কিন্তু তারপর আর ছাড়েই না গাড়িটা!
-এই, রোকা কাহে?
–আপ খাড়া করনে বোলা না?
–তুমকো নেহি, ঘোড়াকো।
এক ঘোড়ার এক্কা–একটা ফিটন গাড়ীও পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল সেই সময়!
আমাদের চারজনকে নিয়ে চললো ট্যাসি চিত্তরঞ্জন সরণি ধরে সেই চিত্তরঞ্জনী সদনে।
বীডন স্ট্রীট পেরিয়ে মিনার্ভা থিয়েটারের পাশ কাটিয়ে কোথায় যেন জায়গাটা, মনে পড়ে না ঠিক এখন।
মেয়েটি খুব খাতির করেই অভ্যর্থনা করেছিল হেমেনদাকে, মনে আছে।
সেখানে গিয়ে নৃপেন একটা তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে গড়িয়ে পড়ল আরামে।
সৌম্য চেহারায় নৃপেন আর আলুথালু চুলের বাবরি আর কবি কবি ভাব নিয়ে সহজেই সবার চোখ টানতে পারত।
তার উদাস উদাস চাউনি দিয়ে মেয়েটির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে তাকে বেশ সচেষ্ট দেখা গেল সেখানে।
প্রেমালু চোখে সে তাকিয়ে রইল তার দিকে। তাকাচ্ছিলাম আমিও…চোখ টানবার মতই মেয়েটা! কিন্তু আমাদের কারো তাকের ওপর দৃষ্টি ছিল না তার। তার যতো খাতির-যত্ন দেখলাম আমাদের হেমেনদাকেই!
আর, তার নজর ছিল ঐ নজরুলের ওপর।
আশ্চর্য কিছু না। তার চমৎকার চেহারা, যেমন পৌরুষব্যঞ্জক তেমনি মোহময়, ভরাট মিষ্টি গলা, প্রাণখোলা হাসি, আয়ত চোখের চাহনি আর কথায় কথায় রসিকতা ছেলেদেরই মজিয়ে দিত, মেয়েদের নজরানা যে সহজেই টানবে সে আর এমন বেশি কি।
মেয়েটি গানও গায়ে বেশ। হেমেনদার অনুরোধে সে কয়েকখানা গাইল। কাজীও গাইল তার নিজের গান, প্রাণমাতানো গজল সুরের কয়েকটা।
-কাজীদা, আপনার গান শেখাবেন আমায়? মেয়েটি অনুরোধ করেছিল কাজীকে।
কাজী সঙ্গে সঙ্গে রাজী। যেমন প্রাণচঞ্চল, তেমনি গান-পাগলা-এ বিষয়ে একবারের বেশি দু বার বলতে হয় না তাকে।
কল্লোলের আসরে যেমন তাকে গজল গানে মেতে থাকতে দেখেছি, তেমনি নিজের গানের টানে বাড়িঘর বিশ্বসংসার সব ভুলে কোথায় না ভেসে গেছে সে!
এই কলকাতায়, এই হুগলিতে, এই ঢাকায়-বাড়ির বা বন্ধুদের কাউকে কোনো খবর না– দিয়েই–এমনি আত্মভোলা জগৎভোলানো মানুষ ছিল নজরুল।
খানিকক্ষণ গানবাজনার পর আমরা উঠে পড়লাম সবাই, কাজী কিন্তু নড়ল না সেখান থেকে।
গান শিখতে চেয়েছে যে। শিখিয়ে যাবো। বলে বসে থাকল।
চুলের ঝুঁটি ধরে টেনে আনতে পারতাম। হেমেনদা বললেন বাইরে এসে–কিন্তু ভেবে দেখলাম, সেটা ঠিক হবে না। মুসলমান বাচ্চা, যখন চেয়েছে, তখন উচিত মতন শিক্ষা না দিয়ে উঠবে না।
আপনার কি মনে হয় যে কাজী…? তাঁর ইঙ্গিতটা অনুক্তই রাখেন ভদ্রলোক।
না না না, আদৌ না। জনাবের কথার জবাবে আমি কই–সে ধরনের কিছু মনেই হয় না আমার। কি রকম সঙ্গীতমত্ত মানুষ ছিল সে জানেন তো! কাজীর ব্যক্তিত্ব শতধা বিকীর্ণ, সহস্ররূপে বিচ্ছুরিত, অজস্র ধারায় উচ্ছল। যেমন তার শিল্পীসত্তা, বিপ্লবীসত্তা, সাধকসত্তা, তেমনি তার প্রেমিক-সত্তা, আর সব ছাপিয়ে ছিল তার পুরুষসত্তা। সবগুলোই সমান সত্য। তার কোনো ব্যাক্তিরূপকে বাদ দিয়েই কাজী নয়, সব মিলিয়ে মিশিয়েই নজরুল। আমার তো মনে হয়, বাংলার মাটিতে শ্রীচৈতন্যদেবের পর সুভাষচন্দ্র আর নজরুল এক আবির্ভাব। মানুষের গড্ডলিকা প্রবাহে এক ফেনোমেনা। এঁরা সারা বাংলাকে মাতিয়ে গিয়েছেন। তা ছাড়া …
তা ছাড়া?
