ফুৎকৃত হয়ে নিজেই আমি ঘুমিয়ে পড়েছি কখন।
পরদিন খুব ভোরেই হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল আমার। যে আমার সাত সকালের আগে ভোর হয় না কখনো, সেই কুম্ভকর্ণের এই পাঁচ সকালে ঘুম ভাঙাটা আশ্চর্যই। একটা কোকিল একটানা ডেকে যাচ্ছিল কোথায় যেন!
আর, সেই ডাকে পেটের মধ্যে কী যেন গজ গজ করতে লাগল আমার! মনের ভেতরে গজিয়ে উঠছিল আপনার থেকেই।
অভ্যন্তরের সেই গঞ্জনাকে টেনে এনে খাতার ওপর পেড়ে ফেলতে কেন যে বাসনা জাগলো কে জানে…
মাথার কাছে একটা ছোট্ট টীপয়ের ওপর বইখাতা সব থাকত আমার। টেনে নিয়ে লিখতে বসলাম ফসফস করে। আর খাতার পাতায় যেন লেখা হতে লাগল আপনার থেকেই
কোকিল ডাকে ভোরের ফাঁকে আম্রশাখে
ভোরের বাতাস যায় যে চিরে…
ব্যথার তীরে হঠাৎ ধীরে।
সেই ব্যথা কি যায় চারিয়ে চারি দিকে?
যায় হারিয়ে স্মৃতির পাকে?
নাড়িয়ে দেয় কি জীবনটাকে?
মনে পড়ে ছেলেবেলার বন্ধু খেলার
মিলনমেলার সঙ্গিনীকে
প্রতিদিনের রঙ্গিনীকে।
কথায় গভীর ব্যাথায় নিবিড়
সেই মোহিনীর সঙ্গটাকে!
কোকিল ডাকে।
এই রকম প্রায় আট স্ট্যানজাই। তার পর আর মনে পড়ে না আমার। অভাবিত এই লেখাটা কোথেথকে এল এমন হঠাৎ? এই ছন্দ মিল শব্দের ঝর্ণা প্রপাত-যার মধ্যে কাশীরামী কৃত্তিবাসী পয়ারকীর্তির বিন্দুমাত্র ছায়াপাত নেই? এ কৃতিত্ব কার? অবাক হয়ে আমি ভাবি। নিজের বলে দাবী করতে পারি না কিছুতেই।
সেদিনই কবিতাটা প্রবাসী আর ভারতী–দুই পত্রিকাতেই পাঠিয়ে দিই ছাপার জন্যে।
.
৩০.
দিনকতক বাদে লেখাটা আমার ফেরত এল প্রবাসীর থেকে। সঙ্গে চারুদার এক চিরকুট। চিঠিটার মর্ম মোটামুটি : তোমার কবিতাটা মন্দ হয়নি। কিন্তু এটি প্রবাসীতে ছাপিয়ে তোমাকে উৎসাহ দিতে আমি চাই না। সমস্ত মন দিয়ে এখন তোমার লেখাপড়া করাই উচিত, অন্য কোনোদিকে ঝোঁক যাওয়াটা ঠিক হবে না। লেখা একটা মারাত্মক নেশা, এই বয়সে তোমাকে পেয়ে বসলে তোমার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। লেখকও হবে না-মানুষও হতে পারবে না। বরং পরে বড় হয়ে যথাসময়ে এসবের চর্চা কোরো না হয়। সঙ্গীত,কবিত্ব আর ল্যাজ কারো ভেতরে থাকলে তা আটকানো যায় না। তোমার মধ্যে যদি তা থাকেই প্রকাশ পাবেই–যথাকালে দেখা দেবে–অযথা জোর করে অসময়ে তাকে টানাটানি করে বার করার কোনো দরকার নেইকো।…ইত্যাকার পত্রখানা সদুপদেশ নিঃসন্দেহেই; কিন্তু মর্মান্তিক। কথাগুলো আমার মর্মে মর্মে গাঁথা হয়ে ছিল অনেকদিন।
কিন্তু ভারতীর থেকে এদিকে কোনো সাড়াশব্দই নেই। বুঝলাম, চারুদা নেহাৎ সম্পর্কিত বলেই লেখাটা পড়েছেন এবং পাঠিয়েছেন পত্রপাঠ-ভারতীর তেমন কোনো গরজ নেই, সেখানকার কারো সাথে চেনাজানার বালাই নেই আমার। নির্ঘাৎ লেখাটা তাঁদের ছেঁড়া কাগজের ঝুড়িতে পাচার হয়েছে।
