থাকবে বই কি মা! আমারও কি টান নেই নাকি?
তোর আবার কার ওপর টান রে?
আমিও আমার বন্ধুদের টেনে তুলব সব! দেখো তুমি। বিষ্টু-টিটু, কাবিল হোসেন টোসেন কাউকে বাদ দেবো না নিশ্চয়।
তাই তো করতে হয়। ওঠা যেমন ভাগ্যের কথা, অপরকে টেনে তোেলা আরো বড়ো ভাগ্যের। ওঠবার সঙ্গে সঙ্গে অপরকেও ওঠাতে হয়, নইলে তারাই একদিন টেনে নামিয়ে ছাড়ে-তুলে আছাড় মারে আবার! ঐ নিচুতলার মানুষগুলোই!
কবিও তো তাই বলে গেছেন মা! যারে তুমি নিচে ফ্যালোসে তোমাকে টানিবে যে নিচে। পশ্চাতে রেখেছে যারে/সে তোমারে পিছনে টানিছে।
সবাই মিলে উঠতে হয়–সবার সাহায্য নিয়ে সবাইকে সাহায্য করে। এই দুনিয়ার নিয়ম। পরের সাহায্য নিয়ে তবেই লোকে দাঁড়ায়। চলতে শেখে, এগুতে পারে। পরস্পরের ধাক্কায় পরস্পর এগোয়। সবার সাহায্যে সবাই ওঠে। এখানে বাঁচতে হলে, সভ্যসমাজে বাস করতে হলে, কাউকে না হলে কারু চলে না। তুই যার সাহায্য পেলি তাকে যদি ফিরে ফের সাহায্য করার সুযোগ নাও পাস, অন্য কাউকে সাহায্য করে তার প্রতিদান তোকে দিতে হবে।
তা তো হবেই। আমিও তো তাই চাই মা। সবাইকে নিয়ে সবার সঙ্গে উঠতে চাই আমি।
তা যদি চাস তো এখন থেকেই পড়াশুনায় লাগ। ফাঁকি দিসনে আর। এক পা এক পা করে এগুতে হয়–এগুতে থাক তাহলে।
নিশ্চয় মা। এখন থেকেই পড়াশুনায় লাগব মা উঠে-পড়ে, দেখো। বলেই আমি উঠি–এখুনি আমি পড়ার টেবিলে গিয়ে বসছি, দ্যাখো না! তোমার আশীর্বাদে আমার সব ঠিক হয়ে যাবে তুমি দেখো।
বলেই মার পায়ের গোড়ায় আমার আরেক টিপ। (কিন্তু ঐ টিস্কারের সঙ্গে যে দৈবের ধিক্কার ছিল তা কে জানত!)
না, এবার থেকে তৎপর হতে হবে আমায়। পড়াশুনায় যারপরনাই মন দিতে হবে। অবহেলা করলে চলবে না আর। অনেক দায় আমার ঘাড়ে…বড় দুঃখ বড় দৈন্য, সম্মুখেতে কষ্টের সংসার…ইত্যাদি ইত্যাদি…কবির বাণী মনে পড়তে থাকে ক্ষণে ক্ষণে।
মার কৃপায় যখন ত্রাণ পেয়ে গেছি ঐ যাত্রায়, তখন আর আমায় পায় কে! কিন্তু এক একবার কোনরকমে উৎরে গেলেই তো চলবে না, অনেক উত্তরণ আমার সম্মুখে। শুধু আমার উত্তরণ নয়, অনেকের। অনেকের সহিত আমার।
কিন্তু হায়, ভাগ্যের বিড়ম্বনায় সেই উত্তরুণ যে প্রায় দাক্ষিণ্য লাভের ন্যায়ই দুর্ঘট। এক সঙ্গে সকলের উত্তারায়ণ, সে তো আরো অনেক দূর। তাছাড়া…
তাছাড়া, ভ্রুসন্ধানে মা বিন্দুবাসিনীর করুণাবিন্দু তখনকার মতন পেলেও ক্ষণেকের জন্যে বারেক মা মুখ তুলে তাকালেও সেই কৃপাকটাক্ষের আড়ালে যে তাঁর ভ্রুকুটিও থেকে গেছে তা কি আর জেনেছি তখন! কতো কীই জানার বাকী ছিল যে! . আমার ওই ভিরকুটিতে যে তিনি ভুলবার পাত্রী নন, জানি কি তখন!
