নেতৃত্বের খোঁচা খেতে খেতে যেতে হয় আমাকে।
.
৩৫.
জেলার হাটে হাটে সাতদিন ধরে ঢোল শহরতে দেশবন্ধুর আগমনবার্তা জানানো হয়েছিল। যেদিন তিনি এলেন, এক বিরাট উৎসবের মহরৎ সুরু হয়ে গেল যেন। সারা জেলাটাই এসে ভেঙে পড়লো মহানন্দার পাড়ে। বিরাট এক জনসমুদ্র-দশ বিশ পঞ্চাশ কতো লাখ কে জানে-একজনকে শুধু চোখের দেখা দেখার জন্যে এত জন! এক জায়গায় এহেন জনতা এর আগে আমি কখনো দেখিনি।
চাঁচলের বুধবারি হাটে পঞ্চাশখানা গাঁয়ের লোক জড়ো হতে দেখেছি, মহরমের দিন। রাজবাড়ির বারান্দায় বসে সামনের বিরাট প্রাঙ্গণে একশ দলের লাঠিখেলার জমায়েতও দেখেছিলাম–ব্যান্ডবাদ্য আর রকম-বেরকমের তাজিয়ার সঙ্গে মিলিয়ে, কিন্তু এই বিপুল সমাবেশের সাথে সে সবের তুলনাই হয় না।
আনন্দের সাগর হতে এসেছে আজ বান–গানেই শোনা ছিল, কানেই শুনেছিলাম, চোখের ওপর দেখলাম এখন! সামুদ্রিক জলোচ্ছাসের মতই দিগদিগন্তব্যাপী এই জনতা চারি ধারে শুধু লোক আর লোক। নারী পুরুষ বালক, চাষী মজুর ভদ্রজন–আপামর সর্বসাধারণের বাদ নেই কেউ।
ফেরিঘাট পেরিয়ে দেশবন্ধুকে শোভাযাত্রা করে নিয়ে আসা হোলো শহরে–সেখানে আমাদের স্বেচ্ছাসেবকদেরই অগ্রাধিকার। কিন্তু বিপিনবাবুর আস্তানায় পৌঁছে আর আমরা পাত্তাই পেলাম না তাঁর। তিনি বিশ্রাম করতে লাগলেন বাড়ির ভেতরে। শহরের মান্যগণ্য। সম্ভ্রান্ত লোকরা সব আসতে লাগল মাঝে মাঝে তাদের সঙ্গে নিভৃত আলোচনা হচ্ছিল তাঁর। আমাদের ওপর ভার ছিল শুধু সদরে ভলান্টিয়ারি করার। দেশবন্ধুর জয়ধ্বনি নিয়ে তা-ই আমরা মহাসমারোহে করছিলাম।
দেশবন্ধুর সঙ্গে সহধর্মিণী বাসন্তী দেবী এসেছিলেন, সঙ্গে ছিলেন ছোট বড় নেতারাও। বিকেলে সভা বসলো-বিরাট জনসভা। সে সভায় দেশবন্ধু সামান্য কিছু বললেন, কী বলেছিলেন মনে নেই এখন। সুরেন সেন নামে এক নেতা, তৎকালে বেশ প্রসিদ্ধই তাঁর বক্তৃতাটাই হয়েছিল সবার হৃদয়গ্রাহী। বেশ বাগ্মী তিনি। আর বক্তৃতা করেছিলেন পন্ডিত মোদাচরণ সামাধ্যায়ী–তিনিও দেশবন্ধুর সাথে এসেছিলেন। আর রাজশাহীর কলেজ ছেড়ে সদ্য বেরিয়ে আসা মোহিত মৈত্র, ফোর্থ ইয়ারের ছাত্র বোধকরি তখন জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের বৃত্তান্ত দিয়ে তাঁর বক্তৃতাতেও উদ্বেল হয়েছিল অনেকে, মনে আছে।
রাত্তিরে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের জন্যে লোক সংস্কৃতির আয়োজন হয়েছিল একটা। মালদহের বৈশিষ্ট্য গম্ভীরা গানের আসর বসেছিল বিপিনবাবুর বাড়ির প্রাঙ্গণে। আমন্ত্রিত হয়ে শহরের উল্লেখযোগ্য প্রায় সবাই এসে জমেছিলেন, জেলার ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবও, এমনকি! দেশবন্ধুর পাশের আসনেই বসেছিলেন তিনি। মাঝে মাঝে আলাপ আলোচনাও চলছিল দুজনের মধ্যে, দেখলাম।
