সুহৃদ্বরকে সম্বোধন করলান : এ যে একবারে প্রমীলারাজ্যেই এনে ফেললে হে!
বাড়িতে বাড়িতে বারান্দায় বারান্দায় সারি সারি মেয়েরা। এরা কি সব বারাঙ্গনাই? ঘরদোর আনাচকানাচ উপচে রাস্তায় এসে পড়ছে পরীর দল। দারুণ পরিস্থিতি!
রাজপথ না বলে রানীপথ বলাটাই বুঝি সঠিক। এবং যারপর নাই পরাস্ত হবার পানিপথ বুঝি সবার জন্যেই।
অলিন্দে অলিন্দে ফুটন্ত ফুল। গলিতে গলিতে উৎফুল্ল অলি। অলিগলি যদি বলি তো একেই বলা যায় বোধ করি।
ওরই ভেতরে একটি মৌচাকে সুহৃদ্বর আমায় নিয়ে সেঁধুলেন।
খুপরিতে খুপরিতে মক্ষিরাণী। তারই একটা কামরায় বসলাম গিয়ে আমরা।
আঠারো-উনিশ বয়সী বোধহয় মেয়েটি। কচি কচি মুখ। দেখলে মায়া করে।
আমাকে বন্ধু বলে সুহৃদ তার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিল। সমভাবেই সে খাতির করছিল দুজনকে। ভারী ভদ্র মেয়েটি। বন্ধুর অনুরোধে খানকয়েক গানও গাইল সে। সুরেলা মিষ্টি গলা।
চা বিস্কুট এল–তিনজনেই খেলাম। বেশ খানিক গল্পগুজবের পর আমরা চলে এলাম সেখান থেকে। আসার আগে সুহৃদ মেয়েটির হাতে কিছু টাকা দিয়েছিল মনে আছে।
চেনা চেনা বলে যেন মনে হোলো মেয়েটাকে। বললাম বাইরে এসে।
তোমাদের দেশের নাকি? শুধোলো সেঃ দেশ পাড়াগাঁ থেকে বেশ কিছু মেয়ে আসে। তাদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে বার করে নিয়ে আসে এখানে। আর একবার এ পথে বা বাড়ালে ফেরার পথ বন্ধ হয়ে যায় একেবারে। চিরদিনের মতই বলতে গেলে।
না, দেশের নয়। দেশের কেউ বেরিয়ে এসেছে বলে আমি জানিনে। দেশের কোনো খবর রাখিনে আমি। কোনো সম্পর্ক নেই সেখানের সঙ্গে আর আমার। আমি কই : এমনিই চেনা চেনা মনে হচ্ছিল কেন যে! কোথায় যেন দেখেছি একে?
ও–তাই! সমঝদারের মত সে হাসল-তাই বলো। বুঝলাম এবার।
কী বুঝলে?
পরীর মত মেয়ে দেখলে এরকমটা মনে হয় বটে। মনে হয় যেন কতকালের পরিচিত। স্বভাবতই এমনটা হয়। না হয়ে পারে না। সবারই হয়ে থাকে। সে হাসে আবার।
মিষ্টি মিষ্টি মুখ দেখলেই চিনি চিনি লাগে–চোখে দেখেই, চেখে না দেখলেও? এই তুমি বলছো তো? মানে কবির ভাষায়, যাকে বলে, দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে?
