আমাদের ন্যাশনাল কলেজ আছে না? গৌড়ীয় সববিদ্যায়তন। সুভাষ বোস তার প্রিন্সিপাল। সেখানেই। সেইটাই। আমরা কেউ কেউ সেখানে পড়ি, কাজও করি আবার।
কী কাজ করো? কী করতে হয় তোমাদের? আমি জানতে চাই।
দেশের কাজ। স্বাধীনতার কাজ। আবার কী? যা যা করতে বলবেন বিপিনদা, তাই করতে হবে আমাদের। বুঝেছ?
আমার ঘাড় নাড়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিপিনদা বার হয়ে এলেন। বললেন, এস। তাঁর পিছনে পিছনে ট্যাক্সিতে গিয়ে উঠলাম।
দেশবন্ধু সুভাষবাবুকে বলেছেন তোমাকে আমাদের ন্যাশনাল কলেজে ভর্তি করে নিতে। তুমি তো এবার টেস্ট পাশ করে এসেছে, তাই না? তা হলেও, কলেজে পড়তে হলে আদ্য পরীক্ষাটা তোমায় দিতে হবে। সুভাষবাবু তাই বলেছেন। তিনি ভারী স্ট্রং ডিসিপ্লিনের মানুষ। নিয়মশৃঙ্খলা ভাঙার পক্ষপাতী নন। আমিও চাই যে তোমরা নিয়মানুবর্তী হও। পরীক্ষা তোমায় দিতে হবে। আগামী সপ্তাহেই সেই পরীক্ষা। পড়াশুনা তো সব তৈরিই আছে তোমার। পড়তে হবে না আর। সেই এন্ট্রান্স-স্ট্যান্ডার্ডেরই কোশ্চেন পড়বে তোমাদের।
দেবো পরীক্ষা। পরীক্ষা দিতে আমি ঘাবড়াই না। ভয় খাই না। আমি জানাই।
ভয় খাবে কেন! কত পরীক্ষা রয়েছে জীবনে। সব পরীক্ষাই পেরুতে হবে। উতরে যাবে সসম্মানে।
চেষ্টা করব।
হ্যাঁ। তবে কলেজের ক্লাসে তুমি অ্যাটেন্ড করতে পারো এখন থেকেই। তাতে কোনো বাধা নেই। দুপুরবেলায় ক্লাস হয়।
কিসের কিসের ক্লাস? কী রকমটা? আমি জানতে চাই।
তোমার সেই ইস্কুলের মতন নয় কিন্তু। লেকচার শুনতে হয়, নোট নিতে হয় তার। খাতা পেনসিল ফাউন্টেনপেন কিনবে সব। বইপত্তর–যা দরকার পড়বে–অধ্যাপকরা যেসব বইয়ের নাম বাতলাবেন, সে-সবও তোমায় নিতে হবে সমস্ত। কিন্তু সেসব তোমার ওই আদ্য পরীক্ষা পাশ করার পরেই–এখন না।
কারা পড়াবেন? অধ্যাপক কারা?
সুভাষ বোস প্রিন্সিপাল। তিনিও পড়ান। কিরণশঙ্কর রায়, হেমন্ত সরকার এরাও ক্লাস নেন-কে কী পড়ান আমার জানা নেই ঠিক।
একটু গুম হয়ে থাকার পর আমি গুমরে উঠি-পড়ব তো দেশের কাজ করব কখন?
কলেজ তো সেই দুপুরেই। ঘন্টা কয়েকে।
দুপুরে কোনো দেশের কাজ নেই?
সকালে বিকেলে তোমাদের দেশের কাজ।
আবার আমি গুম হয়ে যাই। চুপ করে থাকি তারপর।
কী! কোনো কথা কইছ না যে? পড়তে ইচ্ছে করছে না?
করবে না কেন? কিন্তু-কিন্তু-কিন্তু আবার আমি চুপ।
বলল না। বলেই ফ্যালো! এত কিন্তু কিন্তু কিসের।
পড়বো যে, বইখাতা যে কিবো আমার পয়সা কই?
