সকালবেলা উঠে বেরিয়ে পড়তাম এদিকে সেদিকে যেদিকে দু চোখ যায়–দেওঘরের যে কোনো রাস্তা ধরে। একদিন গেছলাম ত্রিকূট পাহাড়ে, আরেকদিন নন্দনকাননে। তবে যেদিন যমুনাজোড়ে ( ঝিরঝির বয়ে যাওয়া পাহাড়ী নদীর নাম ) গেছলাম সেদিনটির কথা বিশেষ করে মনে আছে আমার এখনো।
চাষীদের সবিস্তার আখের খেত ছিল যমুনাজোড়ের দুধার ঘেঁষে। যেতেই তারা সমাদরে অভ্যর্থনা করে এক ভাঁড় রস (আহা, কী তার মাধুরি!) খেতে দিয়েছিল আমায়। আমি না না করলেও তারা আমার মানা শোনেনি। দেহাতী লোকের এই স্নেহাতিশয্য বিস্মিত করেছিল আমাকে। কে জানে এখনো আখের চাষ হয় কিনা সেখানে-প্রাণ টানে সেখানে যাওয়ার জন্যে আমার এখনো! আখেরে আর যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা না থাকলেও আমার। এখনো কি তারা সেদিনের মতই অচেনা অতিথিকে আমন্ত্রণ জানায়–তেমনিই সরস উপচারে সাদরে?
.
৩২.
মাঝে মাঝে এমনি বাড়ি থেকে পালিয়ে বাইরে দীর্ঘদিনের জন্য ডুব মারলেও বাবা-মার মনে আমার জন্য কোনো ভাবনা হতো বলে মনে হয় না–সামান্য একটা মার্বেল ডুবলেও পুকুরের বুকে যতটুকু তরঙ্গ তোলে, আমাদের বাড়ির নিস্তরঙ্গ পরিবেশে ততটুকুও চাঞ্চল্য জাগত না বোধ করি।
বাড়ি থেকে চলে গেলেও যেমন তাঁরা ভাবিত হতেন না, তেমনি দীর্ঘকালের পর আবার বাড়ি ফিরে এলেও অভাবিত কোনো উল্লাস দেখিনি তাঁদের। সব একেবারে স্বাভাবিক। গতকালও যেন বাড়িতে ছিলাম এইরকম ভাব …অতকাল বাইরে কাটিয়ে এলেও। কোথায় ছিলাম, কী করেছি, কিভাবে কাটালাম তার কোনো প্রশ্নই ছিল না, কৌতূহলও নয়, খাপছাড়া তরোয়ালের মই যথারীতি খাপ খেয়ে যেতাম নিজের বাড়ির খোপে আবার।
বাবা-মা যে আমার প্রতি উদাসীন বা স্নেহহীন ছিলেন তা নয়, তাঁরা ছিলেন ঐ একরকমের। একদা সন্ন্যাসে কাটানোর জন্যেই কিনা কে জানে, বাবা ছিলেন সব বিষয়ে নির্বিকার, সব সময় নিরুদ্বিগ্ন। আর মা? মা তো আমার সম্বন্ধে নিশ্চিতই ছিলেন একপ্রকার। বলতেন, তোদের দু জনকে মার পায়ে সঁপে দিয়েছি, আমার কোনো ভাবনা নেই তোদর জন্যে আর। কোনোদিন তোরা কিছু দুঃখকষ্ট পাবিনে, গোল্লায় যাবিনে কখনোই। আমি নিশ্চিন্ত আছি।
মার কথায় নিশ্চিন্ত ছিলাম আমিও। কদাচ নিজের জন্যে কিছু ভাবিনি কখনো। না বর্তমানের না ভবিষ্যতের ভাবনা-কোনোদিন আমায় বিচলিত করেনি একটুকু। ভাবনার কারণ আসার আগেই তা কাটাবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। দারিদ্রের মধ্য দিয়ে গেছি দুঃখ পাইনি, আগুনের আওতায় থেকেচি আঁচ লাগেনি গায়ে, কে যেন সবসময় আঁচল দিয়ে ঢেকে রেখেছে আমায়।
রোগা পটকা দুর্বল দেহ নিয়ে পড়াশুনায় কাঁচা, টাকাকড়িতে ফাঁকা, নিতান্ত অপদার্থ এই আমি কি করে আমার যৎসামান্য জীবনে এত কাণ্ড করলাম, ভাবলে অবাক লাগে। প্রকান্ড তার কোনোটাই হয়ত নয়, কিন্তু সব তিলগুলি জড়ো করে যে তাল, তাকে তো আর বাতিল করা যায় না। পঙ্গু-আমি গিরি লঙন করতে পারিনি ঠিকই, (বিশ হারে অমন বাহুবলশালী রাবণও তো স্বর্গের সিঁড়ি বানিয়ে যেতে পারেনি। কিন্তু প্রায়-মুখ মুক আমি মুখর হলাম যে! মুখ্য নাই বা হলাম। আমার পক্ষে সেটাই কি কম নাকি! তা যার কৃতিত্বে বা কৃপাতেই হই না কেন! আলো যেখান থেকেই আসুক, এই মাটির প্রদীপেই জ্বলছে তো?
