কেন কে জানে! মিষ্টি মুখ দেখলেই আমার কেমন যেন আদর করতে ইচ্ছে করে। আজও করছিল একটু একটু।
করলেই পারতে! করলে না কেন? সে বলে : কিচ্ছু বলত না তোমাকে।
কি করে করি বলো? তুমি ওকে ছুঁলে না পর্যন্ত! একবারটিও হাত দিলে না ওর গায়ে? আমি কি করে একেবারে ওকে আদর করে বসি। তুমি যদি একটু কিছু করতে…আশ্চর্য! এখানে যেজনে লোকে আসে তার তো কিছুই তুমি করলে না!
সেইজন্যেই আসা বুঝি? দেহের পরিতৃপ্তি? মনের আনন্দটা বুঝি কিছু নয়? একটি রূপসী তরুণীর ক্ষণকালের সাহচর্য-তার দাম কি কিছুই না? নারীসঙ্গে কাটানো গেল খানিকক্ষণ, গানটান শোনা হলো, গল্পগুজব করলাম, সময়টা কাটল বেশ–এই ফুর্তি–এই তো যথেষ্ট ভাই!
সঙ্গসুখই ঢের, মানলাম তোমার কথাটা। কিন্তু আসঙ্গ সুখ নাই হোলো, সেই সঙ্গে সামান্য একটুখানি অনুষঙ্গ সুখে কী ক্ষতি ছিল ভাই? আমি কইতে যাই।
ছিল বই কি ক্ষতি। সে খতিয়ে দেখায়ঃ তাতে কী হানি হতে পারে, সেটা কতখানি ঘটতে পারে–তা জানা নেই তোমার। জানো, কী সব শক্ত শক্ত অসুখ থাকে এদের? দূষিত সংসর্গে সেইসব বোগ এদের দেহে এসেছে–এদের থেকে অন্যদের দেহে–সারা সমাজদেহে ছড়িয়ে পড়বে। এদেশে এসব ব্যাধির সুচিকিৎসার এখনো কোনো সুব্যবস্থা হয়নি। সে রোগ, এই যৌবনকালে রক্তের তেজে এখন চাপা থাকলেও বয়ে একটু পড়ে এলেই প্রকট হবে। তাতে কানা কালা বোবা হয়ে যেতে পারো, পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে যায় কেউ কেউ, বংশানুক্রমে ছড়াতে পারে সেই ব্যারাম। ছেলেমেয়েরা কানা, বোবা, হাবা হয়ে জন্মাবে। ছেলেপিলে নাও জন্মাতে পারে তোমার-যদি তুমি এই ব্যারামে বাঁজা হয়ে যাও। সেটা এক পক্ষে মন্দের ভালো। এক পুরুষেই পরিত্রাণ! নইলে কী সর্বনাশ হয় ভেবে দ্যাখো একবার তোমার, তোমার স্ত্রী-পুত্রদের-তাদের সঙ্গে জড়িয়ে আরো আরো সব পরিজনের-পরিবারের সবাইকার। ক্রমে ক্রমে গোটা সমাজের…আর ধরো তোমাকেই যদি প্যারালিটিক হয়ে বিছানায় পড়ে যোবা মেরে সারা জীবন কাটাতে হয় তাহলেই তো চমৎকার।
উপদংশিত সংক্রামক যেসব দুষ্টব্যাধির খবর কার্তিক বসুর স্বাস্থ্যসমাচারের দৌলতে বহুকাল আগেই আমার পাওয়া, সেইসবই সে নতুন করে আওড়াতে থাকে আমার কাছে। তথ্যবহুল তত্ত্বগুলি সবিস্তারে,শুনিয়ে বোঝাই করে আবার আমায়–এই রাস্তাতেই তুমি দেখতে পাবে, বেশি বয়সী মেয়েদের। উপদংশক্ষত-জর্জর দূষিত দেহ নিয়ে ভিক্ষে করচে এখানে সেখানে–লক্ষ্য করলেই চোখে পড়বে। এই পথেরই শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে তার:-যে পথের গোড়ায় এখন পা দিয়ে রয়েছে এই মেয়েটি।
শুনেই আমি চমকে উঠি, আর আমার মনেও চমক দেয় তৎক্ষণাৎ! আমার মনে পড়ে হয় হঠাৎ
হ্যাঁ! হ্যাঁ! এবার আমার ঠাওর হয়েছে। চিনতে পেরেছি মেয়েটাকে। বুদ্ধদেবের মতন
মুখ ওর–লক্ষ্য করোনি?
