যেমন দেখছ? বললাম আমি। অনেকদিন পরে দেখা হল, ভালো আছ তো বেশ? আমি জিগ্যেস করি।
আর ভালো! সে নিশ্বাস ফেলল–ঐ আছি একরকম। কী করছ ভাই এখন?
যা করতাম তাই। লিখিটিখি। লিখে খাই আর খেয়ে লিখিলিখেটিখে চালাই। চলে যায় একরকম। তুমি কী করছ এখন?
সে কথার জবাব না দিয়ে সে শুধায়–ছেলেপিলে কটি হোলো?
বিয়েই করিনি তো ছেলেপিলে! আমি হাসলাম।
কেন, বিয়েটিয়ে করলে না কেন?
লিখেটিখে চালাই কোনোরকমে। নিজেই খেতে পাই না তো ছেলে বৌকে কী খাওয়াবো? আমি জানাই : বে-থা করিনি তাই ছেলেপিলের কোনো ব্যথাও নেই-সংসার-যন্ত্রণা নাস্তি!
সংসার-যন্ত্রণা যা বলেছো! স্ত্রীপুত্রের অসুখবিসুখ লেগেই রয়েছে। সেই জন্যেই তো আসা আমার এই কলকাতায়। বিধান রায়ের কাছে।
বিধান রায়?
হ্যাঁ, তিনি ছাড়া দেখবার আর কে আছে আমাদের? বিধানবাবুকে জানো তো?
জানি না? ঘাড় নাড়লাম আমি। খুব জানি।
-বিধানবাবুর গুণগরিমা আমারও অজানা ছিল না। জানতাম যে সঙ্কটকালে তিনি ছাড়া বিপত্তারণ বিপদবারণ কেউ নেই বিশেষ। যার কাছে নেবার তিনি ঠিকই নেন, আবার যাদের দেবার ঠিকঠিকই দেন। অভাবীদের তিনি কেবল ওষুধের ব্যবস্থাপত্রই দিতেন না বিনা ফি-য়ে, ওষুধপত্রের ব্যবস্থাও করে দিতেন অমনি সেইসঙ্গে।
কেবল চোখের দেখা দেখেই তিনি সারেন না, সারে কি না সেটাও দ্যাখেন আবার। এমনি মানুষ বিধান রায়।
আর কী মনে রাখতে পারতেন যে!
আমার ইস্কুলে পড়ার সময়েই তাঁর নামের বহর সেই দূর পাড়াগাঁয়ে গিয়ে পৌঁছেছিল! নামডাকের ডাক্তার ছিলেন তিনি। কে না শুনেছে তাঁর নাম।
মা প্রায়ই ভুগতেন হাঁপানির ব্যারামে আর হাঁপানি এমন বিচ্ছিরি ব্যামো যে কহতব্য নয়। আর সব রোগে শুইয়ে ফ্যালে, হাঁপানি কিন্তু বসিয়ে রাখে। বসিয়ে দেয় একেবারে।
সারারাত বিছানায় বসে ঠায় হাঁপাতেন মা।
দেখেই এমন কষ্ট হতো আমার–যার হতো তার না জানি কী!
আমি তাই করলাম কি, খামের মধ্যে নিজের নাম-ঠিকানা লেখা খাম দিয়ে মার অসুখের কথা জানিয়ে বিধানবাবুকে একটা চিঠি ছেড়ে দিলাম গাঁয়ের থেকে।
কদিন বাদেই তাঁর জবাব এসে গেল ব্যবস্থাপত্রসমেত। প্যালল বলে একটা পেটেন্ট ওষুধের নাম ও সেবনবিধি লিখে দিয়েছিলেন। ওই ওষুধটা খেয়ে বেশ ভালো থাকতেন মা। অনেকদিন পরে যখন কলকাতার আত্মশক্তি কি যুগান্তর নেব পর্যায়ের) সম্পাদনায় জড়িত, কী সূত্রে যেন যেতে হয়েছিল তাঁর কাছে। আমার নাম বলতেই বললেন-শিবরাম? শিবরাম বলে একজনকে আমি জানতাম, একবার চিঠি লিখেছিল আমায়!
