এমনি অসাধারণ সহৃদয় সাহিত্যিক ছিলেন হেমেন্দ্রকুমার।
অবশ্যি আমার তখনকার সেই মর্মদাহ বেশিদিন থাকেনি। সে বয়সে সবাই স্বভাবতই সব কিছু ক্ষমা করতে পারে, সহজেই ভুলে যায় সব।
তার পরে যখন আমার প্রবন্ধের বই বেরিয়েছে, মস্কো বনাম পন্ডিচেরি আর ফানুস ফাটাই, তার কোনটাতেই ঐ অচল টাকা বা ঐ জাতীয় লেখাগুলি আমি বার করিনি, ইচ্ছে করেই বাদ দিয়েছি। এবং আমার জীবনের ঐ পর্ব নিয়ে সমস্ত আলোচনা আর বাদ-বিসংবাদ সযত্নে এড়িয়ে গেছি।
(তবে এর পরে যদি কখনো আমার এতাবৎ যাবতীয় গদ্য রচনা নিয়ে কোনো প্রবন্ধসমগ্র বেরয় তাহলে ঐ লেখাগুলি এবং ঐ কালের আরো কিছু কিছু রচনা সে বইয়ের অন্তর্গত করার বাসনা আমার আছে। বিদ্যাসাগর-জীবনীকার ইন্দ্ৰমিত্ৰমশাই অনুগ্রহ করে তৎকালীন পত্র-পত্রিকা ঘেঁটে সেগুলি আমায় সংগ্রহ করে দেবেন বলেছেন।)।
বলতে গেলে, আমার ভাগ্যে পর্বতের সেই মূষিক প্রসবে আমার কোনো দুঃখ নেই এখন আর। এবং দুঃখিত নই অনেকদিন থেকেই। আমার জীবনের সেই বিষাদ পর্বকে জীবনের স্বাদ-বয়ে-আনা একটা পার্বণ বলেই মেনে নিয়েছিলাম আমি। তখন তখনই। মনে হয়েছিল আমার যে, ইহাই নিয়ম। পৃথিবীর চেহারাই এই। দুনিয়ার হালচাল এই ধারার। এ নিয়ে দুঃখ করে কোনো লাভ নেই। আর সেই দুঃখ মনের মধ্যে পুষে রাখার মতন অপুষ্টিকর কিছু আর হয় না।
ষোড়শীর সূত্রে টাকা আর স্বীকৃতি পেলে তার সাফল্যে আমি নাট্যজগতের বিপথেই চলে যেতাম হয়ত-রঙ্গমঞ্চের চোরাগলিতেই ঘুরে মরতাম এতদিন। সেই পোষ মা আমার সর্বনাশ ডেকে আনত। তার বদলে যে ধারাবাহিক উপোস মাসগুলি আমায় কাটাতে হয়েছিল, হয়ত তার হেতুই আমার জীবনের সত্যিকার পথ আমি খুঁজে পেয়েছি। তার জন্যই আমি ধন্য। আমি কৃতার্থ।
সেই জন্যেই শিশিরকুমার এবং শরৎচন্দ্রের প্রতি কৃতজ্ঞ আমি আজ। তাঁদের শাপ আমার বরাতে বর হয়ে এসেছে।
নাট্য রচনা অবশ্যই কোনো সাহিত্যিক বিপথ নয়–কিন্তু আমার পক্ষে তা ঠিক স্বধর্ম হত না, পরধর্মের মত বোধ হয়, ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াত শেষটায়। তা না হয়ে ঐ বিতর্কের সুযোগে হেমেন্দ্রকুমারের সান্নিধ্যে এসে সুধীরকুমার সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ঘটে মৌচাকের সৌজন্যে কিশোর সাহিত্য রচনার যে রাজপথ দেখা দিল সেই পথেই যেন আমি আমার আমাকে সম্পূর্ণ করে পেলাম, সম্পূর্ণভাবে দিতে পারলাম সবাইকে।
প্রবীণ মানুষদের প্রাজ্ঞ মুখোশের রাজ্য থেকে নির্বাসন লাভ করে তরতাজা কিশোর কিশোরীদের একান্ত আপনার হয়ে তাদের অনন্ত মাধুরী অফুরন্ত মধুর সাম্রাজ্যে আসবার সুযোগ পেলাম আমি।
নাকের বদলে নরুণ নিয়ে নাকাল না হয়ে আমার সম্মুখে এল যত কচি কচি হাসি হাসি মুখ।
বিতর্কিত ষোড়শী নিয়ে কোনো দুঃখই থাকে না আর মনে, নতুন নতুন ষোড়শীরা এসে দেখা দেয় জীবনে। দূরকে করিলে নিকট বন্ধু পরকে করিলে ভাই কবির সেই স্বপ্নটাই সত্য হয়ে ওঠে, সব ঠাঁই নিজের ঘর খুঁজে পাই বুঝি। নিত্যকালের কিশোর-কিশোরীদের চিত্তলোকেই।
.
