সত্যি, দেবতার মতই দেখতে বটে। কী মিষ্টি চেহারা যে!
এই যে ভদ্রলোক প্রকান্ড গাড়ি করে এলেন না? ভেতরে গেলেন না? ইনিই হচ্ছেন নির্মলচন্দ্র চন্দ্র। কলকাতার এক নামজাদা অ্যাটনি-জানো?
শুনেছি নাম। তিলক স্বরাজ ফান্ডের মালিক তাই না? ফান্ডামেন্টাল খবরটা সব সময়ই আমার মনে থাকে। নির্মল আনন্দ দেয়।
আর ইনি হেমন্তকুমার সরকার।… ইনি কিরণশঙ্কর রায়। সত্যেন মিত্তির। ইত্যাদি ইত্যাদি। আসতে লাগলেন এক এক করে। চলে যেতে লাগলেন ভেতরে সটান।
আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছি। দেখছি, গল্প করছি।
এবার আমাদের ক্যাপটেন এলেন।
কী নাম ভাই ভদ্রলোকের? লম্বা চৌড়া চেহারা–জ্বলজ্বল করছে যেন।
বিপিনবিহারী গাঙ্গুলী। নাম শোনেননি?
না তো। আমি এক বিপিনবিহারী ঘোষকে জানি। মালদহ জিলা কংগ্রেস কমিটির প্রেসিডেন্ট।
ইনি কোনো ঘোষ নন। ঘোষণা করে ছেলেটা-কলকাতার ভলান্টীয়ার কোরের ক্যাপটেন বিপিন গাঙ্গুলি। আশ্চর্য! নামই শোনননি তুমি এঁর?
আমি লজ্জিত হয়ে চুপ করে থাকি।
বাঘা যতীনের নাম শুনেছ কি?
শুনব না কেন? কে না শুনেছে? বালেশ্বর ফাইটের সেই…!
হ্যাঁ হ্যাঁ, সেই সেই। তাঁরই সহকর্মী এই শ্রীবিপিনবিহারী গাঙ্গুলি। একজন বিপ্লবী নায়ক। এখন গান্ধীমতের অনুবর্তী হয়ে অহিংস পথে এসেছেন।
তাই নাকি? শুনে শ্রদ্ধা হয়।
সত্যি কী আর এসেছেন? ওই বাইরে বাইরে। পুলিসের ছোঁয়াচ এড়াতেই। ভেতরে ভেতরে বিপ্লবের কাজ করছেন আর নিজের দলের জন্যে ছেলে রিক্রুট করে যাচ্ছেন একধার থেকে। যেসব ছেলে এখানে এসেছে, আসছে এখন, তারা সব খাঁটি জিনিস তো।
খাঁটি জিনিস নাকি?
খাঁটি না? দেশপ্রেম খাঁটি নয় তাদের? দেশের সেবা করতে–তার জন্যে প্রাণ দিতেই কি আসছে না তারা? সারা বাংলার সেরা ছেলেরা সব জড়ো হয়েছে এক জায়গায়। স্কুল কলেজ ছেড়ে এসেছে সবাই। তাদের ভেতরে তাঁর দলের ছেলেরাও সব স্বেচ্ছাসেবক সেজে ঢুকে পড়েছে–গান্ধী মহারাজের জয় দিয়ে নিজেদের কাজ গুছিয়ে নিচ্ছে তারা।
শুনে সতীশের কথা মনে পড়ল আমার। মোসোপটেমিয়ার লড়াইয়ে না গিয়ে এখানে থাকলে তারও দেখা মিলত হয়ত এখন। এখানেই মিলত। কে জানে, এই বিপিনবাবুই, কিংবা তাঁর কোনো সাকরেদই তাদের লীডার ছিলেন কি না?
বিপিনদার নাম শোনননি? আশ্চর্য? ছেলেটার বিস্ময়ের রেশ কাটতেই চায় না। শরৎচন্দ্রের বই পড়নি?
পড়ব না কেন? রামের সুমতি, বিন্দুর ছেলে কত বই পড়লাম। কোষ্টা না পড়েছি? পথের দাবী পড়েছো তুমি?
পেলে তো পড়বো। পাবো কোথায়!
