পিকেটিং নেই, প্যারেড করা নেই। টহল দেওয়া সব চুলোয় গেল, ইলিসিয়াম রো-এ গিয়ে রোজ রোজ এই স্পাইগিরি?…না, না। এখানে থেকে ওসব কাজ তোমার করা চলবে না বাপু।
কোথায় গেছলাম জানতে চান? দেখুন তবে। বলে পকেট থেকে দুখানা সিনেমা টিকিটের কাটা আধখানা ছুঁড়ে দিই সেই সঙ্গে আগাম কাটা নটার শোয়ের পুরো একখানাও।–যদি অ্যালাউ করেন তবে ওই নটার শোয়েও যেতে চাই আবার আরেকটা সিনেমায়।
ছেলেটা টিকিটগুলি কুড়িয়ে নিয়ে বিপিনদার দিকে বাড়িয়ে দেয় তিনি সেদিকে ভ্রূক্ষেপও করেন না।–বুঝেচি। রোজ তিনটে করে সিনেমা দেখা হচ্ছে বাবু? এত টাকা আসছে কোথা থেকে শুনি?
নির্ঘাৎ স্পাই। ফোড়ন কাটে সেই ছেলেটা-টিকিটগুলো নিজের পকেটে পুরে নেয়! সেখান থেকেই আসছে সব। টাকার অভাবটা কী ওর?
কেন, আপনিই তো সেদিন দিলেন আমায় অতগুলো টাকা… কৈফিয়তের সুরে বলতে চাই। মনে নেই?
দেশবন্ধু কি এর জন্যেই টাকা দিয়েছেন তোমাকে? এই সিনেমা দেখবার জন্যে? টাকাগুলো দাও আমায়। আমার কাছে জমা থাক। তিনি হাত বাড়ান।
আমার পকেটের সিন্দুক থেকে বার করে দিই সব–বিন্দুমাত্রই বাকী ছিল আর।
খুচরো-খাচরা মিলিয়ে এ তো দেখছি সাত-আট টাকা মোটমোট? এই মাত্তর? আর সব?
খরচ হয়ে গেছে…খেয়েদেয়ে আর সিনেমা দেখেই উড়ে গেছে। কবুল করতে হয়।
না বাপু, এখানে থাকা আর পোষাবে না তোমার। তোমার সঙ্গদোষে আর সব ছেলেও নষ্ট হয়ে যাবে এখানকার। ঝুড়ির ভেতর একটা পচা ডিম থাকলে ভাললাগুলোকেও পচিয়ে ছাড়ে। সুভাষবাবুর কাছে আমি রিপোর্ট করব। এখান থেকে যেতে হবে তোমাকে।
আমি চুপ করে থাকি, কোন জবাব দিই না। কোথায় আমার কী গলতি হোলো তারই আমি ঠাওর পাই না কোনো।
কী! কথা কইছো না যে
আচ্ছা।
এখানে এসেছে দেশের কাজ করার জন্য। যারা মায়ের পায়ে শৃঙ্খল ভাঙতে যাচ্ছে, তাদের নিজেদের কড়া শৃঙ্খলার মধ্যে থাকতে হয়। উচ্চুঙ্খল হলে চলে না। কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে তারা থাকে। এখানে রোজ বিকেলে প্যারেড করার নিয়ম। রাস্তায় রাস্তায়…
জানি। কিন্তু ওসব কাজ আমার ভাল্লাগে না।
কী তোমার ভালো লাগে তাহলে? ঐ সিনেমা দেখাটা?
গান্ধীজীর জয়ধ্বনি হেঁকে শহরময় টহল দিয়ে বেড়ালে কি দেশ স্বাধীন হবে? কী করে যে তা হতে পারে আমি তো ভেবে পাই না। খালি খালি পা ব্যথা করা কেবল। এই ছাগল চরানোর জন্যেই কি এখানে রাখা হয়েছে আমাদের?
তোমার সঙ্গে আমি তর্ক করতে চাই না। আসছে হপ্তা থেকে বিদ্যায়তনের আদ্য পরীক্ষা শুরু হচ্ছে, সেটা তুমি দেবে। সুভাষবাবু বলেছেন, তোমায় দিতে হবে পরীক্ষাটা। তারপর তোমার যা খুশি তুমি করোগে। এখানকার নিয়মশৃঙ্খলা যদি তোমার না সয়না মানতে পারো তো নিজের পথ দেখতে হবে তোমাকে।
দেখব।
কী করবে? কোথায় যাবে? ভেবেছ কিছু?
