এই বিরাট তক্তপোষে? ঘরজোড়া বিস্তারের দিকে আমার অঙ্গুলি বিস্তারিত।
হ্যাঁ। এখানেই দিনে আমার দপ্তরখানা বসে আমার কোর্ট-কাঁচারির কর্মচারী, মুহুরি, তশিলদার সবাই বসে কাজকর্ম করে এখানে সারাদিন। রাত্রেও আমার জনকয়েক কর্মচারী শুয়ে থাকে। তুমিও শুয়ে থাকবে এদের মধ্যে এক পাশটিতেও। অনেকখানি জায়গা। শোয়র কোনো কষ্ট হবে না তোমার। তোমার মতন নজন শুতে পারে এই বিছানায় অক্লেশে। বুঝলে?
ছখানা তক্তপোষ জোড়া নজনের শোবার মত বিছানার সেই নয়-ছয় ব্যাপার–বাস্তবিক, চেয়ে দেখবার মতই।
বিকেলে তো কিছু খাওনি তুমি? ট্রেন থেকে নেমেই চলে আসছ তো? কোনো দোকান থেকে কিছু মিস্টি-টিস্টি কিনে খাও গে। তারপরে স্বরাজ কুটীরে রাত্রের খাওয়াদাওয়া সেরে এখানে চলে এসো, কেমন?
তিনি একটা টাকা দিলেন আমায়।
টাকাটা হাতে আসতেই আমি রাজা! সোজা চলে গেলাম এক খাজার দোকানে।
তিনি একজন লোক দিয়েছিলেন সঙ্গে স্বরাজ কুটীর দেখিয়ে দেবার জন্য। রাস্তায় নেমে, খানিকটা গিয়েই না, প্রায় মাছির মতই ভাগিয়ে দিলাম সেই লোকটাকে। পাছে খাজার ভাগ দিতে হয়, মাছির মতই আমার খাবারের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে সে শেষটায়।
দরকার হবে না। খুঁজে নিতে পারব তোমাদের স্বরাজ কুটীর। যেমন করে বিপিনবাবুর খোঁজ নিয়ে এলুম না আমি–তেমনি করেই খুঁজে নেব। বাতলে বিদায় করে দিলাম লোকটিকে।
খাজায় পেট বোঝাই করে স্বরাজ কুটীরে গিয়ে হানা দিলাম তারপর।
প্রায় আমার সমবয়সী জনকয়েক ছেলে প্রকান্ড একটা থালার চারধার ঘিরে বসেছিল নারকেল আর মুড়ি নিয়ে।
আমিও ভাই তোমাদের একজন ভলান্টিয়ার। এখানে এলাম আজ। নিজের খবর জানালাম।–থাকব তোমাদের সঙ্গে এখানে।
বাঃ বাঃ! বেশ বেশ! সবাই ওরা উৎসাহিত–এসো, বসে পড়ো আমাদের সঙ্গে। থালার এক পাশে একটুখানি জায়গা করে নিলাম।
পেট আমার বেশ ভর্তি আছে, তাহলেও নারকেল মুড়ি খেতে আমার আপত্তি নেই। বলতেই না বসে পড়লাম, খাবার ওপর টান আমার বরাবর–কোনদিনই তা যাবার নয়। খাদ্য অখাদ্য যাই হোক না, পেলেই খাই।
পেলেই খাই, আর খেলেই পাই–এই কথাটাই সব কিছু মিলিয়ে সারা জীবন ধরে জানা আমার।
আত্মসাতের দ্বারা আপনার মত করে না নিলে কিছুই যেন আর আপনার হয় না, এই দুনিয়ায়।
খেতে খেতে পরস্পর জানাশোনা হোলো। মালদা জেলার নানা জায়গা থেকে তারা এসেছিল। আরো আরো ছেলে আছে এখানে, পিকেটিং করতে তারা বেরিয়ে গেছে এখন। ওদের মধ্যে ভূপেন ঝা একজন ছিল, কালিয়াচক না মানিকচক কোন্ থানার, আলাপ হোলো তার সঙ্গে। উদ্দীপ্ত চেহারা ছেলেটার-দেশপ্রেমে জ্বলছিল যেন মনে হয়। কেবল তার কথাটাই এখনো আমার মনে আছে। কাঠখোট্টা জ্বলন্ত ঐ চেহারার জন্যই বোধহয়।
জলযোগের পরই ভূপেন ঝা সুতো কাটতে বসে গেল। চরখায় মন দিল আপনার।
চরখা কাটতে জানো? শুধালো সে আমায়।
একদম না। খাই দেখিনি সাত জন্মে। এই প্রথম দেখছি।
কাটবে?
