তৎকালের লেখা–ভারতবর্ষ উত্তরা কল্লোল প্রভৃতিতে প্রকাশিত-আমার লম্বাচৌড়া কবিতাগুলি মানুষ এবং চুম্বন দুটি বই হয়ে এম সি সরকার থেকে বেরিয়েছিল পরে। সেযুগে কবিতার জন্য একালের মতন পাঠকের তেমন আগ্রহ না থাকলেও বছর খানেকের মধ্যেই বই দুটির সংস্করণ নিঃশেষিত হয়েছিল মনে আছে। কিছু টাকাও এসেছিল আমার পকেটে। কিন্তু তারপরে বই: দুটি আর ছাপা হয়নি। এখন তো তার কোনটারই পাত্তা পাওয়া যায় না আর।
আমার কাছে ওই মানুষ-চুম্বনের কোনো কপি নেই। প্রকাশকের কাছে তো নেইই। এমনকি, খুঁজে দেখেছি ফুটপাথেও তাদের পড়ে থাকতে দেখা যায় না। পাওয়া গেলে হয়তো ছাপানো যেত এখন।
কিন্তু সেই কাঁচা বয়সের এসব লেখা এমন কিছু চমৎকার হয়েছিল আমি মনে করি না। তবে তার ভেতরকার আবেগটা ছিল হয়ত খুব। চমৎকার না হলেও গোড়াকার আমার। লেখাগুলো যে চুমুৎকার হত বেশ, তার কোনো ভুল নেই।
এমনকি, আন্দামান-ফেরত মহাবিপ্লবী বারীনদা উপেনদার সাপ্তাহিক পত্র বিজলীতেও আমার একটা ছোট্ট চুটকি চমত্ মেরেছিল একসময়…মনে পড়ে বেশঃ
এক চুমুকে গভূষ করার মত লেখাই!
জানি জানি/ সবাই সবে/ ছাড়বে।
চলার পথে/ কে কার চুমু কাড়বে?
চুমু যেমন কাড়াকাড়ির তেমনি ছাড়াছাড়ির, তেমনি আবার চিরকালের মত হারাবার জিনিস! তার কি কোনো ভুল আছে আর?
কিন্তু ভাবি আজ, এই সব কবিতা সেই বয়সে আমার মাথায় এল কি করে? খাতার পাতায়ই বা এল কীসে?
আমার লেখা বলে মনেই হয় না যেন।
তার কিছুদিন আগেই তো আমি মহাকবি কৃত্তিবাসের পদাঙ্ক ধরে, শিবরাম পন্ডিত কবিত্বে বিচক্ষণ/ লঙ্কাকান্ডে গাহিলেন গীত রামায়ণ/ ফেঁদে বসেছিলাম…সেই আমিই কি এই আমি? এই কেঁদে কূল পাচ্ছে না যে?
কার পদাঙ্ক এসব? কোন্ অঙ্কশায়িনীর অনুসরণে এই পদাবলী?
কৃত্তিবাসী কীর্তির হনুকরণে লঙ্কাকান্ডে নিজের মুখ না পুড়িয়ে মিষ্টিমুখের কিসকিন্ধ্যা কান্ডে এমন করে কে টেনে নিয়ে এলো আমায়? কার ইঙ্গিতে লেখা আমার এই সব?…
এমনকি, বহুদিন পরেও সেই সংশয় আমার যায়নি এখনো। বহুবর্ষ পরের এই ছত্র দুটিতেও তা ব্যক্ত হয়েছে :
লিখেছি কি আমি অনেক বন্ধু?
আমি তো সেসব লিখিনি।
ছিলো যে লেখিকা অনেক বন্ধু!
ছিলাম আমি তার লেখনী।
কে ছিল সেই লেখিকা? ওহ্নে কৃতিত্ব কার? এই প্রেরণার জন্য কার কাছে ঋণী আমি?…রিনিই কি?
নাকি, সেই তিনিই?
৩. সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়
৩১.
সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়, বলে না?
