আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালোই হোলো বাবু। আপনাদের বাড়ি পর্যন্ত আর যেতে হল না আমাকে। একটা চিঠি ছিল আপনার। বললে সে।-ভালোই হোলো যে পেয়ে গেলাম আপনাকে এখানে। পলকমাত্র দেখেই না সেটা পকেটে পুরে ফেলেছি। লেখাতেই চিনতে পেরেছিলাম আমার রিনির চিঠি। কলকাতার থেকে লিখেছে। ডাকপিয়নের কাছে অভাবিত বাবু ডাকের মর্যাদালাভে উৎসাহিত হয়েছিলাম। তারপর খামখানা হাতে পেয়ে মন আনন্দে থই থই করে উঠল।
হ্যাঁ, ভালোই হয়েছে। প্রতিধ্বনিত হয়েছি আমি পিয়নের কথায়। বাড়িতে গিয়ে চিঠিখানা মা-বাবার হাতে পড়েনি-ভাগ্যিস্! কার চিঠি রে? তোর মামার? বিঃ ওবোয়।
হ্যাঁ, আমার। অনুনাসিক সুরে বলার জন্য আমার কথাটা আমার মতই শোনায় অশ্বথামা হত ইতি গজ-র মত সত্যভাষণ হয়ে যায়।
চল বাণিজ্যা ঠাকুরের দোকানে যাই। রসগোল্লা খাই গে চল। সে বলে।
প্রায় প্রাত্যহিক রুটিন আমাদের ওখানে গিয়ে ঐ রসগোল্লা খাওয়া। গরম গরম রসগোল্লা, খাসা খাসা মডা নামায় ওরা বিকেলেই–খেতে যে কী মজা।
দাম দেবারও দায় ছিল না আমাদের। মাস-কাবারে গিয়ে হিসেব দিয়ে বাণিজ্যা ঠাকুরই আদায় করে নেবে বাবার কাছ থেকে। তাছাড়া আমাদের বাড়ির জন্যও যায় রোজকার রসগোল্লা সন্দেশ ওখান থেকেই। গোটা গাঁ জুড়েই বাণিজ্য ঠাকুরের অবাধ বাণিজ্য।
বসে বসে খাচ্ছি আমরা দুজন, এমন সময় বছর ত্রিশ-বত্রিশের এক ভদ্রলোক আসতেই বাণিজ্যাঠাকুর উঠে সসম্মানে অভ্যর্থনা জানালেন তাঁকে–আসুন, আসুন বন্দীবাবু! আসতে আজ্ঞা হোক। কী সৌভাগ্য আমার আজ। চেয়ার এগিয়ে দেয় বসবার।
অবাক হয়ে তাকাই আমরা। বন্দীবাবু আবার কী রে বাবা! কে রে বাবা! এত খাতির কিসের জন্য ওনাকে?
ভদ্রলোক বসেই হাঁকলেন-দিন যা ভালো ভালো খাবার আছে আপনার আজ। কী কী হয়েছে শুনি? পাঁচ দশ টাকার দিয়ে দিন। খাওয়া যাক বসে বসে। খানার খাতির দেখেই তাঁর খাতিরখানার অর্থ জানা যায়!
আজ্ঞে খাজাও হয়েছে আজ। বালুসাইও বানিয়েছি। গরম আছে এখনও–দেবো? তাছাড়া, বড়ো বড়ো বঁদিয়া। রামবোঁদে যার নাম। আর রসগোল্লা মন্ডা রসকদম্ তো রয়েছেই আমাদের।
দিয়ে যান এনতার! যত আপনার প্রাণ চায়।
প্রকান্ড এক থালায় সব সাজিয়ে এনে ধরে ঠাকুরমশাই ভদ্রলোকের সামনে।
বুঁদিয়াগুলোর চেহারা কী মোটা মোটা রে দেখেছিস? কেমন সব হৃষ্টপুষ্ট বোঁদে। বিষ্ণু আমাকে দেখায়।
রসে বুঁদ হয়ে রয়েছে। সজিভ হয়ে আমার রায়।
খাজাগুলোও তো খাসা দেখছি রে! খেলে বেশ মজা হোতো।
খেলে তো ভালোই হতো রে, কিন্তু আমার বরাদ্দের বাইরে গেলে রাগ করবেন বাবা।
তবে থাক্।
ওর ওই ক্ষুণ্ণ কণ্ঠ শুনে ভদ্রলোক বুঝি অক্ষুণ্ণ থাকতে পারেন না। তাকান আমাদের দিকে।
আহা, তুমি সেই ছেলেটি না? বলে ওঠেন আমাকে দেখেই-যুদ্ধে যাবার জন্য যে নাম লিখিয়েছিল সেদিন সব প্রথম? তিনি কন।-শিবরাম না কী যেন নাম?