ঠিক তাই। এখানকার চেনাজানা না হলেও হয়ত বা পূর্বজন্মের পরিচয় বলে ঠাওর হতে থাকে। আশ্চর্য কিছু নয়।
মোটেই তা নয়। এ জন্মেই দেখেছি-ইহলোকেই। আমি জোর দিয়ে জানাই এই কলকাতাতেই দেখেছি কোথাও। এখন ঠিক মনে করতে পারছি না।
বাদ দাও। এখন বলল, মেয়েটি কেমন? কী রকম লাগল তোমার? তাই কও।
চমৎকার! কেমন টানাটানা চোখ-কী মিষ্টি হাসি!…এমন মেয়ে আর হয় না। বলে তখনই তার প্রুফ সংশোধন করিঃ অবশ্যি, সব মেয়ের সম্বন্ধেই তা বলা যায়। সবার লোই একথা খাটে। মেয়ে মাত্রই তো সুন্দর হয়ে থাকে।
তোমার ভালো লাগলো ওকে? ভালো লাগবার মতই মেয়ে! লেখাপড়া জানে, কালচার মেয়ে। কে জানে, কারো প্রেমে পড়ে তার সঙ্গে ঘর ছেড়ে বেরিয়েছিল, তারপর কিছুদিন ফুর্তির পর ছেলেটা ওর গয়নাগাটি সব নিয়ে ওকে পথে বসিয়ে উধাও হয়েছে। এমনিই তো হয়ে থাকে আকচার।
আহা! মুখখানা দেখলে ভারী মমতা হয়। সত্যি।
আরেকদিন আসা যাবে তাহলে। আসবে? সে শুধায়। নাকি, তুমিই একাই আসতে চাও এখানে? তাও আসতে পারো। বাড়িটা তো চিনেই গেলে। ওর নাম হচ্ছে মায়া। বললেই ওর ঘর দেখিয়ে দেবে সবাই।
না।
না, কেন? কেউ কিছু বলবে না তোমাকে। কোনো ভয় নেইকো।
না, ভয়ের কথা নয়। আবার এলে হয়ত আরো আমার মায়া পড়বে। আবার আবার আসতে ইচ্ছে করবে। অত টাকা আমি পাব কোথায়? টাকা কই আমার?
সেজন্যে ভেব না। যা দেবে তাতেই ও খুশি হবে। ভারী ভালো মেয়ে। তবে একটা কথা মনে রেখো, এদের সব বাঁধা বাবু থাকে, এরও আছে নিশ্চয়। সে যে সময়টায় আসে, এখানে থাকে, তখন যেন তুমি এসো না। তবে তার আবার দিনক্ষণ ঠিক করা আছে। সেটা কৌশলে জেনে নিতে হবে।
না, ভাই! আমার সাহস হয় না। আমি দারুণ মায়াবদ্ধ জীব। ওর মায়ায় জড়িয়ে পড়ব তাহলেই আর রক্ষে নেই আমার। এ পথে এলে আর ফেরা যায় না জানি।
কী করে জানলে? তুমি তো এ পথে আসোনি কখনো এর আগে?
আহা, বই পড়ে জেনেছি। বই পড়ে জানা যায় না? এ পথে এলে কি রেসের মাঠে গেলে কত লোক সর্বস্বান্ত-কত পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়-কে না জানে। আমি জানাই : বটতলার কত নভেলেই এদের কাহিনী লেখা হয়েছে। জানিনে?
আবার চন্দ্রমুখীরও তো দেখা মিলে যায় কোথাও কোথাও? বটতলার থেকে সে শরৎচন্দ্রের দিকে মুখ ফেরায় : দেবদাস পড়োনি তুমি? সে তো একালেরই কাহিনী।
একালের পাঁক-এও তো পড়েছি গো আবার! কিন্তু পাঁকে পা নামাতে আমার ভরসা হয় না। ডুবে যাই যদি?…..তাছাড়া মায়ার কথা কি কিছু বলা যায়? আমি ভারী মায়ালু। জীব-যদি জড়িয়ে পড়ি ঐ মায়ায়? মেয়েটার নামও নাকি মায়া আবার, বলছো তুমি!
জীবনকে জানার জন্য লেখকদের সব জায়গাতেই যেতে হয়, জানতে হয় সবাইকে-সব কিছুই দেখতে হয়। জীবন না দেখা হলে তা লেখা হবে কি করে? এখানেই জীবন, জীবন তো এই-ই। তাছাড়া তুমি যে উপন্যাসের নায়কদের কথা বলছে-বটতলার উল্লেখ করে সে কয় : সে কথা সব ক্ষেত্রে খাটে না।…লেখক শিল্পীদের স্বাভাবিক নিঃসঙ্গতাবোধ থাকেই। সেই সঙ্গে একটা আত্মচেতনা, সেটাই তাঁদের বাঁচায়। পাঁকাল মাছ যেমন পাঁকে কখনো জড়ায় না, পিছলে বেরিয়ে যেতে পারে…তুমি কেমন জড়িয়ে পড়তে যাবে?