সুখী ব্যক্তি মাত্রেই ভূতের কিল খায়, খেতে বাধ্য হয়। আধি ভূত ব্যাধি ভূত–ডাক্তার উকীলের ছদ্মবেশে এসে নানা মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে বারো ভূতে মিলে কষে কিলোয় তাদের শান্তি-স্বস্তি পায় না। ঝুট-ঝামেলায় জেরবার হয়ে যায়।
শুধুই বহির্ভূত নয়, মনের মধ্যেও ভূত থাকে যে আবার! কিছুতেই সুখে থাকতে দেয় কাউকে।
ছেলেরা কিন্তু এমনিতেই সুখী-স্বভাব গুণে সর্বদাই স্বচ্ছন্দ। খুব দুঃখী দরিদ্র পরিবারের ছেলেরাও মনের আনন্দেই থাকে–বাপ-মারা দুঃখকষ্টে কাটালেও সন্তানদের কখনো তার আঁচ পেতে দেন না–ছেলেবেলাটা বেশ কেটে যায় তাদের। বেশির ভাগ ছেলেমেয়েদের বেলাতেই তাই। তা যদি নাও হয়, তাহলেও তারা বাস্তবের দুঃখ মনগড়া স্বপ্নের জগতে বাস করে ভুলতে পারে।
তাই বলে কি ছোটদের মনে সুখদুঃখের ছোঁয়া লাগে না? আশপাশের ছোঁয়া লাগে বইকি। তাছাড়া, কোনো কারণ না থাকলেও, অকারণেও নিজের মনে তারা সুখদুঃখ পায়।
এই সুখী, এই অসুখী তারা-ক্ষণে ক্ষণেই। কেন যে তা কে বলবে! অহেতুক দুঃখসুখের খেলা তাদের মনে লেগেই থাকে সময় সময়। সুখের মধ্যে থেকেও কেন যে তারা কষ্ট পায়, কিসের অভাব বোধ করে কোথায় যেতে চায় কে জানে! ছেলেদের দুঃখ কিসের, কে কইতে পারে।
বাল্য কৈশোর সুখের কাল, বলে থাকেন সকলেই। বয়স্করা পিছন পানে তাকিয়ে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন।
আর হোটদের বয়স্কদের দিকে চেয়ে দীর্ঘনিশ্বাস পড়ে বুঝি। বড় হবার, বড়দের মত আচার-আচরণ করার স্বাধীনতার স্বাদ পাবার সাধ জাগে বোধ হয়। অন্তনিহিত অবচেতনের কোনো স্পৃহই কি?
কী সুখেই যে কেটেছিল আমার জীবনের সকালবেলাটা। ক্ৰীচার কমফর্ট বলতে যা বোঝায় তার কোনো কিছুরই অভাব ছিল না আমার। দক্ষিণ পশ্চিমে ভগ্নদশা হলেও এককালে প্রকান্ড প্রাসাদের প্রায় আধখানাই আমাদের। লম্বাচওড়া বড় বড় ঘরে সারি সারি খাট পাতা, তার ওপরে পুরু গদির নরম বিছানা বিছানো। সেই বিছানার কোলে গদিনশীন হয়ে দু ধারে পাশবালিশ নিয়ে সিল্কের মশারির মধ্যে ঘুমানোর কী আরাম। পূবের টানা বারান্দাটার মোটা মোটা থামগুলির খিলানের মাথায় ঝাঁক ঝাঁক পায়রার বাসা–তাদের বকমের মিঠে ডাক শুনে রোজ সকালের ঘুম ভাঙা যেন এক স্বপ্নের মতই।
আর, রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই না বাবার প্রসাদ লাভ!
প্রসাদ বলতে গত রাত্রের বাবার খাবারের ভাগ আমাদের ভোগের জন্য রেখে দেওয়া।
সকালে বাবার হত হবিষ্যান্ন; আতপ চালের ভাত গাওয়া ঘি দিয়ে ডাল তরকারির সাথে খাওয়া, মাছটাছ কিছু নয়। তিনি ছিলেন পাক্কা নিরামিষাশী। আর রাত্রে হত তাঁর ফলার। সের দশেক দুধ মন্দা আগুনের আঁচে সারা দিন ধরে ফুটে ফুটে মরে মরে ক্ষীর হয়ে থাকত, তার ওপরে সর পড়তে মোটা রুটির মতই। আ মরি মরি! ক্ষীর ভাগের সবটুকু আর সর ভাগের অর্ধেক বাবা খেতেন রোজ রাত্তিরে–সঙ্গে থাকত সেই সুবিখ্যাত মানকি বলা (কলার ফলার বাবার বারো মাসই) আর সেই ঋতুর যা ফলমূল তাই। আর সেই সরের আদ্ধেকটা তিনি রেখে দিতেন আমাদের দুভায়ের সকালে উঠে খাবার জন্যে। রসগোল্লাও দু-এক জোড়া থাকত তার সঙ্গে আবার।
