ভালো লেগেছিল তোমার? ঐ সাগরসঙ্গীত?
সত্যি বলতে আমার ভালো লাগেনি। বুঝতেই পারিনি আদপে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা যেমন ভালো লাগত, ভালো লাগবার মত, আমার বয়সী, সববয়সী সবারই ভালো লেগে যেত এমনিতেই–তাঁর কবিতা ঠিক তেমনটি যেন ছিল না। নিঝরের স্বপ্নভঙ্গের ন্যায় ছন্দের তরঙ্গে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারত না আমাদের।
আমার বাবার খুব ভালো লাগে আপনার কবিতা-তাঁর কথার জবাবে আমি কই: তিনি বলেন, আপনি রবিঠাকুরের চেয়েও বড়। রবীন্দ্রনাথের কবিতা নাকি মেয়েলি ধাঁচের–তার কোনো মাথামুন্ডু হয় না। মাইকেল হেম নবীন-বাবার মতে এঁরাই সব কবি। মহা মহাকবি। আর তাঁদের পরেই আপনার স্থান। তিনি বলেন।
কোথায় রবিবাবু, কোথায় মাইকেল আর কোথায় আমি! রবিবাবুর কবিতার কি তুলনা হয়? উনি বিশ্বকবিদের একজন। কেবল বাঙালীর নন, সারা বিশ্বের।
কিন্তু বাবা যে বলেন…কবিতা ভালোই বোঝেন তিনি। তিনি নিজেও একজন কবি তো। শিবপ্রসাদ বলে তাঁর একটা ছাপানো পদ্যের বইও আছে, জানেন?
তাই নাকি? তাহলে তাঁর থেকেই তুমি কবি হয়েছে বুঝতে পারছি। তোমার রক্তে ছিল কবিতা। কিন্তু তোমার বাবা যাই বলুন না, ওটা কোনো কথাই নয়। এই জন্যই বলছিলাম, তোমার পড়াশোনার দরকার। কলেজে গিয়ে শেলী বায়রন ব্রাউনিং শেকস্পীয়র কীটস্ পড়লে বুঝতে পারবে কবিতা কাকে বলে–কী বস্তু-কবি কাকে বলা যায়। আর তাঁদের সঙ্গে তুলনা করে বিচার করলেই রবিবাবুর মূল্য বুঝবে তখন।…আমি তাঁদের পায়ের নখের যুগ্যি নই।
প্রতিবাদ করলেন বটে, কিন্তু বাবার কথাটায় যে খুশি হয়েছেন খুব, সেটা ওঁর প্রসন্নতায় বোঝা গেল।
পরের দিন দুপুরে স্টেশন মাস্টারের বাড়ি থেকে এক অন্ন পঞ্চাশ ব্যঞ্জন, বড় বড় মাছের মুড়ো, দই মিষ্টি ইত্যাদি সব এল–ওঁদের জন্য। কালকেই এই আতিথেয়তার উনি আমন্ত্রণ জানিয়ে রেখেছিলেন।
গতকালের ট্রেন ফেলের হেতু নিজেকেই দায়ী মনে করে অনেক ত্রুটি স্বীকার করেছিলেন তিনি। দেশবন্ধুর যাবার খবরটা যদি ঘুণাক্ষরেও তাঁর জানা থাকত, যদি কেউ কাকপক্ষীর মারফতেও একটু আগে জানিয়ে যেত তাঁকে, তাহলে দেশবন্ধুর অপেক্ষায় আরো খানিকক্ষণ ট্রেনটাকে তিনি দাঁড় করিয়ে রাখতেন। কিন্তু কেউ এসে একটা কথাও কয়ে যাননি তাঁকে।
সেই সময়েই আজ দুপুরের এই আতিথ্য স্বীকারের জন্য সপরিবার সনির্বন্ধ তাঁর অনুরোধ। তাঁর ন্যায় দেশবরেণ্যকে তিনি অতিথিরূপে পেয়ে ধন্য হবেন, এই সব বলেছিলেন। তিনি যদি অনুগ্রহ করে…তাঁর ন্যায় নগণ্য লোকের এই আতিথ্য গ্রহণ করেন, তাহলে তিনি কৃতার্থ বোধ করবেন…ইত্যাদি ইত্যাদি।
