তাহলেও ভাই, স্যাকরিফাইস ইজ স্যাকরিফাইস। তা কখনো বৃথা যায় না।
যারা করেনি তারা তো বটেই, কিন্তু যারা ছিটেফোঁটাও স্যাকরিফাইস করেছিল তারাও সবাই তাদের সেই স্যাকরিফাইসটুকুও এই তালে ক্যাশ করে নিয়ে নিয়েছে গুছিয়ে নিয়েছে। আর তুমি কিনা, সেই স্যাকরিফাইসটাও শেষে স্যাকরিফাইস করে দিলে! তোমারটাই সবার বড়ো স্যাকরিফাইস!
কিন্তু আমার এই জ্ঞানদানে কোনো দুঃখ না পেয়ে তার সারা মুখ প্রসন্ন হাসিতে ভরে ওঠে। পিঙ্গল উজ্জ্বল চোখ আরো যেন জ্বলজ্বল করে তার।…
সেই স্বরাজ কূটীরের কথায় আসা যাক আবার। সকালে পান্তাহার পার হবার পর দুপুরের মধ্যাহ্ন ভোজ সেখানেই হোলো। সেই স্বরাজ কুটীরেই।
কচুপাতায় ভাতে ভাত, ডাল সেদ্ধ, আলু সেদ্ধ–এইসব দিয়ে। মাছ তরকারির কোনো নামগন্ধ নেই। না থাক, সবার সঙ্গে বসে খেতে এমন ভালো লাগল যে বলা যায় না।
একটা ছেলে বাড়ির থেকে গাওয়া ঘি এনেছিল খানিক, সবার পাতেই দিল একটু একটু।
সেটা পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মতই চমৎকার!
রাত্রের খাওয়া সারবার পর সেখান থেকে বিপিনবাবুর বৈঠকখানায় সেদিন আর গেলাম না। এইসব তাজা প্রাণ আর কচি কচি মুখের সান্নিধ্য ছেড়ে বিপিনবাবুর গোমস্তাদের গোমড়া উপস্থিতির ত্রিসীমানায় যেতে মন সরল না।
রাত্রে ছাতে গিয়ে শুলাম সবাই। খোলামেলা হাওয়ায় আকাশের তলায় শোয়ার আরাম তারও বুঝি তুলনা হয় না। ফাঁকায় শুয়ে আকাশভরা তারার দিকে তাকানো-অনন্তের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার এক বিচিত্র অপরূপ অভিজ্ঞতা।
মাঝরাতে কখন এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে টেরও পাইনি। যা আমার ঘুম! ভূমিকম্প কখনো টলাতে পারেনি, বৃষ্টির ছাঁটে ভাঙবে কি! সবাই উঠে গেছে কখন, আমি একাই পড়ে রয়েছি ছাতে। ভিজে নেয়ে গেছি, জামাকাপড় আগাপাশতলা শোয়র চ্যাটাইটি পর্যন্ত জলে ভিজে জ্যাবজাব করছে।
কিন্তু ঘুম থেকে আমায় তোলা গেল না। সেই স্যাঁতসেঁতে ছাতেই পড়ে রইলাম সারারাত ঘুমিয়ে পড়লাম, দেখতে না দেখতেই। অঘোরে ঘুমালাম সকাল অব্দি।
ভোরে উঠে দেখি, জামাকাপড় সব শুকনো খটখটে। গায়ের উত্তাপেই শুকিয়ে গেছে বিলকুল। এবং আজন্ম ফ্যাচর ক্যাচর সর্দিকাতর আমার হাঁচিকাশির কোনো লক্ষণমাত্র নেই এই–দারুণ বিপর্যয় সবিস্ময়ে লক্ষ্য করছি, এমন সময় বিপিনবাবুর কাছ থেকে লোক এল আমাদের সবাইকে তিনি ডেকে পাঠিয়েছেন।
দেশবন্ধুর আসন্ন আগমন ব্যাপারে হয়ত কিছু হবে ভেবে আমরা সবাই তক্ষুনি ছুটে গেলাম সেখানে।
তিনি আমাদের প্রত্যেককে এক জোড়া করে মোটা খদ্দরের ধুতি দিলেন আর সেই সঙ্গে কয়েক প্ৰস্থ থান–খান দুই করে পিরান বানাবার জন্য। কলকাতার থেকে আনানো হয়েছিল ওগুলি। দেশবন্ধু আসার আগেই বিলিতি জামাকাপড় বর্জন করে সব স্বদেশী বেশভূষায় সজ্জিত হতে হবে আমাদের।
শহরের এক দর্জির দোকানে গিয়ে গায়ের মাপ দিয়ে জামাটামা বানিয়ে নিতে বাতলে দিলেন আমাদের। আর আমায় বললেন যে, আজকের দুপুরের গাড়িতে তিনি নবাবগঞ্জে যাবেন, কংগ্রেসেরই কী কাজে, ফিরে আসবেন আজ রাত্রেই আবার–আমাকে যেতে হবে তাঁর সঙ্গে!