যাকগে, বয়েই গেল আমার। চারুদার কথাটা মনে পড়ল, ল্যাজ যদি আমার থাকেই, বেরুবেই একদিন। কেউ চাপতে পারবে না। নিজের ল্যাজের প্রতি বেশি টান দেখানোর কোনো মানে হয় না। নাই বেরুলো কোনো পত্রিকায়, প্রকাশ পাওয়া নিয়ে কথা। একেলা গায়কের নহে তো গান, গাহিতে হবে দুইজনে। তেমনি কেবল লেখকের নয় তো লেখা; পাঠকের অপেক্ষা রয়েছে সেখানে।
হাতে লিখে লিখে বিলিয়ে দেবো নাহয় জনে জনে–তার কী হয়েছে? পড়ুয়া নিয়ে হল কথা, পড়ানো নিয়ে ব্যাপার।
কিন্তু কাঁহাতক লেখা যায় বসে বসে? কাগজের পিঠে কলম ঘষে ঘষে রাতদিন? বিলির চেয়ে অন্য কোনো বন্দোবস্ত করাটাই ভালো না কি?
তাই করলাম। ডিমাই সাইজের প্রকান্ড একখানা কাগজ নিয়ে ছোটখাট সাইজের গল্প কবিতা ছাড়া প্রবন্ধ হাস্যকৌতুক, এমনকি, ক্রমশ প্রকাশ্য ধারাবাহিক উপন্যাসেরও একটুখানি দিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে, আষ্টেপৃষ্টে ভরে দিলাম। তারপরে শ্রীশিবরাম চক্রবর্তী কর্তৃক সম্পাদিত লিখিত এবং প্রকাশিত সেই পত্রিকাটি হাটখোলার কালী মন্দিরের গায়ে গিয়ে তাঁদের সাহায্যে মুদ্রিত করে দিয়ে এলাম। আঠা দিয়ে উত্তমরূপে সাঁটার পর গদ্গদভাবে তাকালাম তার দিকে।
হট্টমন্দিরের দেয়ালে আমার খেয়ালটা সেই প্রথম দেয়ালা!
আমাদের হাটখোলা জায়গাটা একটুখানি নয়। অশ্রদ্ধা করবার মতন না। কলকাতার শ্ৰদ্ধানন্দ পার্কের মতন চারখানা আঁটে গিয়ে সেই জায়গাটা। প্রতি বুধবারে সেখানে বিরাট হাট লাগে। বিশাল জনসমাবেশ। আশপাশের পঞ্চাশখানা গাঁয়ের খদ্দের পসারীরা আসে। বহুত ইতরভদ্র জমায়েত হয় সেখানে।
দুপুরের আগেই থেকেই পসারীরা আসতে শুরু করে। দেড়টা-দুটোর মধ্যে হাট জমজমাট। লাখখানেক লোক কেনাবেচায় আসে নির্ঘাৎ। তার ভেতর জনকতকের নেকনজর কি পড়বে না আমার লেখাটার ওপর? কেউ কি দয়া করে পড়বে না একটুখানি দাঁড়িয়ে?
হাটের দিন বুধবার। সেদিন সকালেই ঐ দেয়ালপত্র লাগিয়েছি কালীমন্দিরের গায়।
ইস্কুল ছুটির পর বিকেলে একলাই ফিরছিলাম সেদিন। বিষ্ণু ইনটার-ক্লাস-টুর্নামেন্টের ম্যাচ খেলতে সকাল সকাল ছুটি নিয়ে নেমেছে গিয়ে ফুটবল মাঠে। একা-একাই ফিরতে হচ্ছিল আমাকে।
বাণিজ্যাঠাকুরের দোকানে বাণিজ্য একলাই সারতে হোলো। তারপর বুধবারি ভিড় ঠেলে হট্টমন্দিরের কিনারায় গিয়ে ঠেকলাম।
দুয়েকজনের নজর পড়ছিল দেখলাম আমার কাগজটায়–কিন্তু দেখে দাঁড়িয়ে পড়া, কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ার তেমন গরজ কারো বিশেষ দেখা গেল না।
