পুরুষ্টু রসগোল্লাগুলো কুঁচিয়ে কুঁচিয়ে পুরু সরের সঙ্গে মিকচার বানিয়ে আমি খেতাম আহা, রসনার সে যেন স্বর্গলাভ!
সকালে আমরা মার রান্না খেয়ে ইস্কুলে যেতাম–মাছের ঝোল আর ভাত। ইস্কুল থেকে ফিরে খেতাম ফুলকো লুচি। রাত্রেও আবার লুচি, মাছের তরকারি। মার রাঁধা চচ্চড়ি দিয়ে খানকতক লুচি, আবার মিস্টি ক্ষীর মিশিয়ে মধুরেণ সমাপয়েৎ করে তার ওপর। গাওয়া ঘিয়ে ভাজা সে লুচির সোয়াদই আলাদা। সেই ছোটবেলাতেই যা খেয়েছি–তারপরে আর পাইনি কোনোখানে, খাইনি কোথাও।
আর সেই বিরাট একখানা ছাদ! সকাল সন্ধ্যে যেখানে মুক্তি অবাধ। মজাসে ফুর্তি করে বেড়াও। কতো কবিতাই না ভেঁজেছি সেই ছাদে বেড়াতে বেড়াতেই-কত চতুস্পদীর সঙ্গেই পায়চারি করা আমার সেখানে! কোথায় গেল সেসব কবিতা-আমার মনের আগুনের ফুলকি যতো! কোথায় গেল তারা? কে জানে!
যত মুকুল ধরে তার সবই কি ফুল হয়ে ফোটে? আম গাছে যত বোল আসে কতটুকুই বা তার ফলাও হয়? তবু তাইতেই তো তার বোলবোলাও! সেই সৌরভেই দশদিক আমোদিত।
স্বপ্নমায়ায় বিভোর হয়ে কেটেছে সেই স্বর্গীয় (এবং স্বৰ্গত) দিনগুলি আমার কৈশোরের।
সেই স্বর্গসুখেও অরুচি ধরতে আমার মাঝে মাঝে। মন যেন উধাও হয়ে যেত কোথায়। ভোগ সুখকে তুচ্ছ করে দুখভোগের জন্য কাঁদত বুঝি মন? হেথা নয় হেথা নয়, অন্য কোনোখানে-ভেবে আনচান করত বুঝি প্রাণ?
বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতাম আমি এক-এক সময়। কাউকে কিছু না জানিয়ে এক বস্ত্রে-একলাটি–সঙ্গে একটিও পয়সা না নিয়ে। পয়সা পাবই বা কোথায় তখন? আর, পয়সা সঙ্গে নেবার দরকারও বোধ করতাম না কখনো। অতিথিপরায়ণ সচ্ছল দেশে আতিথ্যলাভ তখন সহজ ছিল বেশ।
বাবা এককালে সন্ন্যাসী হয়ে দিগ্বিদিক ঘুরেছিলেন, তাঁর মাথার সেই ঘূণী পোকাই কি আমার মধ্যে বাসা বেঁধেছিল নাকি? কিংবা এ পোকা হয়ত সব ছেলের মগজেই গজগজ করে–বাড়ি থেকে পালিয়ে ঘূর্ণী হাওয়ায় ঘুরিয়ে কোথায় উড়িয়ে নিয়ে যেতে চায় তাকে সেই ঘূণীপাকে পড়লে আর রক্ষে নেই। এবং এই পোকাই বুবি যথাসময়ে ঘুণপোকা হয়ে ভালোবাসার ছলনায় এসে কুরে কুরে খায় তাকে আবার।
ফি বছর দুর্গাপূজার পর আমাদের সবাইকে নিয়ে বাবা তীর্থভ্রমণে বেরুতেন। বিজয়ার পর তাঁর সেই দিগ্বিজয়ে গোটা সংসারটা যেত আমাদের আনুষাঙ্গিক। বাড়ির কুটোটি পর্যন্ত না নিয়ে তিনি নড়তেন না। মোটা মোটা বড় বড় গাঁটরি বাঁধা হতো–একটা থলে ভর্তি যত বাসনকোশন-পেতলের হাঁড়ি কড়াই, হাতা-খুনতি, থালা বাটি গেলাস সব–এমনকি মায় শিল-নোড়াটি অব্দি (বিদেশ বিভুঁয়ে মশলা বাটার জন্য মিলবে নাকি শিল কোথাও? রেঁধেবেড়ে তো খেতে হবে!) আমি সায় দিতাম বাবার কথায়-হ্যাঁ বাবা, শীল হচ্ছে কুল-ক্ষণ, কেউ কি তা কাউকে দিতে চায় কখনো? মার মতে একটা কুলক্ষণ-ঐ ভূতের বোঝা বয়ে বেড়ান। তোর ভর্তি জামা কাপড় গামছা ভোয়ালে পিরান কুর্তা। তার ওপর তোষক বালিশ মশারি-টশারি নিয়ে বিছনাপত্রের গোটা তিনেক গাটরি। টুকিটাকি জিনিস-টিনিসে ভর্তি তদুপরি আরো দুটো বাক্স আবার।