অতএব এই কঘন্টার ভেতরেই দর্জিকে দিয়ে আমার পিরানকুর্তা যা বানাবার তৈরি করে নিতে হবে আমাকে।
আদ্যিকালের প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীরা বেশ হৃষ্টপুষ্ট হত জানা যায়, আমাদের আদি যুগের খাদিও প্রায় সেইজাতীয় ইলাহী কাণ্ড ছিল-সেকালের জতুর মতন সে যুগের তন্তুজ খদ্দর প্রায় বিরল এখন। এখনকার খদ্দর বেশ শৌখিন ভদ্দর গোছের–অঙ্গে ধরলে শোভা বর্ধন করে।
কিন্তু প্রাককালীন সেই খদ্দর পরলে গা-টা ছড়ে যেত না অবশ্যই, তবে দেহভার কিছুটা বাড়ত বইকি, সেই ভারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তার পরুয়াকেও বেশ একটু ভারিক্কিই দেখাত মনে হয়।
এবং পাক্কা দু বছরের ধাক্কা। গীতোক্ত সেই আত্মার ন্যায় বছর দুয়ের জন্য ঐ বস্তু অচ্ছেদ্য অভেদ্য অমেধ্য। কিন্তু পরার দিকে যতই পাকাপাকি হোক না, তার কাঁচা কাজের মতন মারাত্মক আর হয় না। ভেজা ধুতির দুমুড়ো ধরে জল নিঙড়ে বার করতে দুজন লোক হিমসিম খেয়ে যেত। দস্তুর মতই এক ব্যায়াম–সে এক মহামারী ব্যাপার।
নবাবগঞ্জে গিয়ে বিপিনবাবু এক জায়গায় একটি সেকেলে চরকার নমুনা পেলেন, সেটি তিনি সংগ্রহ করে সঙ্গে নিলেন। বললেন, এই মডেলে ইংরেজবাজারের ছুতোরদের দিয়ে অঢেল চরকা বানিয়ে তিনি বাজারে ছাড়বেন–তার ভেতর আমাদের দিয়ে সুতো কাটানোর সদুদ্দেশ্যটা উহ্য রইলই!
চরকায় কাটার জন্য পাঁজ বানাবার এক বস্তা কাঁপাস তুলোও নিতে তিনি ভুললেন না সেই সঙ্গে।
এই লটবহর নিয়ে যাতে ভোরের আগেই শহরে ফিরতে পারেন সেই হেতু আমাকে সঙ্গে করে রাত তিনটের ফিরতি গাড়িতে চড়ে বসলেন তিনি।
গাড়িতে উঠেই তিনি বললেন আমাকে–আমি তখন কামরার জানলায় মাথা রেখে অন্ধকারের নৈসর্গিক শোভা নিরীক্ষণে ব্যাপৃত–দ্যাখো শিবরাম, এই সুযোগে আমি একটুখানি বিশ্রাম করে নিচ্ছি, তুমি তো জাগাই রইলে, ইংরেজবাজারে গাড়ি এসে দাঁড়ালেই তুমি তুলে দিয়ো আমায়, কেমন?
আমি সায় দেবার সাথে সাথেই তিনি শায়িত। আর আমিও এদিকে দেখতে দেখতে কখন যে আকাশের অন্ধকারের মধ্যে তলিয়ে গেছি নিজেই জানি না-ইংরেজবাজারও পেরিয়ে গেছে কখন এই ফাঁকে।