তা ছাড়া-আমি আরো ছাড়াই : তেজস্বীদের দোষ হয় না কিছুতেই। তেজীয়সাং ন দোষায়–মহাভারতের কথা। আগুনকে কোনো মালিন্য স্পর্শ করতে পারে না। বহতা নদী সব কিছুই ধুয়েমুছে নিয়ে যায়। আর কাজী তো কেবল প্রবাহিনী নয়, প্রবল বন্যাই।
আমার কথাগুলো হজম করবার পর হাঁফ ছাড়লেন তিনি আপনাদের দৌড় অ্যাঙ্গুর? এই আপনাদের গতিবিধি?
তাঁর কণ্ঠস্বরে মনে হল তিনি রীতিমতন হতাশ।
অবশ্যি, আরেকটা গতিবিধির বৃত্তান্তও দিতে পারি আপনাকে–একান্তই জানতে চান যদি। সেটা প্রায় একরকম রগ ঘেঁষে যাওয়াই।
রগ ঘেঁষে যাওয়া? তিনি কন : শুনি তো রগড়টা।
আমার আওতায় এসে আপনিও প্রায় আমার ভাষার ভাওতা পেয়ে বসেছেন দেখছি! ওঁর রগড়ের কথায় না হেসে পারি না–আমার এক বন্ধুর সঙ্গে গেছলাম সেখানে। সে আমায় বললো-বেড়াতে যাবে এক জায়গায়? মেয়েটেয়ে আছে, গানটান হবে। জমবে খুব। যাবে?
অজানার পথে এগিয়ে যেতে সর্বদাই আমি এক পা বাড়ানো। বললাম, কেন যাব না?
বন্ধুটি কে? কল্লোলের কেউ?
জেনে কী হবে? আমি নিজের মুভপাত করতে পারি, কিন্তু অপরের মাথায় হস্তক্ষেপ করার অধিকার কি আছে আমার? নাম নাই বললাম, তাতে কাহিনীর কোনো হানি হবে না। কলেজ স্ট্রীটি দিয়ে যেতে মেডিকেল কলেজ ছাড়িয়ে শিব মন্দিরের পাশ দিয়ে গিয়ে সেই গলিটা। গলির মোড় থেকেই মেয়েদের উঁকিঝুঁকি-কিশোরী যুবতী, নানাবয়সী নারীদের আনাগোনা।
ও বাবা! এ যে দেখছি এক স্বনামধন্য রাস্তায় এনে ফেলেছো তুমি আমায়। রাস্তাটার নাম-ফলক দেখে বললাম। আনাড়ি হলেও জায়গাটার মহিমা আমার অজানা ছিল না।
রাস্তাটার নাম জানতে পারি কি? তিনি শুধান।
তা জানতে বাধা কি আর! জনাব সাহেবকে জানাই-প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রীট।
.
২৮.
এই প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রীট! সেই ডাকসাইটে (নাকি ডাকিনীসাইটে) জায়গা? মহানগরীর নাগর সংস্কৃতির পীঠস্থান? প্রেমের কতটা ছয়লাপ হয় এখানে জানিনে, কিন্তু চাঁদের ছড়াছড়ি দেখি চারধারেই।
