উৎকর্ণ ভদ্রলোক বৃথা বাক্যব্যয়ে অযথা বাধা না দিয়ে নিজের মৌন সম্মতিতে উন্মুখর হয়ে আমায় উৎসাহিত করেন।
হেমেনদার সঙ্গে আমার যোগাযোগ একেবারেই আকস্মিক,আমি আরম্ভ করি: অঘটনের মতই প্রায়। সেকালের নব সংস্কৃতির নানামুখী ভাগীরথী ধারার যাঁরা ভগীরথ-ধারক বাহক ছিলেন যাঁরা, তাঁদের অন্যতম বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব আমাদের এই হেমেন্দ্রকুমার রায়। অবশ্য ভাগীরথীর ন্যায় সংস্কৃতির ধারা সব সময়ই বহতা, সেকাল একাল বলে তার কিছু নেই–কখনো তার মোড় ফেরা, কখনো বা তার মুখ ফেরানো।
সে যুগের এক চমকদার লেখক ছিলেন হেমেন রায়। যেমন তাঁর গল্প, তেমনি তাঁর কবিতা, তেমনি আবার ব্যঙ্গ কবিতাও–সেই সঙ্গে কিশোর সাহিত্যও আবার। কিশোর সাহিত্যে তো তাঁর জোড়া মেলে না–তাঁর বন্ধু মণিলাল গাঙ্গুলীকে বাদ দিলে। যথার্থ বলতে দক্ষিণারঞ্জনের রূপকথার রাজ্যে কিশোর কাহিনীর আমদানি তাঁরই একান্ত কীর্তি। সে-পথে আমরা অনুগামী তাঁরই।
আর মানুষ হিসেবে তুলনাই হয় না তাঁর। লেখকদের মধ্যে এমন সহৃদয় আমি খুব কমই দেখেছি, অবশ্যি কটা লেখকই বা দেখেছি আমি আর?
ফুটবল ম্যাচ দেখে মাঠের ফেরতা কল্লোল-এর কয়েকজন আমরা প্রায়ই চাংওয়ায় খেতে যেতাম। চাঁদা করে খাওয়া হোত। প্রত্যেকের ভাগে এক টাকা। অবশ্যি, বিলের টাকা মেটাবার সময় সবার ভাগেরটা প্রেমেনই দিয়ে দিত বেশিরভাগ।
খাবারদাবার দারুণ সস্তা ছিল তখন চাংওয়ায়। এক টাকায় ঢাউস এক প্লেট কুঁচো চিংড়ি, মাংসের কুঁচি দেওয়া ফ্রায়েড রাইস দিত, যা তিনজনের পক্ষে যথেষ্ট। আর এক টাকায় গোটা ছয়েক প্রন কাটলেট মিলত, তার স্বাদের তুলনা হয় না। আর এক টাকায় যে কী নেওয়া হত তা এখন মনে পড়ে না। চপটপ কি কারিটারি কিছু হবে বোধহয়।
এছাড়া এক পেগ করে ছিল আবার আরো প্রত্যেকের। ওটা নাকি অবশ্য গ্রাহ।
প্রেমেন বলেছিল এক টাকায় এত এত খাবার দিয়ে ওদের কী লাভ থাকে ভাই! যা কিছু মুনাফা এই মদ বেচেই। এ না নিলে এখানে পাত্তাই মিলবে না একদম।
নিতেই হত বাধ্য হয়ে। তবে একথাও আমি বলতে বাধ্য,বস্তুটির মতন অখাদ্য আর হয় না। প্রথম চুমুকেই আমার গাল গলা এমন জ্বলে গেছল যে জীবনে আমি আর তার দ্বিতীয় চুমুকে যাইনি।
আমার বিবেচনায় নেশা যদি করতেই হয় তো রাবড়ির। চুমুকে চুমুকে খাওয়া যায় আর প্রতি চুমুকেই চমৎকার।
আর বিশ্বসংসার ভুলবার জন্যেই যদি নেশা, তাহলে বলা যায়। ঐ চুমুকেই।
এক চুমুকেই তামাম দুনিয়া দুলিয়ে দেয়, ভুলিয়ে দেয়, রঙীন করে দেয় ঐ চুমুই। যা কোনো লালপানিতে কখনো পারে না।
