দৈবকৃপার মূলধনকে পুরুষকারের সাধনায় বহুগুণ বাড়িয়েছেন–তার পুরস্কার তিনি দিয়ে গেছেন শুধু তাঁর স্বদেশীয়দেরই নয়, বিশ্বজনকে। কল্পবৃক্ষের মতই তাঁর অকল্পনীয় বিস্তার যেমন জাতির মেদমজ্জায় বিস্তৃত হয়েছে তার শিকড়, তেমনি ফের নানান কান্ডে ফলাও হয়ে তা দিগ্বিদিকে বিস্তারিত–তাঁর সাফল্যে ফলবান-ফলভোগী আজ সকলেই। তাঁর মৌলিক চেতনার আলোয় আর সাধনার সম্পদে আমূল নতুন করে গড়ে দিয়ে গেছেন তাঁর স্বদেশ-তার স্বজাতিকে।
সেই হিমালয়তুল্য অভিব্যক্তির সম্মুখে ব্যক্তিত্বে আমরা তো ঢিবিই। অবিনশ্বর ঐশ্বর্যের সামনে ক্ষণভঙ্গুরতার পরমাশ্চর্য। কিন্তু হাজার হাস্যকর হলেও পাহাড়ের সঙ্গে উইটিবির তুলনাকরা যায় বোধ হয়। সেই WE ঢিবিদের অন্যতম নগণ্যতম এই আমার তাঁর সঙ্গে তুলনায় কী দেখি?
প্রৌঢ় পিতার ঔরসলব্ধ দুর্বল দেহে জন্মসূত্রে মার হাঁপানির উত্তরাধিকার নিয়ে জন্মেছি বেড়ে উঠেছি পোছড়া বাড়ির আওতায়, হোক না নাম তার ওল্ড প্যালেস, টাকাকড়ির ঝুলি ফাঁকা, পড়াশুনায় ঘোড়ার ডিম।
উচ্চতর অভিজাত সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ নেই কোনোখানেই। অবশ্যি গায়ে যেমন এক কড়ার ক্ষমতা ছিল না, তেমনি কাঁধের ওপর বোঝা বওয়ারও কড়ার করিনি কোনো– সাংসারিক দায়ধাক্কার সাথে লড়ালড়ির কোনো কড়াকড়ি ছিল না আমার। না দেহে, না মনে, না মস্তিষ্কে, না জ্ঞানে, না বিদ্যায়, না বুদ্ধিতে, এক কড়ার পুঁজি নিয়ে আসিনি, অহংকারের কিছু চাটুতাও ছিল না তাই। কিন্তু এই কড়ার মধ্যেই বুঝি ক্রান্তি মিলে যায়, নিজের মনেই কেমন করে যেন জানি, তাঁর সংযোগের সংক্রান্তি হলেই। সর্বহারা তার সর্বস্ব হাতে পায় বুঝি অবলীলায়।
মানস সরোবরের বিরাট আধার নয় আমার (রবীন্দ্রনাথের যেমনটি ছিল), আমার ফুটো ভাঁড়ে একটি ফোঁটাও জল ধরে না। আমার ভাঁড়ে ভবানী আমি জানি। আমার ছ্যাঁদার খবর আমি ভালোই রাখি, আমার ছিদ্রান্বেষীরা আর কতটা রাখেন তার! কিন্তু এই মাটির ভাঁড়ের ছিদ্রপথেই, কার মায়ায় কে জানে, অলকনন্দার প্রবাহিনী বয়ে যায়–সেই রহস্যের মূল কোথায়! নিজে ফাঁকা হলেও, ফাঁকিতে পড়লেও, নিজের ফাঁক দিয়েই সে বহুজনের তৃষ্ণ মেটাতে পারে–স্বয়ং তৃষিত থেকেও। টালা ট্যাংকের বিপুল পুঁজি কলের কৌশলের ভেতর দিয়ে গলে গেলেও পাইপ নিজে সে শুন্য শুষ্কই থাকে–কী পাইনি তার হিসাব মেলাতে বসে না সে। সম্পূর্ণ নিজের জলাঞ্জলির মধ্যেই কোথায় যেন তার সার্থকতা থেকে যায়। ভবানীই ভাঁড় পূর্ণ করে থাকেন, রাখেন; তাই সে নিজের ভাঁড়ার শূন্য করে সব উজাড় করে সবাইকে দিলেও তাঁর ভাঁড়ের ভাঁড়ার কখনই আর ফুরোয় না। মধুসূদনদাদার দইয়ের ভাঁড়ের মতই, উপুড় করে ঢেলে দেবার পর চিত করলেই ফের ভর্তি আবার! সেই হেতুই স্বয়ং শঙ্করাচার্যও সোহংতত্ত্বের সবিশেষ বিচারের পরেও তাঁর সর্বশেষ সার কথাটি কয়ে গেছেন–গতিং গতিং ত্বমেকা ভবানী। তাবৎ শূন্য ভাঁড়ের ছিদ্রপথে নিজের গতিমুক্তি দিয়ে যেমন নিজেকে তিনি বিলিয়ে যেতে থাকেন, তেমনি থেকেও যান আবার–আশ্চর্য সেই কেকের মতই বুঝি, যা খাওয়া যায়, সবাইকে খাওয়ানোও যায়, তেমনি আবার হাতেও রেখে দেওয়া যায় সবখানাই।
টইটম্বুর মানস সরোবর আর ফাঁপা জলের কল সমান পাত্র না হলেও সমগোত্রই। দুজনেই জল যোগায়। কার জল কে জানে!
