ভদ্রলোক কোনো জবাব না দিয়ে মুচকি হেসে চলে গেছেন। ভুরু কুঁচকেছিল আমার।
সেই থেকেই একটা কৌতূহল ছিল। আজ চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন হয়ে সব কিছুর হদিস মিলে গেল এখন।
রাত্তিরে বাবা মা সত্য সকলের শোবার পর আমি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসলাম। আলো জেলে বইয়ের ভেতর থেকে রিনির চিঠিটা বের করলাম… একটু আদর করলাম চিঠিটাকে।
এত রাত্তিরে আলো জেলে কি হচ্ছে আবার? পড়াশোনার সময় পেলিনে আর?
— মা কি ঘুমের মধ্যেও সজাগ? কি করে যে তিনি বুঝতে পারেন সব। চোখ বুজেও বুঝি টের পান মা।
না মা। বেশিক্ষণ না। একটা ভেরি আরজেন্ট হোমটাসকের কথা মনে পড়ে গেল হঠাৎ। কালকে ক্লাসের ফার্স্ট পীরিয়ইে সেটা আবার। সেরে রাখছি তাই এখন।
কেন, কাল সকালে করলে কি হত না? রাত জেগে পড়াশোনা করলে শরীর খারাপ হয়। পরীক্ষা-টরীক্ষার সময় সে আলাদা কথা।
— কাল সকালে উঠেই মুসলিম হোস্টলে যেতে হবে আমায়। কাবিল হোসেনের কাছে অঙ্ক শিখতে। ফিরে এসেই নেয়ে-টেয়ে ইস্কুল যেতে হবে। এখনই করে রাখছি তাই। বেশিক্ষণ লাগবে না মা, তুমি ঘুমোও।
কত কথাই লিখেছিল রিনি! তুমি কেমন আছ, আমি ভালো আছি ইত্যাদি মামুলি সাত সতেরর পর আনকোরা একটা খবর দিয়েছিল সে…
কলকাতায় এখন বেজায় হইচই বুঝলে। মহাত্মা গান্ধী এসেছেন। অসহযোগ আন্দোলনের খবর পেয়েছে নিশ্চয়। সেই সম্পর্কেই এসেছেন তিনি এখানে। টাকা তুলছেন তিলক স্বরাজ ফান্ডের। লাখ টাকা আয়ের ব্যারিস্টারী ছেড়ে দিয়ে সি আর দাশ রাস্তায় নেমেছেন আজ। আর তাঁর সঙ্গে বিলেত-ফেরত আই-সি-এস সুভাষ বোস হাকিমি না করে। কি চমৎকার দেখতে তাঁকে-দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। আর হাজার হাজার ছেলেমেয়ে ইস্কুল কলেজ ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে পথে। মদ আর বিলিতি কাপড়ের দোকানে পিকেটিং করছে তারা। পাঁজা পাঁজা বিলিতি কাপড় পোড়ানো হচ্ছে পার্কে পার্কে। সবাই মেতে উঠেছে একসঙ্গে। আমার ইচ্ছে করছে ইস্কুল- টিস্কুল সব ছেড়েছুঁড়ে আমিও ওদের সঙ্গে গিয়ে ভিড়ে যাই। তুমিও কেন চলে এসো না এখানে এখন? দুজনায় একসঙ্গে দেশের কাজে লাগা যাবে কেমন!
জানতাম বইকি। ততটা উত্তাল না হলেও এই সুদূর গ্রামাঞ্চলেও আন্দোলনের ঢেউ এসে লেগেছিল আমাদের। অসহযোগের সব খবর নিয়মিত পেতাম আমরা খবর কাগজের মারফতে। বাবার আসত সাপ্তাহিক হিতবাদী আর সঞ্জীবনী। আর আমার জন্য তিনি আনাতেন অমৃতবাজার পত্রিকার হিতবাদী সংস্করণ, যাতে কিনা, চালু ইংরেজিটা শিখে ঐ ভাষায় আমি একটুখানি সড়ড় হতে পারি।
তা, বিদ্যায় না সড়গড় হই, সংবাদে সরগরম ছিলাম বইকি।
বাতি নিবিয়ে শুয়ে পড়িয়ে বিছানায়।… রিনির আমন্ত্রণের কথাটা ভাবি শুয়ে শুয়ে। কি কর যে যেতে পারি আমি কলকাতায়।
মনে পড়ে একদা হেডমাস্টার মশায়ের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছিলাম যে, আই ওয়ান্ট টু বি এ পেট্রিয়টু। তারপরে হিংসার পথে সতীশের সঙ্গে দেখোদ্ধার করতে গিয়ে ধাক্কা খেয়েছি দারুণ। উদ্ধার পেয়েছি দৈবক্রমে। এবার কি তবে অহিংসাব্রতে দেশ সেবার কাজে লেগে পড়তে হবে? রিনির সাথে?