বিকেলের ফিরতি গাড়ি আসার আগে লোকে লোকে ভর্তি হয়ে গেল প্ল্যাটফর্ম। দেশবন্ধুকে বিদায় সংবর্ধনা জানাতে সবান্ধব বিপিনবাবু এসেছিলেন, এসেছিলেন শহরের গণ্যমান্যরা, ছাত্রছাত্রীর দল আর স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী।
ফার্স্ট ক্লাসের গোটা একটা কামরা রিজার্ভ করে রাখা হয়েছিল তাঁর জন্য। তাঁদের সঙ্গে আমিও সেই কামরায় উঠে পড়লাম। বিপিনবাবুরাও উঠলেন।
স্বেচ্ছাসেবকবাহিনী সার বেঁধে দাঁড়ালো স্টেশনে। দেশবন্ধু কী জয়, মহাত্মা গান্ধীজী কী জয়, বন্দেমাতরম ধ্বনিতে মুখর হয়ে গমগম করতে লাগল প্ল্যাটফর্ম।
গাড়ি ছাড়বার মুখে কামরার থেকে নেমে গেল সবাই, আমি থেকেই গেলাম সেখানে। কেউ লক্ষ্যও করল না সেটা। এমনকি বিপিনবাবুও আমার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করলেন না।
কারো পৌষ মাসে কারো সর্বনাশ হয় শুনেছি, কিন্তু কারো ব্যর্থতা কি অপর কারো সার্থকতা নিয়ে আসতে পারে? কে জানে! কিন্তু দেশবন্ধুর সেদিনের সেই ট্রেন ফেলটা না ঘটলে আমার জীবনের ট্রেন পাশ করত না। আমার ভবিষ্যতের পাশপোর্ট পেতাম কিনা সন্দেহ। তাঁর সেদিনের সেই বৈফল্যই আমার জীবনের যা কিছু সাফল্য নিয়ে এসেছে-ঠিক পুরোপুরি না হলেও, আমার নবজীবনের রথযাত্রা শুরু হয়েছিল সেইদিনই।
ফেলিওর ইজ দ্য পিলার অব সাকসেস বলে যে, মিছে না!
.
রসা রোডে দেশবন্ধুর বাড়িটা, যা এখন কিনা চিত্তরঞ্জন সেবাসদন, তার গায়ে কেমন যেন একটা মায়া মাখানো ছিল। সেখানে গিয়েই আমার স্বপ্নের ঘোর লাগল, কে যেন মায়ার কাজল বুলিয়ে দিল আমার দুচোখে। অবাক হয়ে চারিদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম।
অনেকখানি জায়গা জুড়ে বাড়িটা। ঘুরে ঘুরে দেখলাম। চারধারে বিস্তর গাছ-গাছালি। নারকেল গাছও ছিল কয়েকটা-পেছনে একটা ছোটখাট পুকুরের মল, একধারে আবার শিবমন্দির। এইরকম ছিল বলে আমার মনে পড়ে এখন।
যেতেই সেখানকার স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে ভাব হয়ে গেল অল্পক্ষণেই।
দেশবন্ধুর আগমনবার্তা পেয়ে নেতারা সব আসতে থাকলেন একে একে। একেকটা মোটর এসে দাঁড়াতে লাগল গাড়ি-বারান্দাটার তলায়। ছেলেগুলো চিনিয়ে দিতে লাগল আমায়।
ইনি কে এলেন জানো? মৌলানা আবুল কালাম আজাদ।
আবুল কালাম আজাদ? নাম শুনেছিলাম। খ্যাতি জানা ছিল খবরের কাগজের খাতিরে।
কী সম্ভ্রান্ত চেহারা, চালচলন। দেখলেই সম্ভ্রম জাগে। মোগল বাদশাদের মই মনে হয়–যেন দিল্লীর তখত্ত তাউস থেকে সদ্য নেমে আসছেন।
ইনি সুভাষচন্দ্র বোস। বিলেত থেকে আই সি এস পাশ করে…
জানি জানি, বলতে হবে না তোমায়।
এই সেই সুভাষ বোস? যার কথা রিনি তার চিঠিতে জানিয়েছিল আমায়। তার সেই প্রথম আর শেষ চিঠিতে।
