হবেই না তো, সে আমি ভালোই জানি। ফাঁকতালে যা হবার তাই শুধু আমার হবে। বাবা বলেন, যোগঃ কর্মসু কৌশল! ওই কৌশলের যোগাযোগে যা হয় তাই।
ফাঁকি দিয়ে কিছুই হয় না ভাই! চালাকির দ্বারা কোনো মহৎ কাজ হয় না–বলেননি বিবেকানন্দ? সে গুমরায়।
কোনো মহৎ কাজ করতে চাইনে তো আমি। কোন কিছুর সিদ্ধি-ফিদ্ধি চাইনে আমার। কোনো কিছুই পুরোপুরি পেতে চাই না, কেবল ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে চাই। পরমহংসদেব সিদ্ধাই চাননি, চাইতে মানা করেছেন। আমি কিন্তু ভাই ওই সিদ্ধিও চাই না, তার ওপরেও আরেক কাঠি।
ঠাকুর রামকৃষ্ণের কথা বলছ?
হ্যাঁ। পড়োনি তুমি শ্ৰীম কথিত কথামৃত পাঁচ ভাগ।
না ভাই। পাবো কোথায়? আমাদের গাঁয়ে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে কেবল পাঁজিই এক মাত্র পড়বার। তাই আমার একশো বার পড়া হয়ে গেছে অনেক কিছু জানা যায় কিন্তু তাই থেকেই। তা জানো?
পাজির পা-ঝাড়া ওর বিদ্যাবত্তার এই বহর জেনে আমার হাসি পায়। কিন্তু আমি হাসি চেপে রাখি।
হাসবার আমার কী আছে? ওর তবু পাঠ্যপুস্তকগুলো ভালো করে পড়া, আমি তো তাও দুইনি কখনো। এক পেয়ালার বিদ্যেকে কি এক কেটলিমাত্র বিদ্যাধরের কটাক্ষ করা সাজে?
সিদ্ধিও চাও না তুমি? কোনো কিছুতেই না? আশ্চর্য!
এইজন্যেই চাইনে যে, যেখানেই আমার সিদ্ধি হোলো সেখানেই তো আমি জমে গেলাম। মজে গেলাম তাইতেই। কিন্তু তাতে ভাই আমার মজা নেই। সেই আমার যমালয়। সেখান থেকে আর গতিমুক্তি নেই আমার। এই হেতুই এমন কি, তোমার ওই ভগবৎ সিদ্ধিও চাইনে আমার।
চাইলেই যেন পাওয়া যায় ভগবানকে? আমার কথায় সে হাসে।
হাসবার কথাই বটে। আমিও হেসে ওড়াই কথাটাকে-হাজার চাইলেও পাওয়া যায় না ভাই! হাজার মাথা খুঁড়লেও নয়। কেউই পায় না-হাজার সাধ্যসাধনাতেও। মাঝখান থেকে যা পাবার, যাকে পাবার তাও হারায়-বুঝলে ভাই? সত্যি বলতে, পাওয়াই যায় না ভগবানকে। আমরা কখনোই পাইনে, ভগবানই আমাদের পান। তিনি পেলেই হয়। তখন না চাইলেও…না চাইতেই পাওয়া যায় তাঁকে। তাই আমি ভগবানের পেছনে ঘুরিনে, তাঁকে চাইতে যাওয়া বিলকুল বৃথাই তো!
কী চাও তুমি তবে শুনি?
আমি অনেক অনেক অনেক সিদ্ধি চাই, অনেক রকমের সিদ্ধি সাফল্য–কিন্তু তা কেবল ক্ষণেক ক্ষণে ক্ষণেকের জন্যেই। এক জীবনে হাজার রকম বাঁচাই আমার চাই।
না সিদ্ধি চাও নাই চাইলে, চরখা কিন্তু আমাদের সাধতেই হবে। নিজের চরখার প্রতি সে চাড় দেখায় আবার : মহাত্মাজী বলেছেন। রেখা কাটতে আমরা বাধ্য। তুমি কাটবে না?
আমার চরখা নেই? ও তো তোমার চরখা?