কেন, লাইব্রেরীতে? পাবলিক লাইব্রেরীতে পাওয়া যায় সব। সব বই–সবার বই-ই পাওয়া যায় সেখানে। পড়তে দেয় সবাইকে।
আমাদের দেশে কোনো পাবলিক লাইব্রেরী নেই ভাই। বাড়ির লাইব্রেরী আছে বটে, তবে সবার নয়, কারো কারো। কেউ কেউ হয়ত পড়তে দেয়–চাইলে পরে। কাউকে কাউকে দেয়, সবাইকে না।
দেয় না?
না। কেন দেবে? পড়তে নিয়ে আর তারা ফেরত দেয় না যে রহস্যটা ফাঁস করি : বাবা বলেন, বই আর বউ পরের হাতে একবার গেলে আর ফিরে আসে না কখনো। বেহাত হতে হতে কোথায় যে চলে যায়, পাত্তাই মেলে না।
এখানে সবাইকেই দেবে। যে মেম্বার হবে, তাকেই। বীন স্ট্রীটে হীরণ লাইব্রেরী একটা আছে, আমি তার মেম্বর।
আমাকে তারা মেম্বর করবে?
কেন করবে না? মাসে চার আনা চাঁদা, আর ভর্তি হবার সময় জমা দিতে হবে দুটাকা…
টাকা পাব কোথায়? টাকাই নেই আমার।
তবে আর কী হবে? আমার থেকে নিয়ে পোড়ো না হয়।
তুমি তাহলে পথের দাবীটা পড়তে দিয়ো। কী আছে তাতে?
দেশের কথা। বিপ্লবের কথা। কেমন করে করতে হয় বিপ্লব আর বিপ্লবের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়, কাহিনীর মধ্যে দিয়ে বলা সব।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। তার মধ্যে সব্যসাচী বলে একটা অদ্ভুত চরিত্রের বিপ্লবী আছে, তা নাকি ওই বাঘা যতীন আর বিপিনদার মিকশ্চার করে ওদের আদলেই বানিয়েছেন শরৎবাবু।
তবে তো পড়তেই হবে নিশ্চয়।
বিপিনবাবু বেরিয়ে এলেন একটু পরে।–তোমাদের মধ্যে শিবরাম কে? শিবরাম কার নাম?
আমি এগিয়ে গেলাম আমিই শিবরাম।
রেডি হও। আমার সঙ্গে ফর্বেস ম্যানসনে যাবে। বলেই তিনি চলে গেলেন ভেতরে আবার।
ফর্বেস ম্যানসনটা হচ্ছে–ঐ যে ওয়েলিংটন–সেটা? সঙ্গীদের শুধালাম।
ফর্বেস ম্যানসনটা হচ্ছে ওয়েলিংটন স্কোয়ার জানো তো? তার পূর্বদিকের প্রকান্ড বাড়িটাই ফর্বেস ম্যানসন।
ওয়েলিংটন স্কোয়ারটা কোথায়?
ওমা! শুনে যেন তার বিস্ময় ধরে না–তাও তুমি জানো না? স্কোয়ারটা বিধান রায়ের বাড়ির সামনেই। সে খবর দেয় আমায়–ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়।
শুনেই আমি লাফিয়ে উঠি বিধান রায়কে আমি জানি।
কী করে জানলে, কী করে তুমি তাঁকে জানবে! অজ পাড়াগাঁর ছেলে!
জানি হে জানি…পাড়াগাঁর ছেলে, তবে অজ নই। সে এক কান্ড করে জানা। কই, তিনি। তো এলেন না দেশবন্ধুর কাছে? তিনিও তো কংগ্রেসের একজন পান্ডা?
পান্ডাই। তবে ডাক্তার মানুষ, তার সময় কই! কল দিলে তবে আসবেন।
কতো ফী নেন তিনি? তাঁকে কল দিলে কত ভিজিট দিতে হয়?
ওঁর বাড়িতে গেলে বত্রিশ। আর কেউ নিজের বাড়িতে ডাকলে চৌষট্টি।
ও বাবা! শুনেই আমার পিলে চমকায়।
ওমনিও উনি দ্যাখেন আবার–গরিবদের, যারা নাকি টাকা দিতে পারে না। আমাদের সব ওমনি ওমনি।
বটে? ফর্বেস ম্যানসনের মানেটা কী? কী হয় সেখানে?
