সবাই নিজের বেচাকেনা নিয়েই ব্যস্ত। সাহিত্যোৎসাহী কেউ নয়। একটু-আধটু তাকিয়েই না অবহেলাভরে চলে যাচ্ছিল সবাই। আমি অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে নজর রাখছিলাম।
খানিক বাদে সেই বন্দীবাবুকে দেখা গেল সেইখানে।
আরো দেখা গেল তাঁকে স্থাণুর মতই সেখানে দাঁড়াতে। সকৌতুক আগ্রহে তিনি পড়ছিলেন সব দেখলাম।
সবটা পড়ার পর তিনি ফিরে দাঁড়াতেই তার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল আমার।
তুমি তো দেখছি দস্তুরমতন লেখক হে! একটু এগিয়ে এলেন তিনি আমার দিকে।
কী যে বলেন! সলজ্জ আমি বলি–কিচ্ছু হয়নি ওসব। লাগিয়ে দিয়েছি এমনিই। মনে এলো তাই।
না না, বেশ হয়েছে। বেশ হয়েছে। এমনি করেই তো হয়। তোমার একটা কবিতাও বেরিয়েছে বারের ভারতীতে দেখলাম। চমৎকার হয়েছে কবিতাটা!
বলেন কি? শুনেই না আমি লাফিয়ে উঠেছি-কই, আমাদের ভারতী তো আসেনি এখনো। আপনি পেয়ে গেলেন এর মধ্যে?
সব, কাগজই পাই কিনা আমরা। সরকার বাহাদুরের সৌজন্যে। দৈনিক সাপ্তাহিক মাসিকপত্র সব। আমাদের অ্যালাউন্স থেকেই কাটা যায় দামটা। ইচ্ছে করলে যে-কোন বইও আমরা আনাতে পারি-পলিটিক্সের বই বাদে। যাবে তুমি আমাদের বাসায় বইপত্র সব দেখতে? আজই চল না কেন, এখনই?
না, যাব একদিন। খুব শীগগিরই যাব একদিন। তবে আজ না, এখুনি বাড়ি যেতে হবে। ইস্কুল থেকে ফিরতে দেরি হলে মা ভাববে আবার। মাকে বলে আসিনি তো। মাকে বলে যাব একদিন শীগগির।
বলে আমি পাশ কাটাই। আমাদের ভারতীও এসে গেছে নিশ্চয় এতক্ষণ। তাড়াটা আমার সেইজন্যেই-মার জন্যে নয়।
এসব কী লিখেছিস রে। বাড়িতে পা দিতে না দিইে মার খববদারি–কী লিখেছিস কাগজে এসব?
কী লিখেছি মা? কোথায়? আমি যেন কিছুই জানি না-হাটখোলার ঐ কাগজটার কথা বলছ বুঝি?
আমার হাটের হাঁড়ির খবরটা মার কাছে কেউ এসে ভেঙেছে বলে বোধ হয় আমার।
হাটখোলা কী আবার? ভারতীতে বেরিয়েছে তো! তোর এই পদ্যটা
ও! ওই ভারতীর লেখাটা! নিরুৎসুকের মত বলি–ওটার কথা বলছো?
দুখানা ভারতী এসেছে এবার আজ। একখানা তোর বাবার নামে-যেমন আসে। আরেকখানা তোর নামেই আবার।
দেখি দেখি। আমি হাত বাড়াই-আগ্রহ দমন করে।
দেখবি তো। কিন্তু তোর এই পদ্যটার মানে কী, তা বলবি তো আমায়?
পদ্য পদ্য বোলো না মা। পদ্য না, কবিতা। আমার রাগ হয়ে যায়–ওকে কবিতা বলে।
কবিতাই হল না হয়, কিন্তু মানে তো ওর থাকবে একটা।
কবিতার আবার মানে কী? কবিতার কি কোনো মানে হয় কখনো মা? ধরতে গেলে, মানে তো খুব সোজাই! কেন, তুমি বুঝতে পারছে না?