.
৩৩.
ইংরেজ রাজার বিরুদ্ধে অহিংস লড়ায়ের স্বেচ্ছাসৈনিক হয়ে ইংরেজবাজারে পা দিতেই শহরের বড় রাস্তার ধারে ধারে সারে সারে খাজার দোকান নজরে পড়ল আমার।
খাজা কথাটার মধ্যেই যেন একটা আমন্ত্রণ রয়ে গেছে-যদিও ওই রাষ্ট্রভাষাতেইখানে, খেয়ে যাও! খা যা তো বটেই, কিন্তু কাছে গিয়ে হাজার হাঁ করলেও যে একখানা পাওয়া যাবে,-মুখে তুলে দেবে কেউ-তা আমার মনে হয় না। এ তো আর চাঁচলের সেই বাণিজ্যার দোকানের অবাধ বাণিজ্য নয়। এখানে টাকা বাজালে তবেই নাকি খাজা মেলে। কিন্তু কোথায় আমার টাকা যে!
খোঁজখবর নিয়ে স্থানীয় কংগ্রেস কার্যালয়ে পৌঁছতে দেরি হোল না। টাউনের তখনকার প্রথম সারির উকীল বিপিনবিহারী ঘোষ মশাই মালদার কংগ্রেসী পান্ডা, একটুখানি খোঁজ খবর পেলাম, আর খবর নিতেই না তাঁর নাম ঠিকানা মিলে গেল তক্ষুনি।
তাঁর কাছে গিয়ে আমার পরিচয় দিয়ে আগমনের কারণ জানাতে তিনি বললেন- তা বেশ-বেশ তো। তোমার বাবাকে আমি ভাল রকম জানি-সাক্ষাৎ পরিচয় ঘটেনি যদিও। আরো কিছু কিছু ছেলে এসেছে এই জেলার এখা-সেখান থেকে তোমাদের ওধার থেকে এখনও কেউ আসেনি তেমন। তুমিই। প্রথম। তবে আসবে সব, এসে পড়বে সবাই। দেশের ডাকে সাড়া না দিয়ে কি থাকতে পারবে কেউ?
মনের দৃঢ় বিশ্বাস তাঁর কথায় ব্যক্ত হয়।
সেই ছেলেরা সব কোথায়, যারা এসেছে আরো? আমি জানতে চাই।
স্বরাজ কুটীরে রয়েছে সব। স্বেচ্ছাসেবকদের জন্যে একটা ছোটখাট বাড়ি নেওয়া হয়েছে তো-সেখানেই আছে। সেখানেই তাদের খাওয়াদাওয়া থাকা। সেখানেই পাবে সবাইকে।
কী করে তারা?
চরকা কাটে, মদের দোকানে, বিলিতি কাপড়ের দোকানে পিকেটিং করে, পথে পথে গান গেয়ে তিলক স্বরাজ ভাভারের চাঁদা তোলে–এই সব আর কি। আপাতত এই। এর পর দাশ মশাই এসে আমাদের যেমন নির্দেশ দেবেন তাই হবে।
কবে আসবেন দাশ মশাই? আমি শুধাই।
আগামী হপ্তায়। তার টেলিগ্রাম এল এই মাত্র।
খুব–খুউব ভালো! খবরটা এমন ভালো লাগে আমার।
এখন যাও, আমার লোকের সঙ্গে গিয়ে স্বরাজ কুটীরটা দেখে এসো গে। ওখানে আরো সব স্বেচ্ছাসেবক আছে না? প্রায় তোমার বয়সীই সবাই। তাদের সঙ্গে তোমার ভাব হবে–তাদের সঙ্গেই থাকবে, কাজ করতে হবে তো?
কী করতে হবে আমায়?
তোমাদের ক্যাপটেন যা বলবেন। চরখা-টরখা কাটতে হবে, পিকেটিং-টিকেটিং-এই সব আর কি। তবে ওখানে রাত্তিরে থাকতে হয়ত কস্ট হবে তোমার। মাটিতে চাটাই বিছিয়ে শোয় কিনা ওরা। তোমার তো অভ্যেস নেই। কোনো চৌকি তক্তপোষ নেই ওখানে। তবে রাত্তিরের খাওয়াটা সেখানে সেরে এখানে আমার বৈঠকখানায় এসে শুয়ো তুমি বরং। কেমন?
