কোন্ দুঃখে আসতে যাবে তারা? আমি প্ৰকাশ করি–ষোড়শীরা সব শরৎচন্দ্রের এলাকায়। তখনকার ষোড়শীরা অন্তত। সবাই তাঁরা পরিণীতা দেবদাসের মুল্লুকেই তখন। আমার পাঠক পাঠিকারা সব একাদশ থেকে চতুর্দশের মধ্যে। যতই চতুর দশায় থাকি মশাই, আমার বরাতে চিরকাল সেই একাদশী। এবং আমার ভাগ্যে তারা প্রথম এলেও জীবনের প্রথম ভাগের পাঠ নিয়েই না একটু বড় হলেই তারা বড় বড় লিখিয়েদের আওতায় চলে যায়। যেমন এখনও, তেমনি তখনও।
যথা? যেমন?তিনি দৃষ্টান্ত দর্শনে উদগ্রীব।
কেউ তাদের প্রে-মেনে গিয়ে পড়ত, কেউ বা প্ৰবোধ লাভ করত। আমি কই কেউ আবার অচিন্তনীয় কোনো কিছুর সন্ধানেই থাকত হয়ত। কেউ বা ফের বুদ্ধবিহারে গিয়ে রজনীদের উতলা করে তুলত কখন!
এমন কি এখনো হতে পারে নাকি! তিনি বিশ্বাস করতে চান না।–পথ ভুলেও কেউ কেউ কোথাও এসে ফের মরে নাকি? এমন কথাও কি বলে যাননি কবি?
আমার ভাগ্যই সেটা বলতে হবে। সত্যি বলতে, আমার বোনের বাইরে কোনো ষোড়শী সপ্তদশীর মুলাকাত আমি পাইনি। পেলেও সেভাবে পাইনি। বোন হয়ে বন্ধু হয়েই এসেছে তারা আমার জীবনে। অন্যরূপে বন্যরূপে দেখা দেয়নি কখনো। সেজন্য ভাগ্যকে আমার ধন্যবাদ। কেননা, ষোড়শীরা চিরকালই কিছু ষোড়শী থাকেন না, অনিবার্যভাবেই সাঁড়াশী হয়ে দেখা দেন একদিন। নাক নিয়ে টানাটানিতে নাকাল হতে হয় তখন। নারীর হ্লাদিনী রূপটিই ভালো, চিত্তচমৎকারী। আহ্লাদিনীরূপে এলে, তাঁকে নিয়ে বেশি আহ্লাদ করতে গেলে, তিনি জহুদিনী হয়ে ওঠেন শেষটায়।
নারী কি তাঁর হ্লাদিনীরূপে থাকতে পারেন না চিরকাল?
সে রূপ তাঁর সেই কিশোরী বয়সেই। এই কারণেই তো বৈষ্ণব কবির ঐ কথা কিশোরী-ভজন, কিশোরী-পূজনা, কিশোরী গলার মালা! গোপবালারা একটু বয়সে গড়াতেই কেষ্টঠাকুর তাঁর সাধের বৃন্দাবন ছেড়ে পালালেন কেন তাহলে?
আজব কথা কইলেন আপনি!