ইলিসিয়াম রো-এর পথে। ছেলেটির টিপ্পনি।
ভাবিনি এখনো। ভাববোখন। সময়মতন।
পথ আমার দেখাই ছিল, ভাবাও হয়েছিল, কিন্তু প্রকাশ করাটা সমীচীন বোধ করলাম না। পদ্যাকারে শ্লোকাধারে গাঁথা বাবার কবিতা বইয়ের অসংখ্য সদুপদেশ পড়ে পড়ে আর শুনে শুনে মজ্জাগত হয়েছিল আমার, সারাজীবন ধরে পদে পদে কাজে লেগেছে। তার দুটি ছত্র কখনো আমি ভুলিনিঃ
মনেতে চিত্তিবে কার্য না কবে কথায়।
অন্যতে জানিলে কার্য সিদ্ধি নাহি পায়।
এর আমি কোনোদিন অন্যথা করিনি। তাই, মনে মনে যা আমার ভাবা ছিল, ক্ষণে ক্ষণেই ভেবেছি, নিজের অন্তরালেই তাকে রাখলুম, সম্মুখে ব্যক্ত করলাম না।
আসছে হপ্তায় পরীক্ষাটা চুকে গেলে পর যাবার আগে আমার কাছ থেকে তোমার টাকাটা নিয়ে যেয়ো। আর এর মধ্যে তোমার কিছুর দরকার পড়লে আমার কাছে রেফার করবে, বুঝেচ?
আমার আর কিসের দরকার! বলে আমি চলে আসি।—টাকা নিয়ে আমি কী করব!
রমাকান্ত বলে প্রিয়দর্শন একটি ছেলের সঙ্গে বেশ ভাব হয়েছিল সেখানে আমার (গাঙ্গুলী ছিল বোধ হয় সে, বিপিনদার সঙ্গে সম্পর্কিত না হলেও), সর্বঘটে বিরাজিত তার কাছে গিয়ে বললাম, ঘটনাটা।
এখানে ঐ রকম। এক কথায় সে উড়িয়ে দিল কথাটাই : সবাই এখানে সবাইকে স্পাই বলে সন্দেহ করে। আরও কিছুদিন থাকে না, দেখতে পাবে।
কিন্তু কেন ভাই? ওর কথায় অবাক হয়ে যাই : গান্ধীজীর আন্দোলন তো লুকোছাপা কিছু নেইকো, রাখাঢাকা নেই কিছুই–সবই তো খোলামেলা। স্পাইয়ের এত ভয় কেন এদের তাহলে? স্পাইরা এখানে এসে করবেটা কী, শুনি?
কে জানে! তোমার ওই বিপিনদাই বলতে পারেন। আর ওঁর ওই চেলারাই।
দূর ছাই! এসব আমার ভালো লাগে না একদম। আমি হাঁপিয়ে উঠি।
ভালো না লাগলে চলবে কেন ভাই! নিয়মশৃঙ্খলা তো মানতেই হবে। নিয়মশৃঙ্খলা ছাড়া কি কোনো কাজ চলে? চলতে পারে? বিশেষ করে দেশের শৃঙ্খল মোচনের এত বড়ো একটা কাজ? সেই জন্যেই তো বেপরোয়া হয়েও সাধ করে নিয়মের শৃঙ্খলে আমরা নিজেদের বেঁধেছি, তাই না? সোলজারদের কতো কড়া ডিসিপ্লিনের মধ্যে থাকতে হয় তা জানো?
হয়ত তাই। তাই হবে বোধ হয়। দেশের স্বাধীনতা অর্জন করতে গেলে গোড়াতেই নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে হয়। মাতৃভূমির বন্ধন মোচন করতে হলে নিজেকেই বাঁধা রাখা নিয়ম হয়ত বা। সবার স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের বিরোধ আছে হয়ত কোনোখানে।
কিন্তু দেশের মুক্তির জন্য নিজের অবলুপ্তি–এই অসাধ্য সাধন কি আমার দ্বারা হবার? বাধ্যবাধকতার সাধ্যসাধনা আদপেই আমার ধাতে সয় না যে! কী করে পারব? ছেলেবেলার থেকে বাড়ির আবহাওয়ার বেপরোয়াখানায় বেড়ে উঠে হঠাৎ এখন এত কিছুর পরোয়া করে চলা কি আমার পোষাবে?