হাওয়ায় উড়তে উড়তে ইস্কুল থেকে ফিরলাম। এট্রেন্স-এর টেস্ট পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছিল সেদিন। কোনোরকমে পাশ করে গেছি।
অথচ পাশ করার কোনো আশা ছিল না। ক্লাস টীচাররাই তো আমাদের খাতা দ্যাখেন। এগজামিনারদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে আর জনে জনে জিজ্ঞেস করে সব কিছুর ফলাফল আগের থেকেই জানা ছিল আমাদের। কে কোন সাবজেক্টে কেমনতর মার্ক পেয়েছে, কার রেজাল্ট হয়েছে রিমার্কেল।
আমারটাও রিমার্কেবল বলতে হয়। আবার নতুন করে মার্ক দিতে হয়েছে আমায় একটা খাতায় অন্তত। আমার অঙ্কের খাতাতেই, বুঝতে পারলাম।
মার্কামারা সেই খাতাটি আমার-কার না জানা?
ভারতের সনাতন আর্যরাই সবপ্রথম সংখ্যার মধ্যেকার শূন্য-কে আবিষ্কার করেছিলেন শোনা যায়। সেই শূন্যকেই আমি পুনরাবিষ্কার করেছিলাম আমার অঙ্কের খাতায়, জেনেছিলাম আমি। বরাবর যেমনটি হয়ে এসেছে। আর, বরাবরই আমায়, কেন জানি না, ওপর ক্লাসে তুলে দেওয়া হয়েছে।
অঙ্কে আমি চিরদিনিই কাঁচা। সাংখ্যযোগে চিরকালই আমার ঐ শূন্যলাভ! দেবী অঙ্কশায়িনী কোনোদিনই আমার মুখ তুলে তাকাননি। তাঁর সঙ্গে আমার শুধু মুখের সম্পর্ক।
বাণিজ্যার দোকানের গোল্লা নয়, গোল্লার মোকামে বাণিজ্য করে এবারকার এই পাল্লা উৎরে যেতে পারব সে ভরসা আমার ছিল না। স্বপ্ন দেখেছিলাম কত-যে। এখান থেকে পাশ করে বেরিয়ে কলকাতায় পড়তে যাব, সেখানকার কলেজে ভর্তি হব গিয়ে, সেই কলেজ, কোন কলেজে জানিনে–শুনেছি মাত্র, যেখানে নাকি ছেলেরা মেয়েরা এক সাথে পড়ে–কত মেয়ের সঙ্গে ভাব হবে আমার, কত সঙ্গিনী পাব- সুন্দর সুন্দর মেয়ে সব! বোনের মতই বা বন্ধুর মতই হল না হয়–সেই বা কী কম লাভ? ইংরেজি বাংলা যে বানানেই ধরিনে কেন! আগুনের কাছাকাছি থাকাটাই যে অনেক, আঁচ পাওয়া যায় তো! ছোঁয়াচ লাগেই। আলো আসে–ভালোবাসার ষোলো আনা নাই পেলাম! আলোকিত হই তো। দেহমন গরম রাখতে পারি। সেই কি কম?
