শুধু নিজের মেয়েকেই নয়, পরকেও উনি খাওয়াতে ভালোবাসেন খুব। এমনি করে আমাদেরও ধরে নিয়ে এসে খাইয়েছেন কতদিন এখানে। প্রেমেনই বলেছিল বুঝি।
তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হবার পর আমিও সেই অভিজ্ঞতার ভুক্তভোগী।
ঘনিষ্ঠতা ঘটেওছিল ভারি অদ্ভুত ভাবেই।
শিশিরকুমারের নাট্যমঞ্চে শরৎচন্দ্রের ষোড়শী নিয়েই এই অঘটন। শরৎবাবুর দেনাপাওনা উপন্যাসের নাট্যরূপ ঐ ষোড়শী।
অবশ্য ষোড়শী নিয়ে মারামারি এই প্রথম নয় এবং আজকেরও না–ট্রয় নগরী স্ট্রেয়ের মূলেও ছিল এই ষোড়শীই, এমনকি তারও আগে সুন্দ-উপসুন্দর আমল থেকেই চলে আসছে এই কাণ্ড।
তবে এবারকার লড়াইটা ছিল কাগজে কাগজেই।
আমার সেই তরুণ বয়সে ইবসেনের নাটক পড়ে বিষয়বস্তুতে তো বটেই, আরো বেশি করে তার রচনার টেকনিকে আমি অভিভূত হয়েছিলাম।
আমাদের দেশে সেকালে থিয়েটারের পালা পাঁচ অঙ্কে অসংখ্য গর্ভাঙ্কে বহু পাত্রপাত্রী এবং সুদীর্ঘ দেশকালে বিস্তৃত বেশ এক গন্ধমাদনী কাণ্ডই ছিল। সেখানে অল্প সময়কালে ঘনবিন্যস্ত ইবসেনের নাটকগুলি স্বভাবতই চমকিত করেছিল আমায়।
বাংলায় কি এমনটা করা যায় না?
আমার মাথায় তখনও মৌলিক নাট্য রচনার কোনো প্লট দানা বাঁধেনি। শরৎচন্দ্রের দেনাপাওনা সে সময় সবে ভারতবর্ষে বেরিয়েছে। আমার মনে হল ওই উপন্যাসটিকে নিয়ে এ ধরনের নাট্যরূপের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যায় বোধ করি।
শরৎচন্দ্রের প্রায় সব লেখাতেই বেশ নাটকীয়তা রয়েছে দেখা যায়। এককালে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের নাট্যরূপ বাংলা রঙ্গমঞ্চে চলেছিল খুব। কিন্তু তারপরে একালে শরৎচন্দ্রের উপন্যাস নিয়ে, সে-সবের অন্তর্গত অত নাটকত্ব সত্ত্বেও, কেন যে তেমনটা হয়নি আমি ভেবে পাইনি।
যাই হোক, ইবসনি কায়দায় সেই বিস্তৃত বইকে চার অঙ্কের-প্রত্যেক অঙ্ক একটিমাত্র দৃশ্যে সম্পূর্ণ নাট্যাকারে ঘনসম্বন্ধরূপে দাঁড় করানো গেল। সেই নাট্যরূপ নিয়ে আমি শিশিরবাবুর কাছে গেলাম, তিনি তখন ঘোষ লেনের বাড়িতে থাকতেন।
কিন্তু কেন জানি না ওটা তাঁর মনে ধরল না।
তখন আমি নাটকটি নিয়ে ভারতী সম্পাদিকা সরলাদেবীকে দিলাম। জগৎ ভট্টাচার্য তখন পত্রিকাটার কার্যনির্বাহক ছিলেন। সম্পাদনা কার্যও করতেন তিনি।
ভারতীর পূজাসংখ্যায়, সেইটাই তার নবপৰ্য্যায়ের শেষ সংখ্যা আবার, বেরিয়ে গেল রচনাটা।
বেরল কিন্তু শরৎবাবুর নামেই। নাট্যরূপান্তর সাধনের জন্য তার কোথাও আমার নামগন্ধ কিছুই ছিল না। সেটা যে ব্যবসায়িক কারণেই তা বোঝা তেমন কষ্টকর হয়নি। তাছাড়া, সেই জগতের নিয়ম–ব্যবসায়ী জগতের ধারাই তাই। এইরকমটাই ধারণা হয়েছিল আমার আমার বন্ধু জগৎ ভট্টাচার্যের ওপর কোনো কটাক্ষ করছিনে।
