ইস্কুল। সব ছেলেই বিনা বেতনে পড়তে পায় সেখানে। ছেলেটি জানায় : মহাত্মা মতি শীলের হয়ত বাসনা ছিল ইস্কুলের সঙ্গে কলেজ করবার, তাঁর মারা যাবার ফলে সেটা আর হয়ে ওঠেনি বোধ হয়।
তাই বলো। তা বেশ। তা, এই কাগজ বেচে কিরকম উপায় হয় তোমার?
মন্দ নয়। প্রত্যেক কাগজে এক আধলা। শতকরা পঁচিশ হচ্ছে আমাদের কমিশন দুপয়সা দাম তো কাগজের। একশ কাগজ বেচতে পারলে সাড়ে বারো আনা লাভ।
তাই নাকি? খুব লাভ তো। ভালো তো খুব।
চার-পাঁচশ কাগজ দেখতে না দেখতে কেটে যায়। কাগজ পাওয়াই দায়। কাগজের জন্যে রোজ সকালে মারামারি বাঁধে। তা জানো?
তাই নাকি? কোথায় বাধে মারামারিটা? আমার কৌতূহল।
কাগজের আপিসে আপিসে। আমি ভোর বেলায় উঠে গিয়ে কাগজ নিয়ে আসি লাইন লাগিয়ে–আর সব হকারও থাকে সেই লাইনে বেশি কাগজ পাবার জন্য সবাই কাড়াকাড়ি লাগায়।
আমি যদি কাগজ বেচি? বেচতে দেবে তারা আমাকে?
কেন দেবে না? যে যাবে, যে চাইবে, তাকেই দেবে।
নিয়মটা কি শুনি তো, ঐ কাগজ পাবার? খুব সকালে গিয়ে ঐ লাইন লাগাতে হয়–এই?
কমিশন বাদে পুরো দামটা জমা দিয়ে ফাগজ নিতে হয় এই হচ্ছে নিয়ম। এছাড়া কিছু নয়! সে বলে : আর তার জন্যেই পড়ে যায় কাড়াকাড়ি।
হোক গে কাড়াকাড়ি। মারামারি বাধে না তো? মারামারির মধ্যে যাব কেন আমি? নিক না সবাই কাগজ, যার যত খুশি আপত্তি কী? সবার আশ মেটার পর যা থাকবে তার থেকেই নেব না হয়। মারামারির দরকার কী আমার?
তাহলেও লাগবে মারামারি। হিন্দুস্থানী হকাররা সহজে ছাড়বার পাত্র না। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বেচে তারা। সেখানেই বিক্রি হয় বেশি বেশি। আর, বাঙালী ভদ্রলোকরাই তো কেনে যতো কাগজ। বাঙালীর ছেলে দেখলে তার কাছ থেকেই তারা কিনবে। তাই হিন্দুস্থানীরা তাদের ধারেকাছে কোনো বাঙালীর ছেলেকে দাঁড়াইে দেয় না। পাশাপাশি বেচতে দেয় না। দাঁড়ালেই মেরে ভাগিয়ে দেয় তারা। একদিন এমন পিট্টি দিয়েছিল আমায়।…তারপরই আমি হ্যারিসন রোডের মোড় ছেড়ে দিয়ে বৌবাজার পেরিয়ে এই ওয়েলিংটন স্কোয়ারে এসে বেচতে লেগেছি। সব ভালো ভালো কর্নারেই হিন্দুস্থানী বেচনেওয়ালা! আমরা যাই কোথায়? আমাদেরও তো বেচতে হবে, বাঁচতে হবে।
তুমি আমায় নিয়ে যাবে সেই খবরকাগজের আপিসে? আলাপ করিয়ে দেবে কাগজওয়ালাদের সঙ্গে? আমিও বের কাগজ।
নিয়ে যাব না কেন? দুজনে মিলে পাশাপাশি বেচলে জোর পাওয়া যাবে কলজেয়। দুজনেরই বিক্রি হবে…কিন্তু একটা কথা, কাগজ নিতে হলে টাকা জমা দিতে হয় আগে, আপিসেই জমা নিয়ে.থাকে। সে টাকা তুমি পাবে কোথায়?
সে আমি পেয়ে যাব…।
তা তুমি পাবে। আমিই তোমায় দেবোদিতে পারব গোড়ায়। তারপর তুমি সুবিধা মতন সেটা আমায় শুধে দিয়ে।
না, তোমায় দিতে হবে না। একজনের কাছ থেকে কদিন আগে একশ টাকা পেয়েছি না? জামাকাপড় ইত্যাদি সব কিনেটিনেও পঁচিশ-ত্রিশ, টাকার মতন পড়ে রয়েছে এখন। তাতে হবে না?
খুব খুব। কিন্তু তোমার একশ টাকার এত টাকা এই কদিনেই তুমি উড়িয়ে দিলে কী করে?
খেয়েটেয়ে। আবার কী করে? আমি কই : টাকা তো ওই করেই ওড়ায়। খেয়ে ফতুর হয় না মানুষ?