গৌতম বুদ্ধ?
গৌতম কি গধাদর তুমিই জানো! সপ্রতিভ কি প্রগতিবান–তাও তোমার অজানা নয়…আমি ঠারেঠোরে কইতে যাই।
শুনি না কে, আহা! এত ভণিতা কিসের? কোথায় দেখেছ এমন মেয়ে আরেকটাকে…
এই কলকাতাতেই। এমন কি তোমার ঐ কল্লোল আপিসেও…
কল্লোল আপিসে। কল্লোল আপিসে মেয়ে?
আহা, মেয়ে কেন হবে গো! ছেলেই তো! আমি প্রাঞ্জল হই, ছেলে-ছেলে মুখ না মেয়েটার? দেখেই তাই চেনা চেনা ঠেকেছিল আমার।
ওরকমটা হয়ে থাকে। অনেক ছেলে মেয়েলি মুখ নিয়ে জন্মায়, অনেক মেয়ে দেখতে হয় যেন ছেলের মতই… বলে সে জৈব প্রকৃতির দৈবলীলার আরেক ফিরিস্তি বিস্তারিত করতে চায়।
থামো। বুঝেছি। কেন যে তুমি এখানে আসো টের পেয়েছি এবার। এই গলির মধ্যে এত মেয়ে থাকতে ওকেই বা কেন বেছে নিয়েছ তাও বুঝতে আমার বাকী নেই আর।
কেন, মেয়েটা কি সুন্দর না? তুমি তো ওকে আদর করতে চেয়েছিলে হে!
সুন্দর না ছাই! আদর করতে চেয়েছিলাম বলে নিজের উপর আমার রাগ হচ্ছে এমন। ওই তোমার সুন্দর? সুন্দর না ঢেঁকি!
বিনা উপরোধেই তো তুমি ঢেঁকি গিলতে যাচ্ছিলে হে।
তাই বলি। তা, তুমি এখানে না এসে সেই বালিগঞ্জে গেলেই পারতে! সোজাসুজি বুদ্ধদেবের ফ্ল্যাটেই। ওর রসিকতায় আমার রাগ আরও জ্বলে ওঠে : এখানে যা খেলে সেখানে গেলেও তা মিলত। ঐ চা আর বিস্কুট।
চা বিস্কুট?
তাছাড়া কী? তাছাড়া সেখানে তোমার একটি পয়সা লাগত না আবার। এই সঙ্গসুখ, এমন সুন্দর মুখ, সেখানেও পেতে তো। সেখানে গিয়ে ঐ আহামরি রূপসুধা পান করার অসুবিধাটা কী ছিল শুনি?…এখানেও তো তুমি কিছু করলে না, সেখানেও করবার কিছু ছিল না।
— কী আজেবাজে বকচো সব! মাথা খারাপ হয়েছে নাকি তোমার?
এই যদি তোমার মনের ইচ্ছা…তা এত ঘুরিয়ে বলার কী দরকার ছিল আমাকে? এখানে এই মেয়েটার কাছে আমায় নিয়ে এসে এমন ঘুরিয়ে নাক দেখানোর কী প্রয়োজন ছিল? সোজাসুজি বললেই পারতে যে বুদ্ধদেবের ওপরেই তোমার বেশ টান। যাও, আর–আমি…এ জীবনে আমি আর তোমার সঙ্গে মিশবো না।
বলে ওর নামলাঞ্ছিত সেই রাস্তার মোইে ওকে ত্যাগ করে মার মানা না মেনে পাণ তুচ্ছ করে সামনের চলতি ট্রামে লাফিয়ে উঠেছি। উলটো দিকে রওনা দিয়েছি সটান?
.
২৯.
ইস্কুলের ছুটির পর বিষ্টু সুকুলের সঙ্গে গল্প করতে করতে ফিরছিলাম, ডাকঘরের শিয়নের সাথে দেখা হয়ে গেল মাঝরাস্তায়। মহানন্দার পুলের ঠিক ওপরটাতেই।
