আর হাতী চাপতাম আমরা, সম্বচ্ছরে সেই পূজার সময়। রাজবাড়ির দুর্গোৎসব হত পাহাড়পুরে (এখনও হয় বোধ হয়), সেখানে হাতী চেপেই যেতাম আমরা–আমরা আর বামুনপাড়ার ছেলেরা সবাই। বামুনপাড়ার অনেকে রাজার একরকম আত্মীয়ই হবেন–দূর সম্পর্কিত হলেও। কেউ তাঁদের ডাক্তার, কেউ জোতদার, কেউ বা শুধুই পুরোহিত। পুজোর চারদিন হাতী চাপবার ফুর্তি ছিল আমাদের।
পাহাড়পুর পর্যন্ত চার মাইল রাস্তা হাতী চেপে মসমঁসিয়ে যাবার মজাই ছিল অদ্ভুত! পুজোর আমোদর উপরি আরেক প্রমোদ! এখন, ট্রেনযাত্রার কথাটাই বলা যাক। বাবা আগের থেকেই স্টেশনে লোক পাঠিয়ে গোটা একটা থার্ড ক্লাস কামরা রিজার্ভ করে রাখতেন–লটবহর সমেত আমাদের সবাইকার জন্যে। বাড়ির থেকে শুভযাত্রায় শ্রীদুর্গা স্মরণ করে রওনা হওয়ার পর আমরা সেই কামরায় গিয়ে চাপতাম।
তারপর সারা ট্রেনযাত্রায় সেই লাগেজ তুলতে নামাতে কী কম হাঙ্গামা! গোদা-গাড়িঘাটে ট্রেন ছেড়ে ধরতে হত স্টীমার, ওপারে লালগোলায় গিয়ে চড়তে হত কলকাতার ট্রেনে। অত লাগেজ নিয়ে কুলীদের সে কী চেঁচামেচি-তাদের সঙ্গে কত দর কষাকষি-বকাবকি বাবার! শেয়ালদায় নেমেও সেই ঝঞ্ঝাট ফের! ছ্যাকরা গাড়ির কোচোয়ানের সঙ্গে কচকচিও কম নয়।
ভেবে আমার অবাক লাগত, একদা সংসারবিরাগী বাবা কেন যে এই সারা সংসারের গন্ধমাদন ঘাড়ে করে তীর্থভ্রমণে বেরুতেন! এ জিজ্ঞাসার জবাব আমি খুঁজে পেতাম না।
অথচ যখন তিনি নিজে বেরুতেন একলাটি, কার্যগতিকে কলকাতায় কি আর কোথাও, তখন কোনো লটবহর নয়, কেবল একটিমাত্র হাতব্যাগ থাকত তাঁর সঙ্গে। আর তার ভেতর থাকত আরেক প্রস্থ তাঁর জামাকাপড়, জমা-খরচের খাতা আর দরকারী কাগজপত্র। এই নিয়েই তিনি যেতেন।
কলকাতায় গেলে তিনি ফিরে আসতেন কিছু মোটঘাট নিয়েই অবশ্যি। হয়ত কিছু আনকোরা বাসনপত্র, ছাতাটাতা, নতুন ধুতি, শাড়ি, মশারি-টশারি, বুড়িখানেক ল্যাংড়া আম, ভীমনাগের সন্দেশ–এই মোটমাট।
আমাদের নিয়ে বেরুলে কখনো যেনে তিনি বৈদ্যনাথ দেওঘর, কখনো পুরী ভুবনেশ্বর, কখনো বা কাশীধামে। কখনো আবার শুধুই কলকাতায়–আমাদের মাসিধামে।
মাসির বাড়ি যাওয়ার সুযোগ এলে আমরা যেমন পুলকিত হতাম, মাকেও তেমনি হাসিখুশি দেখা যেত ভারী।
রামতনুবাবুর গলিতে (নম্বর মনে পড়ে না) বড়মাসির বাড়ি উঠতাম আমরা। সাত বোনের ভেতর ঐ খুদিদিদির ওপরই মার টান ছিল বেশি।