২৭.
নিত্যকালের চিত্তলোকে। তিনি প্রতিধ্বনিত হন : কথাটা বলেছেন বেশ।
বেশ বলা নয়, বেশি বলা। বাড়িয়ে বলা। আমি বলি : ভালো শোনায়–বলা তাই। মিথ্যে কথামাত্রই তো মিষ্টি শোনায়। শোনায় না? যেমন আপনার ভালোবাসার কথা যত! উদাহরণ স্বরূপ দিয়ে আমার কথাটা যথাযথ করি।
মিথ্যে কথা?
মিথ্যে নয়তো কী? মিথ্যে বলতে আপত্তি থাকে, বলুন অতিরঞ্জিত। আসলে সত্যি নয়। আসল সত্য হচ্ছে নিত্যকালের চিত্তলোকে কারোই কখনো ঠাই হয় না। চিরকালের স্বামীত্ব নেই কারোরই, সবাই ক্ষণকালের আসামী। বর্তমানের বাইরে বলতে গেলে, কারোই কোনো অস্তিত্ব নেই।
অস্তিত্বই নেই? কারোই না?
কোথায় আর! কবিগুরুকেও দুঃখ করতে হয়েছে জানেন না? ঠাই নাই ঠাই নাই ছোট সে তরী/শূন্য নদীর তীরে রহিনু পড়ি। মহাকাল কাউকে তাঁর সাথী করেন না। বর্তমানের চাকায় ঘুরপাক খাচ্ছি আমরা সবাই।
কী বলছেন!
খাঁটি কথা বলে গেছেন ঐ ওমর খৈয়াম। নগদ যা পাও, হাত পেতে নাও, বাকীর খাতায় শূন্য থাক। এর চেয়ে সত্য কথা আর হয় না।
নিত্যকালের চিত্তলোকে কারোই ঠাঁই হয় না? আপনি বলেন কী মশাই?
কই আর হয়! মহাকালই তো কান্ডারী? তিনি যদি ঠাই না দেন, কী করে হবে? ভগবান চিরকালই হাল ধরে থাকেন–মা বলতেন কথাটা। কথার মধ্যে আবার আরেকটা করে মানে থাকে, বলতেন মা। সেই মানেটা সমঝে নিতে হয়। হাল মানে আবার বর্তমান। ভগবান হাল ধরে আছেন সবার, সব কিছুর, অর্থাৎ সর্বদাই তিনি সবার বর্তমানে আবর্তন কমছেন–নিরন্তর পরিবর্তন আর সমাবর্তনে। তিনিই হচ্ছেন, হওয়াচ্ছেন। এই তাঁর হালচাল। তাঁর অতীত নেই, ভবিষ্যৎও নেই। আমাদেরও তাই।
হুম্। তাঁর হুঙ্কার শোনা যায়।
পুনশ্চ অনুযোগ করতে হয় আমায় : এইভাবেই আমরা সবাই বর্তাচ্ছি–অফুরও বর্তমানে। তিনিও বর্তে গেছেন, আমরাও বেঁচে বর্তে রয়েছি–অনন্ত কাল ধরে-পরস্পরের দৌলতে।
ভগবানের ওপর ভবিষ্যতেরও কোনো ভরসা রাখব না? সে কী কথা?
এইমাত্র ভরসা রাখতে পারি যে, ভবিষ্যতেও তিনি বর্তমান থাকবেন। যেমন থাকব আমরাও। নিরবধি বর্তমানে তিনি আবর্তিত। নিয়তই তিনি হচ্ছেন, আমরাও হচ্ছি–এই আমাদের নিয়তি।
তত্ত্বকথা থাক, তথ্যকথায় আসুন। তিনি আসলে আসেন-তাহলেও ষোড়শীরা সব এসেছিল তো আপনার জীবনে? এখন সেটা অতীত কথা হলেও তখন সেটা নগদ লভ্যই হয়েছিল। সেটাও কিছু কম লাভ নয় মশাই! বলে তিনি একটুখানি দম নেন-লাভ কথাটারও আরেকটা মানে আছে আবার। ইংরেজি মানে যদিও।
