খেয়াঘাট পর্যন্তই যাওয়া গেল গাড়িতে, তারপরে ফেরি পেরিয়ে একটুখানি রাস্তা হেঁটেই পোঁছলাম আমরা স্টেশনে।
তাঁর আসার দিন কাল কী ভিড়, কী ভিড়! আর আজ এখন, যাবার কালে, লোকজন কেউ কোথাও নেই! বোধহয় জানেও না কেউ যে তিনি চলে যাচ্ছেন। ব্যান্ড বাজনা, স্বেচ্ছাসেবকের শোভাযাত্রা, জনতার জমায়েত-কিছু না!
শারদোৎসবের কথা মনে পড়ল আমার। আগমনীর দিন কী সমারোহ-কী না ঘটা।
বিসর্জনের দিন প্রতিমা বওয়ার লোকই পাওয়া দায়।
স্টেশনে গিয়ে জানা গেল, কলকাতার গাড়ি ছেড়ে গেছে খানিকক্ষণ আগেই। ফিরতি ট্রেন সেই পরের দিন। কাল বিকেলে।
দেশবন্ধু স্টেশনেই থাকলেন ফার্স্টক্লাস ওয়েটিং রুমে। শহরে আর ফিরে গেলেন না। কী জানি, কালকেও যদি ফের ট্রেন ফেল করে বসেন।
কলকাতায় সেদিন না যেতে পেরে তাঁর কাজের কতো ক্ষতি হল নিশ্চয়, কিন্তু মুখে একটু বিরক্তির চিহ্নও দেখা গেল না।
পার্সনাল ভলান্টিয়ার আমি, তার পার্শ্বচর হয়ে রইলাম স্টেশনেই।
রাত্তিরে দেশবন্ধু হানটলি পামারের টিন থেকে খানকয় বিস্কুট আর এক গেলাস দুধ খেলেন মাত্র। বাসন্তীদেবী কী খেলেন দেখিনি।
বিপিনবাবু হাঁড়ি হাঁড়ি ভর্তি মালদার খাজাগজা কী সব দিয়ে গেছলেন দেশবন্ধুর জন্য। বাসন্তীদেবী তার থেকে বার করে খেতে দিলেন আমায়।
খাজা দিলেন গোটা কতক, আর দিলেন দুধের সর কৃষ্ণনগরের মতন সরপুরিয়া নয়, পুরু সর। বিপিনবাবুর অবদান। সেই সরের সঙ্গে রসকদম কুঁচিয়ে সুমধুর সম্মেলনে বাবার মহাপ্রসাদ বানিয়ে খাওয়া গেল অনেক দিনের বাদ।
সন্ধ্যের দিকে ওয়েটিং রুমের দুখানা ইজিচেয়ারই বার করে প্ল্যাটফর্মের ওপরে এনে রেখেছিলাম। দেশবন্ধু আর বাসন্তীদেবী এসে বসলেন সেখানে।
কাছেই একটা টুল নিয়ে বসেছিলাম। তাঁরা দুজনে কত কী আলোচনা করছিলেন, শুনছিলাম বসে বসে–সব ঠিক মতন বুঝতে না পারলেও।
যখন ওঁদের মধ্যে নিতান্ত ঘরোয়া কোনো কথা হচ্ছিল, তখন আমি উঠে গিয়ে প্ল্যাটফর্মে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম, এধার ওধার।
হঠাৎ দেশবন্ধু ডাকলেন আমায়-চাঁচলের রাজার সঙ্গে তোমাদের কী যেন সম্পর্ক আছে না? বিপিনবাবু বলছিলেন আমাকে। কী সম্পর্ক?
নামমাত্রই, ও কিছু না। এক কথায় আমি উড়িয়ে দিয়েছি কথাটা।
চাঁচলের রাজা দেশের জন্য এককালে প্রচুর টাকা দিয়েছেন, আমি জানি। বিপ্লবের কাজেও গোপনে অনেক টাকা ঢেলেছেন। বিনয় সরকারের কাছে শুনেছিলাম। এখন সরকার থেকে রাজাবাহাদুর খেতাব পাবার পর একটু নাকি রাজভক্ত হয়ে পড়েছেন, আজকাল। তবে সেটা হয়ত বাহ্যতই হবে।
তা হবে। বলেই আমি থামলাম। আমি সেসবের কিছুই জানতাম না।
কলকাতায় যাবে তুমি, আমার সঙ্গে! সেখানে পড়বে। পড়াশুনা ছেড়েচ কেন?