সেই আমি–সে-ই আমি! প্রকাশ করতে হল আমাকে।
এরকম অদ্ভুত স্মরণশক্তি আমি কম দেখেছি।…
তুমি কী করছ এখন শুনি? এবার আমি জানতে চাই।
সেই যা করতাম। কংগ্রেসের কাজ নিয়েই আছি।,বলল ভূপেন-তুমি তো ছেড়েই দিলে কংগ্রেস! সেই কবে ছেড়েচ। খদ্দরের সঙ্গে সঙ্গেই ছেড়ে দিয়েছ। আমরা কিন্তু লেগেই রয়েছি এ পর্যন্ত।
তা তো দেখছি। সেই মোটা খদ্দরেই লেগে আছ তাও দেখছি।
ফাইন খদ্দর নেতারা পরেন, আমাদের শোভা পায় না বুঝলে ভাই?
কিন্তু কংগ্রেসের সঙ্গে সম্বন্ধ একেবারে চুকিয়ে দিলে কেন বলো তো? চার আনার মেম্বর হয়ে থাকতেও কি পারতে না?
কোনো জিনিসই ভাই বেশিদিন ভালো লাগে না আমার। তাছাড়া কংগ্রেসের কাজটা মানে ঐ রাজনীতি ফাজনীতি আমার ধাতে আসে না। আমার স্বধর্ম নয় ঠিক।
কংগ্রেসে লেগে থাকলে একটা মন্ত্রী কি উপমন্ত্রী হতে পারতে যদ্দিন। দাশ সাহেব থেকে বড় বড় নেতাদের সবার সঙ্গেই তোমার জানাশোনা ছিল তো। যোগাযযাগটা রাখতে পারতে।
না ভাই, আমি বলেছিলাম না তোমায়, মনে আছে? সিদ্ধিলাভ আমার পছন্দসই নয়। একটা পথের শেষ পর্যন্ত লেগে থাকলে একটা কিছু হওয়া যায়–কার্য সিদ্ধি হয় বটে, কিন্তু হয়ও না আবার, এই যেমন তোমার হয়নি। তুমি তো লেগে থেকেও আজও কোনো মন্ত্রীটন্ত্রী হতে পারোনি!
না ভাই! আমরা তলার লোক তলাতেই পড়ে রইলাম। উপরে উঠতে পারলাম কই? সে ম্লান হাসল একটুখানি।
তোমাদের জেলা থেকে যাঁরা এসে এখন জাঁকিয়ে বসেছেন, মন্ত্রী কি উপমন্ত্রী হয়েছেন, তাঁদের কাউকেই তো তখন কংগ্রেসের ত্রিসীমানায় দেখা যায়নি। তোমার মতন জেলটেলও খাটেনি কেউ এরা। এরা সব জুটলো কোত্থেকে? কবে জুটলো?
ওপর থেকেই এল। স্বাধীনতা লাভের সঙ্গে সঙ্গে এসে পড়ল। জমিদার, জোতদার সবাই-টাকার অভাব নেই। পাটি ফাণ্ডে মোটা টাকা দিয়ে নমিনেশন পায় ওরা। টাকার জোরে দল ভারী করে কাজ বাগায়। স্যাক্রিফাইস করার সময় কেউ এরা ছিল না বটে, জেল খাটেনি কেউ এরা, তাও ঠিক-সুযোগ বুঝে সুবিধা লুটতে যথাসময়ে এসে জুটেছে। সব!
সুবিধাবাদী যতো! রাজনীতির মানেই এই! এর চেয়ে নোংরা আর কিছু হয় না। এর ভেতর থাকলে আমিও কোথায় তলিয়ে যেতাম! অবশ্যি আমার লাইনেই যে খুব উঠতে পেরেছি তা নয়, এতে অনেক দুঃখ যন্ত্রণা, তবে ভাই, সেটা অন্য ধরনের। তেমনি এতে স্বাচ্ছন্দ্য আছে, আনন্দও আছে আবার।
দেশসেবায় দেশের জন্য ত্যাগ স্বীারেও আনন্দ আছে ভাই!
তা হয়ত আছে। কিন্তু নিজের দুঃখ যন্ত্রণা কোনো রকমে সওয়া গেলেও, ছেলেমেয়ের দুঃখকষ্ট দেখলে সে আনন্দ যেন উপে যায় কোথায়। তাছাড়া এটা কেমন ভাই? একদলের ত্যাগ স্বীকার, আরেক দলের মুনাফা শিকার? কতক লোক সারাজীবন শুধু দিয়ে দিয়ে যায়, আর কতক কিনা উপর উপর এসে মজা লুটে নেয়। একদলের তলায় পড়ে মার খাওয়া, আরেক দলের উপরি পাওয়া? এটা কী রকম?