— হ্যাঁ। শিবরাম চক্রবর্তী। আপনি কী করে জানলেন?
আমিও যে ছিলাম সেদিনকার সভায় গো! আমন্ত্রিত হয়ে গেছলাম। লক্ষ্য করেছি তোমাকে। এ ছেলেটি কে?
আমার বন্ধু। এক ক্লাসে পড়ি।
বেশ বেশ। মন দিয়ে পড়াশুনা করবে-বুঝলে? আর, ব্যায়াম-ট্যায়াম করে শরীরটা বাগাতে হবে। বাণিজ্যামশাই, আমাকে যা যা দিয়েছেন ওদেরও তাই তাই দিন সব। দাম যা লাগে আমি দিয়ে যাচ্ছি।
দুখানা দশ টাকার নোট ফেলে দিয়ে তিনি চলে যান।
ভারী বড়লোক তো লোকটা। কে মশাই উনি? আমি বাণিজ্যাঠাকুরকে শুধাই।
রাজবন্দী ভদ্রলোক, জানো না বুঝি? এখানে ইনটার্ন হয়ে রয়েছেন এই কিছু দিন থেকে। সরকার থেকে মোটা টাকার ভাতা পান কিনা! মাস মাস আসে ওঁর টাকা–দুতিন শ করে হবে বোধ হয়। ঠিক জানি না। পুরো টাকাটা সেই মাসের মধ্যেই খরচ করার নিয়ম সরকারকে। প্রতি মাসে খরচার হিসেব দিতে হয় সরকারকে-খরচ নাহলে যা বাকী থাকে ফেরত পাঠাতে হয় সরকারকে। সেই কারণে ওঁরা মরীয়া হয়েছে খেয়ে না খেয়ে খরচা, করেন. সারা মাস ধরে। এই ব্যাপার।
বাঃ, বেশ তো! শুনেই আমার উৎসাহ হয়। উপায় করার কড়ার নেই অথচ খরচ কার কড়াকড়ি-এর চেয়ে ভালো ধরাধামে আর কিছুই হতে পারে না।
সরকারী কান্ডই আলাদা। ওনাদের হালচাল কি জানার উপায় আছে দাদা? বাণিজ্য ঠাকুর বাতলান।
আমি তো জানতাম, দারুণ অত্যাচার করে ওরা রাজবন্দীদের ওপর। এ তো দেখছি একেবারে উটোই এখানে। ভেবে আমার তাক লাগে। একদিকে যেমন এই বদ বাবহার, অন্যদিকে তেমনি এই বদান্যতা কেমন যেন সরকারী অন্যথা বলেই মনে হতে থাকে আমার।
ও তাই। আমার মনে পড়ে যায় তখন।…
এর আগেও দেখেছি আমি ভদ্রলোককে এখানকার হাটবাজারে কয়েকবার-মার ফরমাস মতন টুকিটাকি কিনতে গিয়েই-উনি আসা মাত্তর সারা বাজারে যেন সাড়া পড়ে যেত অকস্মাৎ।
ঐ বন্দীবাবু আইছে! বন্দীবাবু আইছেন! উল্লাসের হুল্লোড় খেলে যেত কেমন।
আর, আসার সঙ্গে সঙ্গে দর চড়ে যেত বাজারে। দু টাকা সের মাছের দর উঠে যেত সাত টাকায় চড়াৎ করে। বাজারের সব কিনতেন উনি সবাইকে টেক্কা মেরে। নোট ছড়াতে ছড়াতে উনি যেতেন, আর থলে হাতে সঙ্গের লোকটা মোট কুড়াতে কুড়াতে যেত।
মাছ মাংস তরিতরকারি আনাজপাতি মিলিয়ে সে এক ইলাহী মোচ্ছ। তাকিয়ে দেখবার মতই ব্যাপার।
একবার এক দোকানী শুধিয়েছিল ওনাকে, শুনেছিলাম আমি–আচ্ছা বাবু, কী করলে বন্দীবাবু হওয়া যায় কইবেন সেটা একবার আমাদের? আমরাও হতাম তাহলে।
