নিমাসরাই–এই হাঁকডাকে বিপিনবাবুর ঘুম ভাঙলো আপনার থেকেই।–নিমাসরাই। নিমাসরাই কেন? এই-এই!! ওঠো ওঠো। আমাদের ইস্টিশন ছাড়িয়ে এসেছি। এখানেই নামতে হবে এখন। নামো নামো। চটপট!
বলতে না বলতেই আমি নেমে পড়েছি তড়াক করে, সঙ্গে সঙ্গে তিনি নামিয়ে দিয়েছেন তুলোর বস্তাটাও। চরকা হাতে নিজেও নেমে এসেছেন তৎক্ষণাৎ।
ইস্! আমাদের স্টেশনটা কখন যে পেরিয়ে গেল, টেরই পেলাম না। যা এখান থেকেও যাওয়া যাবে ইংরেজবাজার। নদী পার হয়ে অনেকটা হাঁটতে হবে, তা হোক। ঠিক সময়েই গিয়ে পৌঁছব সেখানে।
আমি খুব হাঁটতে পারি। জানালাম।
ইংরেজবাজার ইস্টিশনে নেবার জন্য আমার লোকজন এসেছিল নিশ্চয়। কিন্তু আমি যে এদিকে গান্ধিজীর পদাঙ্ক অনুসরণ করে থার্ড ক্লাসে ভ্রমণ করছি তা তো তারা ভাবতে পারেনি। ফাস্ট ক্লাস সেকেন্ড ক্লাস কামরায় আমায় না পেয়েই ফিরে গেছে। এদিকে ইস্টিশনে কুলিটুলি মেলে না, রাতবিরেতে লোকজনও বড় একটা থাকে না কেউ। কী করা যাবে? তুমি এই তুলোর কস্তাটা ধরো, আমি চরকাটা হাতে নিলাম।
ঐ তুলোর বস্তা? আমার মনের অবস্থার তখন তুলনা হয় না।
বেশি ভারী হবে না। মণ খানেক বড় জোর। বলে না সেই তুলোর বস্তাটা তিনি আমার ঘাড়ে তুলে দিলেন।
তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি। কথাটা মিথ্যে নয়। এবং বস্তা সম্বন্ধেও সেকথা খাটে বোধ হয়।
যাই হোক, মণ খানেকের দুরবস্থা নিজের ঘাড়ে চাপিয়ে সেই আমার একমনে দেশের সেবায় লাগা-সর্ব প্রথম।
এখান দিয়ে আদিনা গৌড় ইত্যাদিতেও যাওয়া যায় তা জানো? এই পথ ধরেই। যেতে যেতে তিনি কন : বাংলার আদি রাজধানী গৌড়-আদিনা। জানো বোধ হয়?
আদি রাজধানীকে আদিনা বলার মানে কী? আমি জানতে চাই। কেমন যেন খটকা লাগে আমার।
আমি জানি না।
আমার মনে হোলো, আদিও যেমন ঠিক নয়, তার আগেও আদি থাকে আবার। অন্তত যেমন একেবারে অন্তিম হয় না, তার পরেও অনন্ত থেকে যায়। তেমনি আমাদের এই বঙ্গমাতাও। সেইরকমই বুঝি আদি অন্ত নেই আমাদের বাংলা মায়ের না-রূপের না-রহস্যের।
সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছিল বুঝি বাংলার আদি রাজধানী এই আমাদের।
আদিনার মসজিদ খুব বিখ্যাত। গৌড় একটা দর্শনীয় স্থান। গৌড়ের রাজা ছিলেন লক্ষ্মণ সেন, ঐতিহাসিক পুরুষ। সেকালের অনেক ধ্বংসাবশেষ আছে সেখানে। গিয়েছ কখনো?
গেছলাম একবার ছোটবেলায় মামার সঙ্গে। আমি জানাই। রামকেলীর মেলায় মামা নিয়ে গেছিলেন আমায়। হরিভক্ত তো মামা আমার। আর রামকেলী একটা বৈষ্ণর সম্মিলনী। সেবার মেলাটেলা দেখে মামা বললেন যে, চ। এই সুযোগে গৌড়টাও দেখে আসা যাক। প্রায় সন্ধ্যেবেলায় সেখানে আমরা পৌঁছেছিলাম। মহারাজ লক্ষ্মণ সেনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমাদের।
অ্যাাঁ? কী বললে? তিনি যেন চমকে উঠলেন। কোন্ লক্ষ্মণ সেন?