রাজার পিলখানায় হাতী ছিল বিস্তর–সবার সেরা তাদের মোহনপ্রসাদ। যেমন চেহারায় তেমনি দাঁতের বাহারে। বিরাট আকার হাতীর বড় বড় দুটো দাঁত। যেমন লম্বা তেমনিই মোটা। মাঝে মাঝে মাথা খারাপ হত মোহনপ্রসাদের। ক্ষেপে গিয়ে সোজা সে চলে যেত সেই রাজবাড়িতে-রাজাবাহাদুরের কাছেই সটান। মাহুত সহিস কেউ তাকে সামলাতে পারত না। রাজাবাহাদুর ভারী ভালোবাসতেন তাকে। তিনি স্বহস্তে হাঁড়ি হাঁড়ি রসগোল্লা তাকে খাওয়াতেন। তাই খেয়ে তবেই সে শান্ত হত। রসগোল্লা খাবার জন্যেই সে ক্ষেপে যেত আমার মনে হয়।
মোহনপ্রসাদ ক্ষেপলে বাণিজ্যাঠাকুরের দারুশ বাণিজ্য! হাতীটা ক্ষেপলেই তিনি চার কড়াই রসগোল্লার ভিয়েন চড়াতেন। দুজনের মধ্যে গভীর কোনো ষড়যন্ত্র ছিল কিনা কে জানে!
বাবারও ভারী প্রিয় ছিল মোহনপ্রসাদ। সব হাতীর চেয়ে বেশি পছন্দ করতেন তিনি ওকেই–ওই নামমাহাত্মের জন্যেই কিনা কে জানে। ওর পিঠে চেপে আর মালপত্রের লটবহরে গোরুর গাড়ি বোঝাই করে সামসি রওনা হতাম আমরা। সামসি ছিল আমাদের কাছাকাছি স্টেশন–দশ বারো মাইল দূরই হবে বোধ হয়। কিন্তু স্টেশনে যাওয়ার আগেও বাবার আরেক যাত্রাপর্ব ছিল আবার। মা বলতেন, যাত্রা নয়, ওটা তার নিতান্তই থিয়েটার করা।
সেটা ছিল তাঁর পাঁজিপুথি দেখে যাত্রা। দিনক্ষণ দেখে, কত প্রহর কত দণ্ড পল বাদে কোন সময়টা যাত্রার পক্ষে শুভ সেটা লক্ষ্য করে, তারপর সবার প্রাতঃকৃত্যাদি সারিয়ে, গাড়ি ধরবার তখন আঠারো ঘণ্টা বিলম্ব থাকলেও। হয়ত রাত তিনটেই ঠিক ক্ষণটি, একটু না ঘুমোতেই রাত দেড়টায় সবাইকে হই হই করে তুলে, সবার প্রাতঃকৃত্যাদি সারিয়ে, শয়নঘর ভোজনঘর বাদ দিয়ে, আমাদের সবাইকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে বৈঠকখানার ঘরটায় নিয়ে এসে তিনি বসে থাকতেন। যথাকালে আসল যাত্রার জন্য অপেক্ষা করতেন সেখানে ঘন্টার পর ঘটা।
মোটঘাট আগের থেকেই বাঁধাছাঁদা হয়ে মজুত থাকত সেইখানে। তিনটেগোরগাড়ি বোঝাই হয়ে যেত আমাদের যত লটবহরে। দশ মাইল রাস্তা গোরুর গাড়িতে টিকিয়ে টিকিয়ে যাওয়া কী কষ্টকর! ইস্টিশনে যাবার পাকা সড়ক হয়নি তখনো। (এখন তো শুনি বাস যায় নাকি পিচমোড়া রাস্তায়।) বেশির ভাগ গোরুর গাড়িইে যেতে হত, কখনো কখনো অবশ্যি রাজবাড়ির থেকে হাতী আসত আমাদের স্টেশনে নিয়ে পৌঁছে দেবার … জন্যে-খবর দিয়ে রাখলে আগের থেকে ফিরতি পর্বেও তেমনি স্টেশন থেকে আমাদের নিয়ে আসার জন্যও হাতীযেত এক এক সময়।
