সকালে উঠে মুখ হাত ধুয়েই না, চলে যাই সেই স্বরাজ কুটীরে। স্বেচ্ছাসেবকদের সবার দেখা পাওয়া গেল সেদিন। একেকট্টা খোরা সামনে নিয়ে প্রাতরাশে বসে কী যেন খাচ্ছিল সকলে।
কী খাচ্ছো ভাই তোমরা?
ভূপেনকেই শুধাই। কাউকে কিছু খেতে দেখলেই কেমন যেন খিদে পেয়ে যায় আমার।
এই যে চক্রবর্তী! এসো এসো। আমাকে দেখেই সম্বোধন করেছিল সে, এখন আমার কথার জবাবে শুধালো, পান্তা ভাত। খাবে তুমি?
পান্তা ভাত! সে আবার কী ভাই? খেতে কেমন?
অবাক হচ্ছ দেখছি। আমার জিজ্ঞাসায় ভূপেনরা সবাই হতবাক।–চরখা না হয় নাই দেখছো কিন্তু পান্তার নামও কি শোনোনি নাকি কখনো?
শুনব না কেন? নুন আনতে আনতেই যা ফুরিয়ে যায় সেই পান্তা তো? নুন আনতে পান্তা ফুরোয়-বলেই দিয়েছ কথায়। আমি কই-তা তোমরা সবাই নুন নিয়ে বসেছ তো?
নুন! অঢেল অঢেল! কতো চাই তোমার? সে জানতে চায়- খাবে চারটি পান্তা? যা খিদে পেয়েছিল তখন আমার–একবার সাধিলেই হয়।
খাব বই কি! চোখে না দেখতে পারি কিন্তু চেখে দেখতে আপত্তি নেই। তা, এই পান্তাটা হয় কী করে শুনি? কী করে বানাও তোমরা?
কালকের রাত্তিরের বাসীভাত জলে ভিজিয়ে রেখে দিলেই হয়, সকালে পান্তা হয়ে থাকে। ভাত কি নষ্ট করবার? বাড়তি ভাত ঐ করে রেখে দেওয়া হয় তাই। সকালে উঠে না, নেবুর রস আর তেঁতুল দিয়ে খেতে যা খাসা! কী বলব–আহ!
ভূপেনের জিভের জল গড়িয়ে পড়ে খোরার উপরে সেই পান্তনিবাসে।
বাসী ভাত খেলে তো অসুখ করতে পারে? না খেয়ে তা বিলিয়ে দিতে পারো বরং। কোনো ভিখিরিকে দিয়ে দিলেই হয়।
ভিখিরি-টিখিরি কেউ নেই এ মূল্পকে। কোথায় পাবো ভাই ভিখিরি?
তা বটে! আমাদের চাঁচলেও কোনো ভিখিরি দেখা যায় না প্রায়। বৈরিগি আছে বটে, তবে তারা তোমার ভিখিরি নয়। ভিক্ষে করে না তারা, খঞ্জনী বাজিয়ে গান গায়, মাধুরী করে, তারা সব বোষ্টম।
না, বৈষ্ণরা ভিখিরি নয়। একটা ধর্ম সম্প্রদায়। জানি আমি। ভূপেন প্রকাশ করে।
আমার মামাও বৈষ্ণব। আমি জানাই। বামুন হলেও বৈষ্ণ। তবে বোষ্টম নন, বৈরিগি হননি। হরিনাম করেন, কীর্তন গান, কর্তাল বাজান। কর্তাল-ভজা না কর্তাভজা কী যে বলে থাকে, সেই সম্প্রদায়ের কেউ হবেন বোধ করি।
সব জাতের থেকেই বৈষ্ণব হওয়া যায় তো। ভূপেন বলে : বামুন, কায়স্থ, বৈদ্য, হাড়ি মুচি ডোম সবাই হতে পারে। এককালে মুসলমানরাও হতো নাকি শোনা যায়। তাদের লেখা গানের পদও আছে নাকি অনেক।
তাই নাকি? তা হবে হয়ত। বৈষ্ণ পদাবলীর মধ্যে আমি পাইনি কিন্তু। তবে মামা বলতেন বটে, বৈষ্ণব চিনিতে নারে দেবেরো শকতি। দেবতাদেরও খ্যামতা নেই যে বৈষ্ণবকে চিনতে পারে।