এসব কথা থাক। যে কথা হচ্ছিল আমাদের…হেমেনদার কথা। এমনি আশ্চর্য লোক ছিলেন আমাদের হেমেনদা। ঘনিষ্ঠতা ঘার পর আমাকেও কতদিন তার পানভোজনের সাথী হতে হয়েছে। একদিন দেখি কি, তিনি কাজী, প্রেমেন, নৃপেনকে সঙ্গে নিয়ে ট্যাক্সি করে আমার আস্তানায় এসে হাজির। শুনলাম নানান জায়গা থেকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে এনেছেন তাদের–আমাকেও সহযাত্রী হতে হবে। সবাইকে ধরে বেঁধে নিয়ে চললেন তিনি চাংওয়ায়।
এক নম্বরের বোহেমিয়ান ছিলেন আমাদের হেমেনদা। বইটই লিখে যা তিনি উপায় করতেন, এমনি করে খেয়ে খাইয়ে উড়িয়ে দিতেন সবটাই। পাথুরেঘাটায় পৈতৃক বাড়িতে তাঁর সঙ্গে প্রথমালাপের পর ইদানীং তিনি বাগবাজার ঘাটের কাছে গঙ্গার কিনারের ওপর ভাস্কর্য এবং শিল্পকলার বিরল সগ্রহে সজ্জিত মিনারের মতন যে বাড়ি বানিয়েছিলেন, সেখানেও গেছি আমি বহুবার।, তার চারতলার ঢাকা বারান্দার কোণে এক টুকরো জায়গায় ছোট্ট একটা টেবিলের ধারে বসে তিনি লিখতেন-অভ্যাগতরাও বসত গিয়ে সেখানে। বাড়িটিই তাঁর ছবির মত ছিল কেবল, সেখান থেকে বিবেকানন্দ সেতু পর্যন্ত বিস্তৃত উদার গঙ্গার দৃশ্যও দেখা যেত যেন ছবির মতই।
চাংওয়ায় গিয়ে আমাদের নিয়ে মশগুল হয়ে উঠলেন তিনি। পানাহারে সবাইকে পরিতৃপ্ত করে এমন আনন্দ পেতেন হেমেনদা! তার ওপরে সেদিন কাজী সঙ্গী আবার! কাজী যেখানে আনন্দ সেখানে–জীবন যেন তরল পানীয়ের মতই শত ধারায় উচ্ছল-উচ্ছ্বসিত।
ফুর্তির চোটে সেদিন ভারী মজার এক কাত করেছিলেন হেমেনদা।
স্নেহের আবেগে প্রেমেনকে জাপটে ধরে, পাশেই বসেছিল সে, খপ করে এক চুমু খেয়ে বসলেন হঠাৎ।
চাবুকের মতই সপাৎ করে পড়ল সেটা প্রেমেনের গালে।
চাংওয়ার চিকেন কাটলেটও যেন বেগুনি হয়ে উঠলো ওর মুখে।
ব্যাপারটা কিছুই না এমন, বাল্মিকীর সম্মুখীন ব্যাধের সেই ক্রৌঞ্চ নিধনের মতই প্রায়, কিন্তু এমন ঝটিকার বেগে সংঘটিত হল যে, সেই মা-নিষাদের মত দু পঙক্তির পজঝটিকা ছন্দে গজিয়ে উঠল আমার মনে।
গল্প না/বৎস, না/কল্পনা/চিত্র।
হেমেন্দ্র/চুম্বিত/প্রেমেন্দ্র মিত্র।
ভাব, ছন্দ আর যতিঃপতনে নিখুঁত নিটোল এমন দুটি লাইন আর কখনো আমার জীবনে আমদানি হয়নি। প্রেরনায় কী না হয়, বোঝা যায় এইতেই!
পরে যখন প্রেমেনের কাছে পয়ারটাকে পড়েছিলাম, মোটেই সে ভালো মনে নেয়নি। এমন ক্ষেপে গেছল আমার ওপরে যে… তার প্রতি আমার এটা অযথা এবং অতিশয় মন্দ আক্রমণ বলেই সে মনে করেছিল তখন।
কিন্তু আমি কী করতে পারি? ছড়াটা না পালটে আমি ছন্দটাকেই পালটে দিলাম তার পর। বললাম, এটা তাহলে পজঝটিকা হবে না ভাই, মন্দাক্রান্তাই বোধ হচ্ছে। যাই হোক, এটা ওই মা-নিষাদের সমগোত্রই–যতই বিষাদের (নাকি, বিস্বাদের?) হোক না।
(অবশ্যি, মন্দাক্রান্তা বা পজঝটিকা যে কী ছন্দ, কেমন চীজ তা আজও আমার জানা নেই সঠিক!)
আহারাদি সাঙ্গ হবার পর হেমেনদা পাড়লেন, চলো এখন এক জায়গায় গিয়ে গানটান শোনা যাক একটু।
প্রেমেন আমাদের সঙ্গ নিল না। কাটল সেখান থেকেই।
হেমেনদা, নজরুল, নৃপেন আর আমি চারজন চললাম ট্যাক্সি নিয়ে।
হ্যারিসন রোডের কাছাকাছি আসইে প্রায় একটা অ্যাকসিডেন্ট বাধে আর কি! কাজীও চেঁচিয়ে উঠেছে-রোকো রোকো! ট্যাসিটাও দাঁড়িয়ে পড়েছে তক্ষুনি। ড্রাইভারটা ছিল বেশ হুঁশিয়ার।
