স্টেশনে নেমে সোজা চলে গেলাম মহাদেবের মন্দিরে। রাস্তাঘাট সব চেনাজানা ছিল। মা-বাবার সঙ্গে গিয়েছিলাম আগে। দেখলাম সেইরকম মন্দিরের পথের দুপাশে গালার তৈরি কাঁচ পাথরের চুমকি বসানো ঝকমকে যত চুড়ির দোকানসোনার চুড়িকেও হার মানায় তারা-দোকানে বসেই বানাচ্ছে যত কারিগর, যেমনটি নাকি আগেও দেখেছিলাম।
প্যাঁড়ার দোকান তাদের ধারে ধারেই কিন্তু ধারে খাওয়াবার পাত্র নয় কেউ তারা।
মন্দিরের মধ্যে গিয়ে দর্শন করলাম বাবাকে। কষ্টিপাথরের মত নিকষ কালো লেতেলে মাথায় হাত বুলোতে কী আরাম! ভালো লাগল বলেই বাবার মাথায় হাত বুলালাম খানিক।
বাবার মাথাটা একটু টোল খাওয়া। তার কারণ স্থানীয় পুরাণ কথায় যা বলে, খুদে পাণ্ডাটির কাছে তা জানা গেল।
একদা শিবভক্ত রাবণ কৈলাস থেকে বাবাকে টেনে হিঁচড়ে নিজের কাঁধে তুলে স্বর্ণলঙ্কায় নিয়ে যাচ্ছিল। দেবাদিদেবের কিন্তু মোটেই ইচ্ছা ছিল না সেখানে যাবার। কিন্তু ভক্তের বাহুবন্ধন আর মায়াপাশ কাটানো দায়। অ্যান্দুর এসে তাঁর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলল, নিজের শীর্ষস্থানীয় সুরধনীকে রাবণের পেটের মধ্যে তিনি সেঁধিয়ে দিলেন। ফলে রাবণকে দারুণ প্রেরণায় পেয়ে গেল তারপর। বাবাকে ঐখানে নামিয়ে মুক্তধারায় সে স্বচ্ছন্দ হতে বসল। বাবা বললেন, এপ্রহরের মধ্যে তুমি এলে তো এলে, নইলে এই যে আমি বসলাম, নড়ছিনে আর এখান থেকে। রাবণ বলল, প্রহর কিসের ঠাকুর। এক দণ্ডেই আমি আসছি। কিন্তু সেই অফুরন্ত প্রবাহিনীর বেগ কি একটুখানি? চার প্রহর কেটে গেল রাবণের দেখা নেই। তারপরে কাজ সেরে ফিরে এসে কিছুতেই সে আর বাবাকে তুলতে পারে না। নড়নচড়ন নেই আর তার কথারও নড়চড় হবার নয়। রাবণ আর কি করে? ক্রোধভরে বাবার মাথায় বিরাট এক মুক্কা মেরে না নিজের মক্কায় ফিরে গেল সে। তাঁকে একচোট দেখে নিয়ে সেইখানে রেখে গেল অবশেষে।
আর, রাবণের চোট তো চারটিখানি না। তার বিশখানা হারে বিরাণীমণী ধাক্কাই! একটু টোল খেয়ে তার টাল সামলাতে হলো বাবাকে।
তদবধি ভক্তাধীন ভোলানাথ ভক্তবৎসল নারায়ণের ভৃগুপদ লাঞ্ছনার ন্যায় ভক্তের সেই টিপসই নিজের শিরোধার্য করে রয়েছেন। রাবণের সেই কীর্তি, কর্মনাশা নামে কীর্তিত, এখনো দেওঘর দিয়ে প্রবাহিত নাকি–সেই নদীর জল কিন্তু কেউ পান করে না। স্নান করে না কেউ সেখানে।
সুন্দরীর গালের মত সুচারু না হলেও সেই টোলে হাত বুলোতে গিয়ে গোল বাধল যা! মন্দিরের পাণ্ডারা এমন ধমক লাগালো আমায় যে, টলতে টলতে বেরিয়ে এলাম।
সঙ্গে আমার কোনো পাণ্ডা ছিল না। বিনা দনীর এই দর্শনাথীর অযথা হস্তক্ষেপ। আর, সব পূজারী পাণ্ডার প্রাণে সইল না বোধ হয়। কে না কে তাদের সর্বত্বসংরক্ষিত দেবতার, মাথায় এসে নিখরচায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছে। হৈ হৈ করে উঠল সবাই। তাদের তাড়নায় বেরিয়ে আসতে হল বাইরে।