পরে আমিও আবার উধাও হয়ে যেতাম ঐ সব জায়গায়। বাবার সঙ্গে গিয়ে গিয়ে যে সব স্থানের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল, বাড়ির থেকে পালিয়ে সেখানেই যেতাম বেশি বেশি। কিন্তু ঠিক তীর্থের টানে সেটা নয় বোধ হয় আদৌ। কেননা শ্রীক্ষেত্র পুরীধামে আমি আর দ্বিতীয়বার যাইনি–সমুদ্র বিশেষ আন্দোলিত করেনি আমায়। সাগরের চেয়ে গঙ্গা ঢের প্রিয় ছিল আমার কাছে–তার কিনারায় বসে ঢেউ গুণে সময় কাটাতে কী আরাম! পুরী কি ভুবনেশ্বর মন্দিরের আকর্ষণ আমি কখনো বোধ করিনি। জগন্নাথ দেবের অন্নপ্রসাদে তেমন উৎসাহ পাইনি বলেই হবে হয়ত। কাশীধামে গেছি–সেখানকার মালাই লচ্ছির তুলনা হয় না, ভাগলপুরেও গেছি ভুল করে–সেখানকার হালুইকরের দোকানের পুরু সর একটু গুরুপাক হলেও অতি উপাদেয়–আর বাবা বৈদ্যনাথের প্রসাদী প্যাঁড়া–কী উপমা দেবো তার? কাশী গয়া প্রয়াগের প্যাঁড়া খেয়েছি বাবার সঙ্গে গিয়ে, কিন্তু দেওঘরের প্যাঁড়ার জোড়া নেইকো-প্যারালাল নাস্তি।
কাটিহার দিয়ে কেটে বেরুতাম, তারপর নানাদিক ঘুরে ফিরে, কিউল বরেটনি মতিহারী নানান জংশন হয়ে (ভাগলপুরও ঐ রকম বিপথের মধ্যেই পড়েছিল বোধ হয়) এখানে সেখানে নেমে এক-আধদিন ধরমশালায় কাটিয়ে অবশেষে পৌঁছে যেতাম সেই দেওঘর ধাম–ততটা বাবা বৈদ্যনাথের প্রতি ভক্তিবশত নয় যতটা ঐ আহামরি প্যাঁড়ার টানেই। আন্ধ্যারালান্ডু প্যাঁড়া!
আশ্চর্য লাগে এখন, টিকিট সঙ্গে না থাকলেও রেলগাড়িতে কখনো আমায় কোনো অসুবিধায় পড়তে হয়নি। প্রায়ই দেখেছি আমার পাশের সহযাত্রী একগাদা টিকিট বার করে দেখিয়েছেন চেকারকে–এবং চেকার ভদ্রলোক আমাকেও ওঁর আনুষঙ্গিক জ্ঞান করে দৃপাত করেননি আমার দিক ফিরে। এবং আহারাদিরও অসুবিধা হয়নি কখনো। যেখানেই গেছি না, সেখানকার কোনো না কোনো প্রবাসী বাঙালী ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলা আদর করে বাড়িতে ডেকে নিয়ে খাইয়েছেন আমায়-বাড়ি পালানো ছেলে মনে করেই হবে বোধ হয়-কী সব মানুষই না ছিল যে সেকালে! (এখনও অন্য নামে আছেন তাঁরা নিশ্চিত) কেউ কেউ বাড়ি ফেরার গাড়ি ভাড়াও অযাচিত দিতে চেয়েছেন আবার। দিয়েছেনও জোর করে গছিয়ে-বহুৎ সদুপদেশের সহিত। আজও অত অচেনার ভেতরে একজনের কথা আমার মনে আছে এখনো-আমার সমবয়সী ছেলেটি-বাঙালী নয়, বিহারী। বিহারী হলেও বাংলা বলতে পারত বেশ।
মধুপুর স্টেশনে আলাপ হয়েছিল তার সাথে–কোনো পাণ্ডার সাকরেদ হবে–কিংবা বাচ্চা এক পাণ্ডাই-যাত্রী পাকড়াতে বেরিয়েছিল।
টের পেয়েছিল যে আমার টিকিট নেই–সঙ্গে পয়সাটয়সাও নেই একটা। যশিডি জংশনে গাড়ি থামতে আমাদের প্রায় সবাইকে নামতে হল সেখানে-সেখান থেকে বৈদ্যনাথধাম– যাবার অন্য গাড়ি ধরতে হয়। ছেলেটি নেমেই না চার পয়সা দামের একখানা দেওঘরের টিকিট কিনে হাতে দিল আমার। বলল যে, বাবাকে দর্শন করতে যাচ্ছ তো? মন্দিরেই আমার সঙ্গে দেখা হবে–এখন আমি যাত্রী ধরতে চললাম।