সে কথা সত্যি। ভূপেনের সায় আমার কথায়।
চিনতে পেরেছেন শুধু বিষ্ণু ঠাকুর। সেই চিহ্ন তিনি নিজের বুকে নিয়ে রয়েছেন। ভৃগুপদচিহ্ন।
আর চিনেছো তুমি! একটা ছেলে ঠাট্টা করে আমায় শালুক চেনেন গোপাল ঠাকুর।
ততক্ষণে ভূপেন আমাকেও এক খোরা বেড়ে দিয়েছে। আমিও আর কথা না বাড়িয়ে, ছেলেটার কথা গায়ে না মেখে, নুন দিয়ে নেবুর রস মাখিয়ে পান্তা ভাত চাখতে লেগেছি।
সত্যিই তোফা! বাড়ি থাকতে–আমাদের প্রত্যহের প্রাতরাশ বাবার সেই মহাপ্রসাদ, রসগোল্লা কোঁচানো সেই পুরু দুধের সরের চেয়ে জলভাতের এই ঠাণ্ডা সরোবর আস্বাদে কোনো অংশে কম যায় না। সে যদি সুধাস্বাদ হয় তো এও অমৃতই।
তুমি বলছিলে না যে বাসী ভাত খেলে অসুখ করে-ভিখিরিদের দিয়ে দিলেই হয়। বলছিলে না তুমি? কিন্তু এই ভারতের সবাই তো আমরা ভিখিরি ভাই! ইংরেজ তো সব লুটেপুটে নিয়ে গেছে, কিছু কি ফেলে রেখে গেছে আর? তাছাড়া যে জিনিস তুমি নিজে খেতে পারো না তা কি ভিখিরিদের দেওয়া উচিত? ভিখিরিরা কি মানুষ নয়? এই দেশেরই মানুষ তো! এই ভারতবর্ষেরই তারা। বলতে গেলে তারাই ভারতবর্ষ। এদেশের শতকরা পঁচানব্বই জনই তো দরিদ্র অন্নহীন। তাদের জন্যই তো স্বাধীনতা চাই আমাদের। স্বরাজের জন্যই তো আমাদের লড়াই? সে স্বরাজ তো ওদের জন্যই ভাই। গান্ধীজী কপনি পরেন কে? দেশের পঁচানব্বই জনই ঐ কপনি-পরা–তাই বলেই। সেটা কি তুমি বোঝ না ভাই? বলতে গিয়ে ওর পিঙ্গল উজ্জ্বল চোখ যেন জ্বলতে থাকে আরো। সেই চোখের আলোতেই আমার স্বদেশবাসীদের যেন আমি দেখতে পাই আজ নতুন করে আনকোরা আরেক রূপে।
আর তাছাড়া, দেশ কি তোমার ঐ ম্যাপটা? ভারতবর্ষের ম্যাপটা কি আমাদের দেশ নাকি? ভারতের মানুষ নিয়েই তো ভারতবর্ষ–এমন কি, ভারতের গরু ছাগল ভেড়া সব নিয়ে, বাঘ সিংহ গণ্ডার উলুক সমস্ত। তার নদ নদী পাহাড় পর্বত তাও। এর সবটাই আমার ভারতবর্ষ। সবার স্বাচ্ছন্দ সবার সার্থকতাই আমরা চাই। তাই-ই আমাদের স্বদেশ সাধনা ভাই!
যার খোঁজে ঘর ছেড়ে বেরিয়েছিলাম, আজ এই পান্তার তেপান্তরে এসে সেই রাজকন্যা—একদা রাজরাজেশ্বরী এখন ভিখারিণী আমাদের সেই দেশমায়ের সন্ধান যেন পাই আমি–ভুপেনের ওই কথায়।
.
৩৪.
সেই ভুপেনের সঙ্গে আমার দেখা হল আবার বছর কয়েক আগে, এই কলকাতাতেই।
রাস্তায় হঠাৎ মুখোমুখি।
দেখেই সে চিনতে পেরেছে-আরে, চক্রবর্তী যে! কেমন আছ ভাই?
আর, সঙ্গে সঙ্গে সেই সেকেলে ধরনের কোলাকুলি এই একেলে শহরের মাঝখানে আমাকে দেখেই না!
আমিও তাকে চিনেছিলাম। বয়সে হয়ত একটু বুড়িয়ে গেলেও, রুক্ষ সূক্ষ্ণ চেহারায় সেই উজ্জ্বল পিঙ্গল চোখ তত ভোলবার নয়।