সেই ঐতিহাসিক লক্ষ্মণ সেন। তিনি কি বেচেঁ আছেন এখনো, আপনার মনে হয়? তবে সেই ভদ্রলোক কিন্তু সেই পরিচয়ই দিলেন আমাদের। তাঁর মেয়ের সঙ্গেও আলাপ করিয়ে দিলেন, যার নাম নাকি সুলক্ষণা। তার নামেই তিনি নাকি ঐ জায়গাটার নাম রেখেছেন লক্ষণাবতী!
লক্ষণাবতী! লোকটা পাগল।
আমারও তাই মনে হয়েছিল। বেশ গোলমাল ছিল তার মাথার। সেই রকমই দেখলাম আমরা। এই মাথাটা খুলছেন এই আবার পরছেন–নিজেরই আস্ত মাথাটাই–অনেকটা ঠিক পাগড়ির মতই যেন। সত্যি, তার মাথার ঠিক নেই একদম।
তোমরা ভূত দেখেছিলে আমার ধারণা, লক্ষ্মণ সেন নন, তাঁর ভূত।
তাও হতে পারে। ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত মনে হয়েছিল আমার। আর, বলতে কি, ভারী অদ্ভুতভাবেই তিনি দেখা দিয়েছিলেন। তাঁর সেই মেয়েও…বলব ঘটনাটা?
না। না। বলতে হবে না। এখন নয়, অন্যদিন শুনবখন। দিনের বেলায় সেসব শুনতে হবে… রাতবিরেতে। বাবা! গা ছমছম করে না? রাত্তিরে ভূতপ্রেতের কথা ভাবাই যায় না বাপু! … ভয় করছে না তোমার?
আপনি আছেন যে! সেদিন মামা কাছে ছিল বলে ভয় করেনি। কেউ সঙ্গে থাকলে একদম আমার ভয় করে না।
সেই দুর্লক্ষণ সাক্ষাতের কাহিনী ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েটেড পাবলিশিং প্রকাশিত আমার ভূতুড়ে অদ্ভুতুড়ে বইয়ে রয়েছে-এখানে তার সবিস্তার নেহাত বাহুল্য মাত্র।
সরু ফালির মতন রাস্তা ধরে আস্তে আস্তে এগুচ্ছিলাম আমরা। নির্জন পথ অন্ধকার। দুধারে গাছপালা ঝোঁপঝাড়। অনেকটা জঙ্গলের মতই–তার ভেতর দিয়ে চলেছি। চারধার যেন থমথম করছে।
আমার গা ছমছম করছিল বলতে কি!
ভারী বস্তা ঘাড়ে যতটা পারি তাঁর কাছাকাছি থাকার চেস্টা করছিলাম।
চরকাটা হাতে ঝুলিয়ে পথ দেখিয়ে বিপিনবাবু আগে আগে যাচ্ছিলেন। আর তাঁর চরকার টাকুর সূচ্যগ্র ভাগ ঠিক পিনের মতই মাঝে মাঝে বিধছিল আমাকে।
যেতে যেতে অমন উঃ আঃ করছ কেন হে? তিনি জিগ্যেস করেন : আর এমন করে ঘাড়ের ওপরেই বা এসে পড়ছো কেন আমার, বল তো?
পিনবিদ্ধ হয়ে অস্ফুট আর্তনাদ করে থাকব হয়ত। বস্তা ঘাড়ে আমি ঘাড় নাড়ি-না না, উঃ আঃ করিনি তো। কখন করলাম?
ভয় করছে বুঝি তোমার? না, না–ভূতপ্রেত বলে কিছু নেই, বুঝেছ?
না, না, ভয় কিসের! আপনি আছেন না সঙ্গে? কেউ কাছে থাকলেই হোলো। একবার ভাবলাম, টাকুর টক্কর থেকে বাঁচতে পিছনে না পড়ে থেকে আমিই না হয় এগিয়ে যাই বরং। কিন্তু উনি যে নেতা-নেতাকে ছেড়ে যাওয়া যেমন উচিত নয়, তাঁকে ছাড়িয়ে যাওয়া তেমনি ঠিক হবে না নিশ্চয়? ইত্যাকার অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করে পিছু পিছুই যেতে হয় আমায়।