গান্ধীজী যে বলেছেন, এডুকেশন মে ওয়েট বাট স্বরাজ ক্যানট। আর বিপিনবাবু বলেছেন, ইরেজের গোলামখানা থেকে বেরিয়ে এসে তোমরা সবাই দেশের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ো?
দেশের কাজ আর লেখাপড়া কি আলাদা? দুটো কাজ কি একসঙ্গে হয় না? পড়াশুনা করাও তো দেশের কাজ। লেখাপড়া না শিখলে মানুষ হবে কি করে? আর, মানুষ না হলে কি দেশের কোনো কাজ করা যায়? মানুষ হওয়ার কাজ, মানুষ গড়ার কাজ আর দেশের কাজ সবই আমাদের সমানে চালাতে হবে–সমস্ত চলবে একসঙ্গে।
আমি চুপ করে শুনছিলাম।
মানুষ গড়ার কাজ আমরা বন্ধ রাখিনি। গৌড়ীয় সববিদ্যায়তন বলে ন্যাশনাল কলেজ খোলা হয়েছে কলকাতায়। ইস্কুল কলেজ ফেলে যেসব ছেলে স্বেচ্ছাসেবক হয়ে এসেছে, তারা সবাই সেখানে থাকে-দেশের কাজও করে, আবার সেই কলেজেও পড়ে। সুভাষ কলেজের প্রিন্সিপাল। শুনেছি তুমি টেস্ট দিয়েছিলে নাকি এবার–সুভাষকে বলব তোমায় কলেজে ভর্তি করে নিতে। কেমন?
আচ্ছা।
পড়াশুনা করবে, মানুষ হবে। মানুষ না হলে কিছুই হবে না। মানুষ হওয়ার তিনটে লক্ষণ : স্বাস্থ্য বিদ্যা আর অর্থ। স্বাস্থ্য আর বিদ্যা না থাকলে টাকা রোজগার করা যায় না এবং টাকা না হলে নিজের পায়ে দাঁড়াবে কি করে? যে নিজের পায়ে দাঁড়ায়নি, সে কি এগুতে পারে কখনো! আর যে নিজেই এগুতে পারে না, সে তার দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে কি করে? অতএব… বুঝতেই পারছো?
আমি ঘাড় নাড়ি। বুঝতে পারি আর না পারি।
কী যেন নামটা তোমার…নামটা কী যেন তোমার…
শিবরাম চক্রবর্তী।
শিবরাম চক্রবর্তী। শিবরাম চক্রবর্তী, নামটা কেমন শোনা শোনা। মনে হচ্ছে… কোথায় যেন নামটা দেখেছি আমি তোমার!
কোথায় দেখবেন–আর!
কোনো কাগজে-টাগজে দেখেছি বোধ হয়। কোথায় যে, মনে করতে পারছি না এখন।
দেখলে হয়ত ভারতীতেই দেখে থাকবেন। অপরাধীর মতন কবুল করি।
তুমি লেখটেখ নাকি? কিছু লিখেছিলে বুঝি ভারতীতে? কোনো গল্প-টল্প?
দু-একটা ছোট্ট কবিতাই কেবল বেরিয়েছিল আমার, ঐ কাগজে।
কবিতা? হ্যাঁ…বললেন দেশবন্ধু–হ্যাঁ, কবিতাই তো! মনে পড়েছে এখন। কবিতাটা কী তা অবশ্যি স্মরণে নেই, তবে ভালোই লিখেছিলে মনে হয়। ভালো না লাগলে তোমার নামটা মনে থাকত না আমার।
না না। তেমন ভালো কিছু লিখিনি, তবে নামটাও তত আমার বিদঘুঁটে, সেজন্যেও কারো মনে থেকে যায়।
শুনে, তিনি হাসলেন–ও, তুমি কবি? ছোটখাট একটা কবিই তুমি তাহলে?
আপনার কবিতার বই আমি পড়েছি। সাগরসঙ্গীত। আমাদের বাড়িতে আছে। আমার প্রসঙ্গটা আমি চাপা দিতে চাই।
