জানি। বাবাকে আওড়াতে শুনেছি তো। মার উদাহরণে আমার উদ্ধৃতিযোগ : বাগর্থ যত্র সম্পৃক্তৌ বাগর্থ প্রতিপওয়ে/জগতঃ পিতরৌ বন্দে পার্বতী পরমেশ্বরৌ। বাবার মুখে বার বার শোনা কালিদাসের পদটা আওড়াই–বুঝেছি মা। কালিদাসের-পদাঙ্ক অনুসরণ করেই চলতে হবে আমাকে। কোনোকালে কালিদাস হতে পারি আর নাই পারি।
হ্যাঁ, আর তাহলেই দেখবি কৃত্তিবাসের উঞ্ছবৃত্তি করতে হবে না তোকে আর। কৃত্তিবাস পণ্ডিত কবিত্বে বিচক্ষণ/সপ্ত কাণ্ডে গাহিলেন গীত রামায়ণ। ভাঙিয়ে তোর ওই–শিবরাম পণ্ডিত এক বিচক্ষণ কবি/সাত কাণ্ডে গাহিলেন রামায়ণ সবি। এইসব ভ্যাজাল আমদানি করতে হবে না আর। তুই নিজেই এক কাণ্ড করে বসবি তখন, যদি সেই কল্পতরুর তলায় গিয়ে হাত পাতিস কেবল। ফল পড়বে টুপটাপ, দেখবি। বলেছেন না ঠাকুর-কালী কল্পতরুমূলে চারি ফল কুড়ায়ে পাবি। বলেননি তিনি?
বলেছেন তো! আচ্ছা ওই চারি ফলটা কী মা? কোনো খাবার জিনিস?
চারি ফল হচ্ছে ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ–এই চতুর্বর্গ। জানিসনে?
এর মধ্যে তোমার প্রথম আর শেষটা আমার চাইনে। ধর্মের আমি ধার ধারিনে, আর মোক্ষ? মোক্ষে আমার দারুণ অনীহা।
অনীহা-মানে? মা সচকিতই।
জানি না আমি ঠিক। ভারী ভারী প্রবন্ধে থাকে, দেখা যায়। কী মানে কে জানে, কথাটা বেশ কিন্তু। আমার রচনার খাতায় ফাঁক পেলেই লাগিয়ে দিই যেখানে সেখানে–তোমার সেই পিতাঠাকুরের মতই। বাংলার মাস্টারও বুঝতে পারেন না, হকচকিয়ে যান, তাজ্জব হয়ে থাকেন। আমি জানাই : তবে আমার ধারণা, ওর মানে হয়ত হবে, অনীহ্যাঁ, কিনা, না ইহা–এটা নয়। বাবার ঐ নেতিবাদের মতই কিছু একটা হবে বোধ হয়।
ধর্মই তো আসল জিনিস রে! ধর্ম কি ফ্যানা নাকি? ধর্ম ছাড়া কি একদণ্ডও কেউ বাঁচতে পারে?
ধর্ম-টর্ম আমার ভাল লাগে না। আমি বলি, ধর্মটা কী মা?
কর্মই হচ্ছে ধর্ম। ধর্ম কর্ম বলে না রে? যে-কর্ম তুই ধরে থাকিস আর যে-কর্ম তোকে ধরে রাখে। স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র ধর্ম সবার-সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। ভগবানের সঙ্গে আর জীবৎকর্মে যে একান্ত ব্যক্তিগত যোগাযোগ তাই হচ্ছে তোর ধর্ম। তোর যেটা কর্ম তা যদি তুই সবটা মন দিয়ে সুচারুরূপে করতে পারিস তবে সেই করাটাই ধর্ম। ধর, তুই যদি লেখক হোস তো লেখাটাই হবে গিয়ে ধর্ম তোর। কর্মও আবার।
তাই বলে মা! আমি হাঁফ ছাড়ি : বাঁচালে তুমি আমায়।
আর, মোক্ষ হলে গিয়ে, মন দিয়ে লিখতে বসলে যা তোর মনের ভেতর থেকে মুক্তি পাবে… লিখতেই বস বা কি কাউকে ভালোই বাস…তখন তোর অন্তর থেকে যা ক্ষরিত হবে–বিমুক্ত হয়ে আসবে, তাই হচ্ছে গিয়ে তোর মোক্ষ। মোক্ষ কিছু লাভ করার বস্তু নয়–মুহুর্মুহু সেটা ঘটবার। সেই আত্মমোক্ষণে তোর সঙ্গে ভগবানেরও মুক্তিলাভ। ধর্ম হচ্ছে তোর–মাকে ধরে থাকা। আর মোক্ষ হচ্ছে ভগবানের। মা-র। অহরহই সেটা হচ্ছে।
আচ্ছা, আমি যদি চাই তো তোমার ওই কল্পতরু কি গল্পতরু হয়ে ধরা দেবে আমার কাছে? আমি শুধাই, এনতার গল্প পাবো তার কাছ থেকে–চারুদার মতই। কৃত্তিবাসের গাছতলায় গিয়ে কবিতার মিল কুড়োতে হবে না আমায়। মিলটিল সব সেখান থেকেই মিলবে। আমার কীর্তি ফলছে তোমার ওই গাছেই, বলছ তো তুমি?