এই কথা! বলে তিনি পকেটে হাত পোরেন-দেশবন্ধু তোমাকে দেবার জন্য এই টাকাটা দিয়েছেন। এর থেকে তোমার যা যা দরকার, জামাকাপড় বিছানাপত্তর কিনবে সব। খদ্দর কিনতে হবে কিন্তু। খাদি প্রতিষ্ঠানের থেকেই কিনবে-কলেজ স্ট্রট মার্কেট-এ। জায়গাটা যদি তোমার না জানা থাকে, এখানকার কোনো ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে। সেই তোমায় দেখিয়ে দেবে। কোথায় কী পাওয়া যায়, কী কিনতে হবে, সব।
আচ্ছা।
দেশবন্ধুর নোটখানা তিনি আমার হাতে দিলেন-এই নাও। কিনে নিয়ে আজই।
দশ টাকার নোট য্যাতো বড়ো হয়। জানতাম না তো! দেখেই আমার তাক লাগে।
এটা দশ টাকার নোট নাকি? একশ টাকার-দেখছ না?
সেই প্রথম আমার একশ টাকার নোট দেখে ভাবসমাধিতে একশা হয়ে যাওয়া।
তবে প্রথম দর্শন হলেও, প্রথম দর্শনের বোধকরি দর্শনমাত্রেরই প্রথমে একটা আবেশ রয়েছে। প্রায় প্রথম দর্শনের ক্ষেত্রেই বলা যায় বুঝি সেটা। এখনো ঐ একশ দেখলে, অবশ্যি কদাচিৎই ঐ একশ টাকার নজরানা আমার নজরে পড়েছে। তবে কদাচ হলেও, যখনই ঐ বস্তু নিজের করতলে এসছে বা পেয়েছি-এখনও বলতে কি, সেই প্রথম স্পর্শের শিহরণ! সেই রোমাঞ্চ!
ফর্বেস ম্যানসনে পাঁচ-সাতশোর মতন ছেলে ছিল মনে হয়। সবাই তারা কংগ্রেসের স্বেচ্ছাসেবক।
অনেকেই তাদের গৌড়ীয় সর্ববিদ্যায়তনেও পড়ত। সেই সঙ্গে কংগ্রেসের কাজও করত। আমিও তাদের দলে সেই দলে এসে ভিড়লাম।
কয়েকদিন কলেজের ক্লাসে যোগ দিয়েছিলাম মনে পড়ে। কিন্তু বিশেষ উৎসাহ বোধ করিনি। সর্বদাই আমার মন বাইরের জন্য উড়ুউড়ু করত।
বিকেলে আমাদের শোভাযাত্রা করে বেরুতে হতো দল বেঁধে নানান ধ্বনি দিয়ে। বন্দেমাতরম, মহাত্মা গান্ধীজী কি জয়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন কি জয় ইত্যাদি ইত্যাদি। মুহুর্মুহু এইসব আওয়াজ ছেড়ে রাজপথ ধরে কুচকাওয়াজ করে যেতাম আমরা। দুপাশের জনতা দাঁড়িয়ে পড়ত, দেখত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রতিধ্বনিও আসত তাদের দিক থেকে।
কিন্তু দিন কয়েক এই করেই অরুচি ধরে গেল আমার। এ আবার কী কাজ! এই করে কি দেশ স্বাধীন হবে নাকি। এই গলা ফাটিয়ে ডাক ছেড়ে?
এইসব কার্যকলাপের থেকে মাঝে মাঝেই আমি ডুব দিতাম। ডুব সাঁতারে চলে যেতাম, বেশি দূর নয়, সামনের ওয়েলিংটন স্কোয়ারে। বিকেলে সেখানে রাজ্যের ছেলেরা, কচি আর কাঁচা, বালক আর কিশোরের দল মাততো এসে খেলাধূলায়। পার্কের একটা বেঞ্চে বসে বসে সেইসব দেখতাম-ভালো লাগত বেশ।
ফর্বেস ম্যানসনে আমাদের ওপর নজর রাখতে কয়েকজন পাহারোলাও বসে থাকত সেই স্কোয়ারে–তারা কিছু বলত না আমাদের, আমরাও না, তবে মনে হত আমাদের প্রতি যেন তাদের বেশ সহানুভুতি রয়েছে। গান্ধী মহারাজের ভারী ভক্ত ছিল তারা। আমাদের ভলান্টীয়ারদের তারা হোলটীয়ার বলত।