বোলভাইয়ের পালা শিবো হে! দিয়ে শুরু হয়ে নানান সামাজিক সমস্যায় গিয়ে পড়ে। পারিবারিক, সামাজিক, রাজনীতিক কিছুই বাদ যায় না–সে সব গানে সমস্তই উপস্থিত; নানা রঙ্গের মধ্যে সাময়িক ঘটনাপ্রবাহের ইতিও থাকত সেই সঙ্গে। যেমনটা এককালে কলকাতার রাস্তায় পয়লা বোশেখের গাজনের যাত্রা-গানে দেখেছিলাম।
সেদিনকার আসরের দু-একটা পর্ব আমার মনে পড়ে এখনো। দু-একটা কলির রেশ এখনো মনের পলিমাটিতে তলিয়ে যায়নি একেবারে।
মজার একটা পালাই ছিল সেটা।
হঠাৎ গেঁয়ো চাষীগগোছের একজন, মাতালের মতন ভাবভঙ্গী করে গাইতে শুরু করল এসে–তার ছেলেকে সম্বোধন করেই
ওরে বাছা সোনার চান তোর মাকে যাইয়া ডাইকা আন।
সোনার চাঁদ তখনই লাফাতে লাফাতে ডাকতে গেল মাকে। মা আর কোথাও না, সেই আসরেরই এক কোণে ঘাপটি মেরে বসেছিল, উঠে দাঁড়িয়ে মুখ ঝামটা দিয়ে আরম্ভ করল অমনি
মরে যা পাঁঠা /গারোস্থালি/ব্যাচে খালি/জল খাবার নাই লোটা! মরে যা পাঁঠা!
তারপরে, গানের সঙ্গে সমতালে নেচে, তাড়ি-নেশাতুর তার পতিদেবতাকে তাড়না করে আসরময় যেভাবে ছাগল তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াতে লাগল–সে এক দৃশ্যই!
তারপরের পর্বটা আরও মজাদার! একটা লোক, স্বাভাবিকই হবে বোধ হয়, হাকিম সাহেবকে দেখে না তক্ষুনি মুখে মুখে গান বেঁধে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে অঙ্গভঙ্গী সহকারে ঘুরেফিরেই গাইতে লাগল :
চিনিতে পারো কি এদের?/ কিসকিনধায় বাস/এই বেটারাই করেছিল/রাবণ রাজার সর্বনাশ। /মা জানকীর কোপে পড়ে/মুখখানি গিয়েছে পুড়ে/লেজটি হয়েছে বেঁড়ে/বসে আছেন ভম্বল দাস।
ইঙ্গিতের খোঁচাটায় সভার সবাই খুব আমোদ পেলেও (আমরা তো যার পর নাই!) দেশবন্ধু দেখলাম গম্ভীর হয়ে গেলেন বেশ।
সাহেব অবশ্যি গানের মর্ম বোঝেননি কিছুই। বাংলাভাষাটা কাজ চালানো গোছের রপ্ত হয়ত তাঁর থাকলেও, ভাষাৰ্থ বুঝতে পারলেও, ভারতীয় পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে জড়িত ভাবার্থ তাঁর হৃদয়ঙ্গম হবার নয়। তাঁর মুখের কোন বিকার দেখা গেল না।
পরের দিনটাই আবার দেশবন্ধুর কলকাতায় ফেরার।
তিনি একাই ফিরে যাবেন সস্ত্রীক। মোহিতবাবু আর সমাধ্যায়ীমশাই কংগ্রেস সংগঠনের কাজে থেকে যাবেন আরো দিন কয়েক।
নির্ধারিত ক্ষণে দেশবন্ধু বেরুলেন–বোধ করি, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের সৌজন্যে তাঁর মোটর গাড়িটা পাওয়া গেছল, তাতেই চেপেসোফারের পাশে আমি বসলাম দেশবন্ধুর পার্সনাল স্বেচ্ছাসেবক হয়ে, আর পিছনে বসলেন বাসন্তী দেবী, দেশবন্ধু আর বিপিনবাবু।