চেয়েই দ্যাখ না। গাছ মাত্রই তো ফলেন পরিচীয়তে–এমনকি ঐ কল্পতরুও। বেয়ে চেয়ে দ্যাখগে… বাগর্থের মতই পরাবিদ্যা আর অপরাবিদ্যা যেখানে হরিহরাত্ম হয়ে মিলেছে, সেই কালী কল্পতরুর মূলেই পাবি তুই সব।
শিবও তো কল্পতরু মা? বাবা যে আওড়ান-প্রণমামি শিম শিবকল্পতরু…শিবও তো হতে পারে মা…?
শিব দুর্গা কি আলাদা রে? এক দেহেই তো অর্ধনারীশ্বর হরগৌরী হয়েছেন।…দুর্গা স্বয়ং শিবের কাছেও কল্পতরু আবার, তা জানিস? একবার অন্নপূর্ণা হয়ে-
জানি জানি। কিন্তু পরমান্ন আমার চাইনে এখন মা! আমি এখন গল্প পেতে চাই, কবিতা পেতে চাই ঝুড়ি ঝুড়ি।
সব পাবি। কবি তোর নিজেই বলে যাননি কি?–নূতন ছন্দে অন্ধের প্রায় ভরা আনন্দে ছুটে চলে যায়/নূতন বেদনা বেজে ওঠে তায়নুতন রাগিণী ভরে/যে কথা ভাবিনি বলি সেই কথা/যে ব্যথা বুঝিনে জাগে সেই ব্যথা/জানি না এনেছি কাহার বারতা/কারেশোনাবার তরে। ওগো রহস্যময়ি! আমি যে-কথাটি/কইতে চাইছিকিহিতে দিতেছ কই?/পড়িসনি ছেলে-চারুর চয়নিকায়?
— পড়েছি তো। মানে বুঝেছিলাম, কিন্তু মর্ম বুঝিনি তখন।
এই রহস্যময়ীটি কে বল দেখি?
জানিনে বুঝি? মা-ই তো, আবার কে? তোমার মা আমার মা সবার মা।
আমার কথায় হাসতে থাকেন মা-সেই হাসির আড়ালে সর্বময়ীকেই…সবার মার হাসিটি দেখা যায় না কি!
.
২৬.
আমাদের গতিবিধির বৃত্তান্ত শুনবেন তাহলে নিতান্তই? জনাব সাহেবের প্রতি কৃপাকটাক্ষ করে শুরু হয় আমার : কিন্তু শুনলে আপনি হতাশ হবেন, আমি বলছি। কেননা, মানুষের আশা কখনই পুরোপুরি মেটে না–যে গতিবিধি করে তারও যেমন নয়, যে তার ইতিবৃত্ত চায় তারও তেমনটা। তাছাড়া মানুষ স্বভাবতই দ্বিধাগ্রস্ত, জানেন তো? আর এই লেখক-শিল্পী গোত্রের কেবল দ্বিধা নয়, শতধাই বলা যায়। দেহ মন নিয়ে শতদিকে সতত তাঁরা ধাবমানকে তার সন্ধান রাখে, কেই বা কাকে তা দিতে পারে! তাহলেও শুনুন, গোড়াতেই বলে রাখছি কিন্তু…গতিবিধি বলতে যা বোঝায় তা ঠিক হয়ত হবে না। বিধিমত গতি তাকে বোধহয় বলা যায় না কিছুতেই।