দেখি পারি কিনা।
কেমন করে কাটছিল সে, লক্ষ্য করেছিলাম। সেইভাবে তুলোর পাঁজ নিয়ে টাকুর মুখে লাগিয়ে পাক দিতেই না লম্বা এক সূত্রপাত হয়ে গেল প্রথম চোটেই।
কয়েক টান টেনেই না অরুচি ধরে গেল আমার–প্রথম সিগ্রেট টানার সেই অভিজ্ঞতার মতই।
না, একটানা কোনো কিছুরই টানাপোড়েনে আমি নেই। তাতে সুতোর বা কোনো জুতোর টান যতই দীর্ঘস্থায়ী হোক না, আমার নিজের পক্ষে সেটা যেন পোড়েন বলেই মনে হয়। অকারণে বিদগ্ধ হতে আমি রাজী নই।
বাঃ, বেশ ফাইন সুতো হয়েছে তো? আগে প্র্যাকটিশ করা ছিল বোধ হয়?
দেখিইনি কখনো চরখা এর আগে, বলছি না?
তাহলে হোলো কি করে এই? তার বিশ্বাস হয় না-প্রথমেই চরখার এমন হাত তত দেখা যায় না ভাই! কতোবার সুতো ছিঁড়ে যায়, কতো সরু মোটা সুতো বেরয়…
এটা একরকমের হাত সাফাই ভাই। মার শেখানো একটা প্যাঁচ জানা আছে আমার তাতে শুরু করতেই না, সব কিছুই আমার সুরৎ করে হয়ে যায় অমনি। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। তারপর আর হয় না, হয় হয়ত, কিন্তু হওয়াতে আর ইচ্ছে করে না আমার।
ইচ্ছেই করে না?
না। জেনে নিলাম, পেয়ে গেলাম, ফের কেন আবার সেটা? তারপর অন্যটায় হাত বাড়াতে প্রাণ চায়।
সে আবার কী? সে বুঝতে পারে না ঠিক।
ঐ রকম। সাইকেল চড়া তো গোড়ায় কত হপিং করে প্যাড করে পরের সাহায্য নিয়ে, বার বার আছাড় খেয়ে শিখতে হয়,-হয় না? আমি প্রথমে সাইকেলের সীটে বসেই না অবলীলায় চার চক্কর ঘুরেছিলাম, কারো সাহায্য না নিয়েই…।
বলল কি হে?
তারপর সাইকেল সমেত এমন এক আছাড় খেলাম না কাটা ঝাড়ের ওপর গিয়ে! ব্যস, সেইদিনই, সেইখানেই আমার সাইকেল চড়া খতম। আর কোনোদিন ভুলেও তার ওপর চড়াও হইনি।
বুঝলাম। তাহলে ওই গোড়াতেই যা হয় তোমার, শেষরক্ষা হয় না আর?
হ্যাঁ, ভাই। সিদ্ধিলাভ হয় না আমার কোন কিছুতেই শেষ পর্যন্ত। বরাতে আমার সিদ্ধি নেই, ধাতেও না। মা বলে, সাকসেস কখনো ফাঁকতালে পাওয়া যায় না রে, তার জন্যে সাধনা চাই।
চাই-ই তো। কথাটার ওপর জোর দেয় ভূপেন।
ওই সাধনা করইে আমি চাইনে, ভালোই লাগে না আমার। আমি জানাই-না, কোনো কিছুর বা কারুর ওই সাধ্য-সাধনায় আমি নেই।
তাহলে তো জীবনে তোমার কোনো সাকসেসই হবে না দেখছি। কথাটা বলে সে গুম হয়ে যায়।