যাই হোক, ওই প্রকাশের ফলে সাড়া পড়ে গেল থিয়েটার পাড়ায়। স্টার থিয়েটারের প্রবোধ গুহ মশাই ওটা তাঁর পাদপিঠে মঞ্চস্থ করতে চাইলেন। এবং তারপরও টনক নড়ল শিশিরবাবুর।
প্রবোধবাবুর আগেভাগেই তিনি পানিত্রাসে গিয়ে শরৎবাবুর কাছ থেকে নাটকের অভিনয় স্বত্ব নিয়ে এলেন।
মহাসমারোহে অভিনীত হয়েছিল বইটা। দীর্ঘকাল ধরে অব্যাহত সাফল্যে চলেছিল সে পালাটা।
অবশ্যি ভারতীর ষোড়শী আর অভিনীত ষোড়শীতে কিছুটা পার্থক্য ছিলই। ভারতীতে প্রকাশিত নাট্যরূপের দ্বিতীয় ও তৃতীয় অঙ্ক অবিকল রেখে তার প্রথম এবং চতুর্থ অঙ্ক দুটি একাধিক দৃশ্যে ভাগ করে একটু পরিবর্তন সাধিত করা হয়েছিল। আমি যেকালে উপন্যাসের মতই নাটকটিকে বিয়োগান্ত রেখে খোদার ওপর কোনো খোদকারি করতে যাইনি, শিশিরবাবু সেখানে তাঁর রঙ্গলৌকিক প্রয়োগ নৈপুণ্যে কিংবা তৎকালের দর্শকদের মুখ চেয়েই হবে হয়তো বা, কিংবা ব্যবসায়িক সাফল্যের কথাটা ভেবেই বোধহয় মিলনান্তক মাধুর্য দিয়ে নাটকটা সমাপ্ত করেছিলেন।
যাই হোক, তার জন্য আমার কোনো মাথাব্যথা ছিল না, নাট্যরূপের জন্য আমার নাম না থাকলেও নয় তেমনটা কিন্তু উক্ত প্রয়াসে আমার অংশ হেতু, কৃতিত্ব গৌরবের কিছুটা না হোক, আংশিক অর্থ প্রাপ্তির কিঞ্চিৎ প্রত্যাশা স্বভাবতই ছিল আমার।
একজন সংগ্রামী নবীন লেখকের পক্ষে–যদিও এখনকার ব্যাপকতর ভূমিকায় মহত্তর অর্থের সংগ্রামী নয়–নিছক নিজের তুচ্ছ জীবনধারণের জন্যই যার জীবনসংগ্রাম–তার কাছে নাম বা টাকা কোনটাই নেহাত ফ্যালনা নয়।
কিন্তু এই ব্যাপারে নাম তো হলই না, আর টাকাও যা পেলাম তা নামমাত্রই-শত খানেকের বেশি নয় কোনমতেই।
সত্যিই এই ব্যাপারটা আমার কাছে ভারী মর্মান্তিক ঠেকেছিল তখন।
এবং স্বভাবতই শরৎচন্দ্র আর শিশিরকুমারের প্রতি আমার রাগ হয়েছিল দারুণ।
আর আমার সেই রাগের ঝাল সেকালের পত্র-পত্রিকার পৃষ্ঠায় ঝাড়তেও আমি কিছু কসুর করিনি। যথাসাধ্য সাহিত্যিক ভাষায় কষে গাল দিয়েছি তাঁদের।
আমার সেই ঝাল ঝাল লেখাগুলি-অচল টাকা ইত্যাদি–নবশক্তি, নাচঘর এবং আরো কী কী কাগজে যেন বেরিয়েছিল।
আর রঙ্গমঞ্চ সম্পর্কিত বিখ্যাত সাপ্তাহিক ঐ নাচঘরের সম্পাদক ছিলেন আমাদের হেমেন্দ্রকুমার রায়। শরৎচন্দ্র ও শিশিরকুমারের, বিশেষ করে শিশিরবাবুর অন্তরঙ্গ হলেও হেমেন্দ্রকুমার তাঁর বন্ধুদের আঘাত-করা আমার লেখাগুলি তাঁর পত্রিকায় স্থান দিতে কোন দ্বিধা করেননি, এমন কি, কোথাও কোথাও হয়ত আমার পক্ষ সমর্থন করে থাকবেন। তাঁর নাচঘরে আমার একটি নাটকও (চাকার নীচে) ধারাবাহিক বেরিয়েছিল তারপর (আমার প্রথম মৌলিক নাটক যখন তারা কথা বলবে বেরয় নবশক্তিতে।) তাঁর সপ্রশংস ভূমিকা নিয়েই।