বোঝা তো সোজাই রে! তা কি আর বুঝতে পারছিনে। কিন্তু মানের মধ্যে আরেকটা মানে থাকে যে। মার জেদ-তোর এই কিশোরকালের সঙ্গিনীটি কে, শুনি।
কে আবার? কেউ না। মনগড়া সব। কবিরা সব মন থেকে বানিয়ে বানিয়ে লেখেন জানো না কি? যেমন রবীন্দ্রনাথ তেমনি আমি।
তাই নাকি! হাসতে থাকেন মা।
তা না তো কী! রবিবাবুর মানসী যেমন, তা কি আর ছিলো নাকি কখনো! সোনার তরী কি চোখে দেখা যায় নাকি? অপরকে শোনানোর জন্যেই বানানো ওসব।…ভারী খিদে পেয়েছে মা, কী খেতে দেবে দাও এখন।
কথাটা ঘুরিয়ে আমি খাবার ঘরের দিকে মাকে ফিরিয়ে দিই।
তারপরও ভারতীতে আমার কবিতা বেরিয়েছিল আরও। তার এক-আধটার এক আধটু মনে আছে আমার এখনো …..
কবিগুরুর সেই ভুলভাঙ্গা কবিতাটার…বুঝেছি আমার নিশার স্বপন হয়েছে ভোর মালা ছিল, তার ফুলগুলি গেছে/ রয়েছে ডোর/ নেই আর সেই চুপি চুপি চাওয়া/ ধীরে কাছে এসে ফিরে ফিরে যাওয়া/ বাহুলতা শুধু বন্ধনপাশ বাহুতে মোর …
জবাবে একখানা লিখেছিলাম আমি এইধারার
সত্য হে কবি, এ যে ভুল ভাঙা
আর এক ভুল ধরিতে।
এ যে তটিনীর এক কূল ভাঙা
আর এক কূল গড়িতে।
প্রেম চলে যায়, বাঁধা তো রহে না;
তাই ফেলে যায়- বোঝা তো বহে না,
কেন চাহো তারে একটি স্বপনে।
ভরিতে?
সুখবেদনার এ যে ফুল রাঙা
কালি নিশাশেষে ঝরিতে।
এইরকম পাঁচ ছ ছত্রই প্রায়। তারপর আর মনে নেই আমার।
রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত সেই বিদায় অভিশাপের হাসি? হায় সখা, এ ত স্বর্গপুরী নয়। পুষ্পে কীটসম হেথা তৃষ্ণ জেগে রয়…কবিতাটারও একটা উতোর গেয়েছিলাম আবার–ভারতীতে নয়–সাপ্তাহিক সচিত্র শিশির-এর পৃষ্ঠাতেই।
পেয়েছিলে দশ শো বছর দেবযানী,
তবু তোমার মিটলো নাকো তৃষা?
দশটি নিশি পেলেই মোরা ঢের মানি,
তোমার ছিল লক্ষ মধু নিশা।
লক্ষ দিনে সখ্যনীড়ে বন্ধুটিরে/পাওনিকি?
লক্ষ নিশি বঙ্গে মিশি লক্ষ চুমু/খাওনি কি?
লক্ষ চুমুর তুল্য কী?
লক্ষ চুমুর মূল্য কী?
এক জীবন মিললো যাদের
লাখ জীবনে ভুললো কি?
পাইনি মোরা দশ শো বছর–চাইনেও।
সয় না মোদের একটা রাতের/ঘুমহানি।
দুনিয়া আমার স্বর্গ আমার–তাই দেব।
দাও না আমায় এক পলকের
চুমুখানি।
একটি চুমুর/তুল্য কী?/একটি চুমুর
মূল্য কী?
এই জনমে মিললো যাদের/আর
জনমে ভুললো কি?
এ ছাড়া, এর পরে, ভারতবর্ষে বেরিয়েছিল আমার প্রায় শ-দুই ছত্রের দীর্ঘ দুপাতা ব্যাপী এক কবিতা-চুম্বন বলে। সেটাকে চুম্বনের শত নাম–চুমুর হরিহরছত্রই বলা যায়। তাতে ছিলো চুমুর নানা আখ্যানের নানান ব্যাখ্যান। দুঃখের বিষয় সেই ছত্রাকারেরও এক ছিটেও মনে এখন আর পড়ে না আমার।
কবিতাটা এক ফাগুন সংখ্যায় বেরিয়েছিল–যে কারণে সম্পাদককে গাল খেতে হয়েছিল শনিবারের চিঠির কাছে-ফাগুনের ভারতবর্ষে আমাদের জলধরদা বুড়ো বয়সে আগুন ছুটিয়েছেন-ইত্যাকার ব্যঙ্গোক্তির পরিসীমা ছিল না।