এই জীবনে সব কিছুর সোয়াদই তো এক-আধটু পেয়ে গেছি। কিছুর জন্যেই কোনো খেদ নেই আমার। কোনো লোভ না, কোনো ক্ষোভ নয়।
আত্মতৃপ্ত হলে কিছু হয় না; এই আত্মতৃপ্তির জন্যই বোধ করি কিছুই হল না আমার। লেখককর্মে বা কর্মলেখায় উল্লেখ্য তেমন কিছু। কিন্তু কিছু না হওয়ার মধ্যেও যেমন কিছু হয়ে যায়–কিছু কিছু হওয়া যায়, ভেবে দেখলে সেই-কিছুটা তো কিছু কম নয়। যৎকিঞ্চিৎ জীবনে তাই আমার যথেষ্ট।
আধারটাই বড়ো কথা। বড়ো আধারে বেশি ধরে-বেশি ক্ষমতাই বেশি পারে। হ্রদের বুকে যত জল জমে থোষ্পদে কি আর তত! আকাশের ছায়া অবশ্যি দুজায়গাতেই দেখা যায়-দুখানেই ছড়ানো–দুই-ই তার মায়া জড়ানো; কিন্তু হ্রদের বিশালে যে বেশি বর্ষণ হয় নদের প্রবাহ বয়ে সেই স্নেহধারাই দুধারেই তৃষিত শ্যামল অধর সরস করে সমুদ্রের বুকে গিয়ে হারায় আবার। ফের আবার সূর্যের আকর্ষণে উচ্ছ্বসিত সেই স্নেহই আকাশের মেঘপুঞ্জে সঞ্চিত, হ্রদে বর্ষিত আর নদের দ্বারা বাহিত হয়ে যথাসময়ে সাগরমোহনায় গিয়ে গদগদ। এই-ই লীলা।
পরিমিত শক্তির মধ্যে যে স্তিমিত, সীমিত গন্ডীর মধ্যেই তার লিমিট; নিজ সীমান্তের বাইরে কিছুই তার করার নেই। এবং তার হেতু খেদ করে (কিংবা জেদ করেও) লাভ হয় না কোনো।
১৬৩ রবীন্দ্রনাথ যেমন। একাধারে হ্রদ, নদ আর সমুদ্রের সমাহার। এপর্যন্ত মানুষের পরিণতিতে। পরিপূর্ণ মানবতার ঠিক না হলেও, মানবিক পরিপূর্ণতার মাপকাঠি রূপেই ধরা যায় তাঁকে। সেই রবীন্দ্রনাথকেই ধরুন। আধারটা তাঁর কেমন, দেখুন একবার। জন্মসূত্রে পাওয়া স্বাস্থ্য, শরীর আর সম্পদ, মহর্ষিতুল্য পিতৃমাহাত্মে ব্রহ্মসূত্রে টিকি বাঁধা সেই বাল্যকালেই! বৃত্ত এবং মূলের এই একাত্মীয়তাবৃত্ত আর বৃত্তির এমন সমন্বয়-যা প্রায় দেখা যায় না। আগাগোড়া তাঁর জীবনবৃত্তান্তেই তার পরিচয়। পারিবারিক সূত্রে জন্মলব্ধ সাংস্কৃতিক পরিবেশ, সহজ যোগাযোগ, সুযোগসুবিধা। অসাধারণ আভিজাত্য। তিন যুগের ঐতিহ্য। স্বভাবত-অর্জিত সেই মহাসম্পদ স্বচেষ্টায় বহুগুণ বর্ধিত। সুন্দর শরীর আর স্বাস্থ্য নিয়ে জন্মেছিলেন, ব্যায়াম কুস্তি করে তা আরও সুগঠিত করেছেন–হাতের কব্জিটা কি দেখেছিলেন তাঁর? সেই অনুপাতে দীর্ঘায়ত দেহ-রূপে অপরূপ। নিজ আয়াসে যেমন তাঁর দেহগঠন, নিজ প্রয়াসেই তেমনি আত্মশিক্ষণ। সেই সঙ্গে একাত্মভাবে অনন্তযোগে কাব্যে সাহিত্যে শিল্পে সঙ্গীতে সংস্কৃতিসৃজনায় অফুরন্ত তাঁর স্বতোৎসার। আজীবন। অশ্বমেধযজ্ঞে দিগ্বিদিক-বিজয়ে বেরিয়েছেন যেমন, তেমনি আবার শান্তিনিকেতনে ছিল তাঁর রাজসূয়-বিশ্বভারতীর যে মহৎ যজ্ঞে সারা বিশ্বের আমন্ত্রণ। সেখানে নানান দেশ থেকে তাঁর প্রায় সমযোগ্যরা রাজকর নিয়ে এসেছে। নানান কর্মকান্ড আর কল্পকীর্তির নানা রূপে নিজের নব নব উন্মেষে মজে থেকেছেন–নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি দেশবিদেশে।