বাইরে এসে মন্দিরটা প্রদক্ষিণ করলাম একবার। বার বার করছিলেন ভক্তদের অনেকে। মন্দির বেষ্টন করে তার গা-লাগাও সারি সারি ঘোট ঘোট খুপরির মতন–তার খোপে খোপে মনোবাঞ্ছাপূরণের প্রার্থনায় বাবার কাছে হস্তা দিয়ে পড়ে রয়েছে কতজন।।
তারই একটা খালি মতন পেয়ে তার পৈঠার ওপর পা ঝুলিয়ে বসলাম আরামে। তার আগে চন্নামৃতের কুণ্ড থেকে পেট ভরে পান করে খিদে মিটিয়ে নিয়েছি আমার।
খিদের মুখে সেই চন্নামৃতের স্বাদ প্রায় অমৃই! রাতদিন কত না পূজাথী ভক্তিভরে বাবার মাথায় দুধ ঘি দুই মালাই গঙ্গাজল ঢালছে, প্যাড়ার ভোগ লাগাচ্ছে, তার সবটাই তো ধুয়েমুছে একটা নালি বেয়ে সেই কুণ্ডে এসে জমা হচ্ছে। সে কস্তু যেমন তুষ্টিকর তেমনি পুষ্টিকর, একাধারে ক্ষুধাতৃ দুই-ই মেটায়, সন্দেহ কি।
বসে রয়েছি চুপচাপ। এমন সময়ে কোত্থেকে সহসা আমার সমবয়সী সেই কিশোর পাণ্ডাটি এসে হাজির।
এসেই সে গোটা চারেক প্যাঁড়া দিল আমাকে। দোনার মধ্যে নিয়ে প্যাঁড়াগুলো হাতে করেই এসেছিল সে।
এই প্যাঁড়ার জন্যেই কি এখানে বসে এতক্ষণ ধরে প্রার্থনা করছিলাম আমি নিজের অগোচরে।
কিন্তু আমার মনের কথা ওই ছেলেটা টের পেলো কি করে?
আগেকার কাল হলে, স্বয়ং বাবাই ওর ছদ্মবেশ ধরে আমার কাছে এসেছেন মনে করে তক্ষুনি তার পায়ের তলায় দৎ হয়ে লুটিয়ে পড়তাম হয়ত।
কিন্তু সেরূপ কোনো প্রেরণাই জাগল না আমার–তেমন বিশ্বাস ছিল না তো। পাওয়ামাত্র অম্লানবদনে খেতে লাগলাম প্যাঁড়াগুলো–বিনা বাক্যব্যয়ে। খিদে পেয়েছিল বেজায়…
তোমাদের পাণ্ডা কে এখানে? ছেলেটা শুধালো আমাকে।
পাণ্ডা আছে আমাদের-এর আগে যখন মা-বাবার সঙ্গে এসেছিলাম দেখেছি-তবে নাম জানি না তাঁর। ইয়া গাট্টাগোট্টা চেহারা।
এখানকার সকলের চেহারাই ভাই ঐরকম। বাবার প্রসাদে আর রোজ বিকালে ওই ভাঙ খেয়ে। বলে হাসতে লাগল ছেলেটা-ভাঙই বাবার উত্তম ভোগ। পেস্তা বাদাম পিষে মালাই লচ্ছির সঙ্গে মিলিয়ে বানানো হয়। খেতে যা–কী বলব। আহা! তার দুই চোখ নিমীলিত হয়ে আসে।
ভাঙও খেতে দেবে নাকি আমায়? আমি সভয়ে বলি-বাবার ঐ উত্তম প্রসাদ?
না না, তোমাকে দিতে যাব কেন ভাঙ? সে আমার ভয় ভাঙতে চায় : বাঙালীরা ভাঙ সইতে পারে? খেলে তুমি উলটে পড়বে এখনই।
যে কদিন ওখানে ছিলাম মন্দিরের চত্বরেই পড়ে থাকতাম। রাতভোর ভক্তের ভিড়ে গমগম করত জায়গাটা। খিদে পেলেই চন্নামেও আর মাঝে মাঝে সেই ছেলেটা এসে প্রসাদী প্যাঁড়া দিয়ে যেত আমাকে। যজমানদের পুজো করিয়ে বাবার কাছে দেওয়া তাদের ভোগের থেকে পাওয়া নিজের ভাগের খানিকটাই বোধ হয়।