ব্যক্তিই কি আর কস্তুই কি, প্রথম পরিচয়টা যুতসই না হলে সম্পর্কটা তেমন মজবুতসই হয় না। প্রাথমিক মদালাপটা ঐ রকমটা না হওয়ার দরুণই হয়ত পরে আমার অনেকবার পান করার সুযোগ এলেও, এমন কি শখ গেলেও, শখটা আর জমল না তেমন।
সিগ্রেটের বেলাও ঠিক এমনটাই ঘটেছিল আমার।
সেকালে রামরাম, হাওয়াগাড়ি এইসব অদ্ভুত নামের সস্তার সিগ্রেট মিলত–দু-চার পয়সা দামের প্যাকেটে। স্কুলের এক বন্ধুর পাল্লায় একবার তার এক টান না টেনেই চোমুখ কপালে উঠে, দম আটকে কাশতে কাশতে মারা যাই আর কি। তারপর এ পর্যন্ত নামী দামী উপাদেয় কতো রকমের সিগ্রেটই না বেরিয়েছে বাজারে, শুনতে পাই, বিজ্ঞাপনেও নজরে পড়ে বইকি, কিন্তু কোনো সিগ্রেটকেই আর কখনো এমুখো হতে দিইনি।
সেদিনই ধরা পড়ে গেছলাম মার কাছে।
ইস্কুলে যাবার সময় মা যেমন আদর করে ছাড়তেন আমাদের, ইস্কুল থেকে ফিরলেও তেমনিই আদর করতেন আবার।
ধরা পড়ে গেলাম সেই মুহূর্তেই-সিগ্রেট খেয়েছিস বুঝি?
হ্যাঁ মা।
আর খাসনে কখনো।
আর, ধরা পড়েছিলাম রিনির কাছেও-সিগ্রেট টানা হয়েছে বাবুর আজ?
কী করে ধরলি? হাত গুণে নাকি?
ধরতে পারি আমরা। ফের যদি তুমি সিগ্রেট খাও তাহলে আর কক্ষনো আমার খেয়ো না। আমিও আর…
আর বলতে হবে না তোকে। ও জিনিস খায় মানুষ! ছ্যা!
তবুও সে তারপরও আরো বলেছিল–সিগ্রেট খেলে আর কোনো মেয়ে তোমায় চুমু খাবে না, এক তোমার বউ ছাড়া। তাহলে তাকেও সিগ্রেট ধরাতে হবে–মনে রেখো।
আমি মনে রেখেছিলাম।
সেই চাংওয়াতেই হেমেনদার দর্শন পেয়েছিলাম প্রথম।
চাংওয়ার দুধারে দুসারি কেবিনের মাঝখানটায় টেবিল পাতা থাকত তখন। কেবিনের বাইরে তারই একটা টেবিল বেছে নিয়ে আমরা বসতাম।
সেখানে বসেই একদিন একটা কেবিনের ভেতর হেমেনদাকে দেখেছিলাম। কেবিনের পর্দা সরিয়ে বেয়ারা খাবার দিতে যাবার সময়ে নজরে পড়ল।
কে একজন চিনিয়ে দিল আমাদের মধ্যে–ঐ যে! হেমেনদা খাচ্ছেন ঐ কেবিনে।
সঙ্গে দারুণ সুন্দর দুটি মেয়ে ভাই! দেখেছ? আমি উচ্ছ্বসিত হয়েছি।
ওঁরই মেয়ে তো!
সে কি! উনি মেয়েদের নিয়ে এখানে এসে এমনি করে পানভোজন করছেন?
দোষ কি তাতে? বাড়িতে বসে মেয়েদের সামনে খেতে যদি কোনো বাধা না থাকে তাহলে…তাছাড়া, উনি একলা এসে এখানে ভালোমন্দ কতো কী খাবেন, আর ওঁর মেয়েরা তা খেতে পাবে না, ওঁর মতন মেহকাতর পিতার মনে সেটা লাগে। সেকথা উনি ভাবতেই পারেন না।
ভেবে দেখলাম, কথাটা ঠিক। ভালোবাসা সহজেই সব সংস্কারমুক্ত করে, কোনোখানেই গণ্ডী রাখতে দেয় না। আমাদের খণ্ডিত দর্শনে তাকে যতই না জটিল-কুটিলরূপে দেখতে যাই, তার মতন সহজ কিছু আর হয় না।