হলই বা। কাটা নিয়ে কথা।
পরের চরখায় কি তেল দিতে আছে? নিজের চরখায় দিতে হয়। যাই, একটুখানি বেড়িয়ে আসি বাইরে। হাওয়া খাইগে। তোমাদের শহরটা ঘুরে ফিরে দেখা যা একবার।
চক্রবর্তীদের চরখাবর্তী-করা সহজ নয়। চরখার চক্রান্তে না পড়ে আমি শহরের চক্করে বেরিয়ে পড়লাম।
মহানন্দার পাড় হয়ে তার ধার ধরে ঘুরে এলাম একবার। শহরের রাস্তাগুলো চষে ফেলা হলো বার দুয়েক। তারপরে চলে গেলাম বিখ্যাত সরকারী ইস্কুলবাড়ি দেখতে। জেলার স্কুল বোর্ডিং-এর চত্বরে গিয়ে পড়লাম।
জেলার সব ইস্কুলের ছেলেরা জমবে এসে এখানে যথাসময়ে-কদিন বাদেই ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিতে আসবে যখন।
বিষ্টুও আসবে আর সব ছেলের সঙ্গে পরীক্ষার্থী হয়ে। এখানেই সীট পড়বে, এই হোটেলেই এসে থাকবে তারা।
আমিও আসতাম। আলাউ হয়েছিলাম তো। কিন্তু আমি আর আসব না। আডমিট কার্ড নিইনি
তবে বিষ্টুকে দেখতে আসব এখানে নিশ্চয়–যদি সে সময় আমার এই শহরে থাকা হয়।
যে-পরীক্ষা কোনদিনই দিতে চাইনি, দিতে ভালোই লাগত না, দিলাম না–সেই পরীক্ষার জন্যই, কেন জানি না, কেন যেন মন কেমন করে।
যাক, আসছে বছর আমি দেবো নিশ্চয়–দেশ যদি এর মধ্যেই স্বাধীন হয়ে যায়। হবেই তো স্বাধীন। এবং পড়ও আবার। কো-এডুকেশনের কলেজেই পড়ব তারপর কলকাতায় গিয়ে, মা তো বলেই দিয়েছে।
রিনির সঙ্গেও দেখা হবে আবার। চাই কি, রিনিকেও হয়ত সেই কলেজেই পেতে পারি সেই সময়। কিছু কি বলা যায় কখনো?
কী দেখছ এখানে? হোসটেলের একটা ছেলে গায়ে পড়ে জিজ্ঞেস করে আমায়।
দেখছিলাম। এই ইস্কুলেই আমাদের পরীক্ষার সীট পড়বে তো? থাকতে হবে হয়ত এখানে, দেখতে এসেছিলাম তাই।
তুমি বুঝি এগজামিনী?
ছিলাম বটে, কিন্তু এখন আর নই।
ছেলেটি আমার কথায় একটু অবাক হয়, কিন্তু তারপর আর কিছু জানতে চায় না, তার বন্ধুর সঙ্গে গালগল্পে মশগুল হয়ে চলে যায়।
সেখান থেকে ভারি মন নিয়ে বিপিনবাবুর বাড়ি ফিরলাম।
মনের সেই ভার আজও বুঝি যায়নি এই-আমার। মনের সেই বোঝা আজ বোধহয় আমার অবচেতনায় গিয়ে বোঝাই হয়েছে। এখনো মাঝে মাঝে বই বগলে ইস্কুলে যাবার বিরাট হলে বসে আরো সব ছেলের সঙ্গে পরীক্ষা দেবার স্বপ্ন আমি দেখি। যে-পরীক্ষা পাশ করতে পারলাম না, যে পড়া আমার পাশ কাটিয়ে গেল, আমার ঘুমের ঘরে চারপাশ থেকে এসে তারা হানা দেয়… আমায় উতলা করে তোলে বুঝি!
স্বরাজ কুটীরে ফিরে যাইনে আর-রাত্রের খাবার জন্যে। খাজা খেয়েই পেট ভরে ছিল, তার ওপর আরো ভর্তি করার দরকার ছিল না কোনো, মনের ভার নিয়ে বিপিনবাবুর দরাজ বৈঠকখানায় নিজের দেহভার রাখি। ঢালাও বিছানার ওপর ঢেলে দিই আপনাকে।