দেশোদ্বারই কি আমার বৃত্তি হবে শেষটায়? বৃত্ত হবে এই জীবনের? শুয়ে শুয়ে ভাবি তাই।
ঘুম আসতে চায় না কিছুতেই।
কুরুক্ষেত্রে সাক্ষাৎ ভগবান পথ দেখিয়েছিলেন পার্থকে। তার জন্মগত ক্ষাত্রবৃত্তির কথাটা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যথাকালে। এইভাবে যথোচিত প্রবৃত্ত করে তার বৃত্তপথেরতার রথের সারথি হয়েছিলেন স্বয়ং।
ক্ষত্রিয়সন্তান অর্জুনের ক্ষাত্রবৃত্তি হলে, ব্রাহ্মণসন্তান আমার কী বৃত্তি হবে তাহলে? ব্রাহ্মবৃত্তিই নাকি?
বাবা বলেন যে, ব্ৰহ্ম জানাতি যঃ সঃ ব্রাক্ষণ। ব্রহ্মকে জানতে পারলে তবেই নাকি বামুন হয়। এদিকে ব্রহ্মকে নাকি কিছুতেই জানা যায় না আবার–তিনি সবার বাক্যমনের অতীত, অবাঙমনসোগোচর–বলে থাকেন বাবাই।
বাবার কথাটা মাকে বলায় মা বলেছিলেন যে, অবাক্ মনসোগোচর–কথাটার মানে কিন্তু ই নয় রে! ওর ভেতরের মর্ম আরেক। আ মানে ব্রহ্ম, তিনিই তো আদিস্বর আর বাক্-এর অর্থ হচ্ছে বা পানি পাদ ইত্যাদি ইন্দ্রিয়াদি, মানে, পৃথিবীর আর জীবনের সব কিছু জড়িয়ে বেবাক, ব্রহ্মের বৃত্তপথ, সেই জীবনবৃত্ত আর ইন্দ্রিয়বৃত্তির পথে মনের যে প্রকাশ, তার মধ্যেই তিনি গোচর, তিনি প্রত্যক্ষ। আবার গোচরের অর্থও আছে আলাদা। বামনের সাহায্যে অঙলীন তিনি, যে গোচারণা করছেন, গো অর্থে পৃথিবীও হয় ফের, এইভাবে যে পৃথিবীকে চালাচ্ছেন সেই পৃথিবীতেই তিনি পরিদৃশ্যমান, সবার গোচরীভূত। এই সূত্রে প্রতীকী অর্থে শ্রীকৃষ্ণেন্দ্র গোচারণাকে শুদ্ধ টেনে এনে বাবার কথাটার প্রতীকক্রিয়া তাঁর আলোচনায় প্রকাশ পায়।
আধ আধ ঘুমে মার কথাটা মনের মধ্যে খেলে যায়।
তা না হয় হলো, গোলোকেই থাকলেন না হয় ভদ্রলোক, আর ব্রহ্মও নয় ব্রহ্মলোকে বিরাজ করলেন শাতিতে, যথার্থ বৃত্তপথে প্রবৃত্ত করতে তাদের কেউই এখন আগ বাড়িয়ে আসছেন না আর আমার কাছে।
এদিকে বামুনের বৃত্তি বলতে ইহলোকে তো দেখতে পাই তিনটি ফুৎকার মাত্র–শাঁখে ফু, কানে যু, আর উনুনে ফুঁ মানে শাখ ঘন্টা বাজিয়ে মন্দিরের ঠাকুরের পুরুৎগিরি প্রাত্যহিক দেবসেবায় ভাগ বসাবার–নিয়মিত আলোচাল কাঁচকলা আদায়ের ফিকির, আর কানে ফুঁ হলো কান পাকড়ে মন্ত্র দিয়ে শিষ্যদের ধনেপ্রাণে সর্বস্বান্ত করার চক্রান্ত; এবং এর কোনোটাই যদি না হয়, অগত্যা সেই উনুনে ফু–নিজেই রান্নাঘরের ঠাকুর বনে বিরাজ করা শেষ পর্যন্ত। বামুনের এই তিন বৃত্তির কোনোটাতেই আমার প্রবৃত্তি হয় না। এই তিনটি ফুৎকারই এক ফুৎকারে আমি উড়িয়ে দিয়েছি।
