মাকে ভাগ দিয়ে পেলেই, মাতৃভাগ্যে এলেই তো সার্থক হয়, সম্পূর্ণ হয় সেই ভালোবাসা। মা কন, মার প্রসাদ পেলেই তো স্বাদ মেলে, সাধ মেটে।
তবে তুমি যে বলছ মা, ভালোবাসা কোনো বৃত্তি হতে পারে না–বৃত্ত হতে পারলেও। ওটা আমাদের স্বাভাবিক বৃত্তিই নাকি–নিশ্বাস প্রশ্বাসের মতই। তাই তুমি বলছ তো? তোমার মতে কর্ম না হলে কোনো বৃত্তি হবে না, কিন্তু ভালোবাসা তো কর্ম হতে পারে না কর্মই নয়…। বলে আমার স্বগতোক্তি শুনি এবং কর্ম হলেও তো ঈষৎ কর্ম। সৎ কর্ম কিনা। কে জানে! আর তা যদি কোনো বিদ্যাই হয়, সুন্দর বিদ্যাই। (ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর আমার মনে পড়ে যায়। আর বৃত্তি হলে তো আনন্দবৃত্তি। কিন্তু কর্ম ও কর্ম বলতে যা বোঝায়, এক সঙ্গে হাত পা মাথা খাটিয়ে ডাকিনী-যোগিনীর সহায়তায় রুধির উপায়-রুধির বুলতে টাকাকড়িও বোঝায় নাকি আরার-মাই একবার বলেছিলেন আমায়-একাধারে নেশা আর পেশা সেই ভালোবাসা তা নয় তো! কাউকে ভালোবেসে কি টাকা উপায় করা যায় কখনো? গেলেও সেটা সদুপায় বলে গণ্য হয় না নিশ্চয়, নিতান্তই তা গণিকাবৃত্তি বটে। মনে মনে মাথা ঘামিয়ে এই সব আলোচনার পর নিজের মুখপটে প্রকট হই–কিন্তু তোমার ওই লেখা-টেখাটা বৃত্তি হবে কি করে বলো? সে কর্মে তো টাকা উপায় করা যায় না মোটেই?
কে বললে যায় না? তবে তেমনটা হয় না হয়। কিন্তু জীবনের সব দুঃখ দূর হয় না বোধ হয়–কিন্তু জীবনে তো দুঃখ রয়েছেই, বড়লোকেরও আছে, গরীবদেরও আছে তবে যারা শিল্পকলা নিয়ে থাকে, আপন ছন্দে চলে, একরকমের জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য তারা পায় বইকি–সেটা কি কিছু কম?
না, সেটা ছন্দ নয়। আমি ঘাড় নাড়ি– আর চারুদা তো লিখেটিখেই সংসার চালায়। চালায় না মা?
চালায় বই কি! লেখাটাই যদি তোর পেশা করিস তত মাকে স্মরণ করে লিখতে বসলেই…
মনটা গোড়ায় মাকে দিয়ে তারপর তো লেখায় দিতে হবে মা? গোড়ার থেকেই তো আগাতে হয় আমাদের।
হ্যাঁ, তাহলেই দেখবি তোর লেখাটেখা কেমন আপনার থেকেই হয়ে যাচ্ছে যেন। নিজের বেগে বয়ে চলেছে। কোত্থেকে সব কথা আসছে যে! লাইনকে লাইন কে যেন লিখে দিচ্ছে তোর হয়ে…..কত আইডিয়াই যে আসছে তোর মাথার থেকে, ভেবেই পাবিনে। তর তর করে লিখে যাবি তুই।
তাই নাকি মা?
তবে ওই যে বললি, গোড়ার থেকে আগাতে হয়– উল্টোপাল্টা কথা কইলেও কথাগুলো তোর আলতুফালতু না–একেক সময় তার একটা মানে হয় বেশ। কিন্তু আমার ভয়ও হয় সেই সঙ্গে আবার।
কিসের ভয় মা?
তুই যেরকম শব্দের মোহে পড়েছিস না? তার থেকে, ভয় করে এর পরে হয়তো তুই অর্থের মোহে পড়বি নির্ঘাত টাকাকড়ির লালসায় ছুটবি। শব্দ থেকে আর এক পা এগুলেই তো অর্থ। অর্থের জন্য আরেক ধাপ এগুলেই অনর্থ। অনর্থে না পড়ে যাস তুই শেষটায়–সেই ভয়। তবে ভরসা এই, মা-ই তোকে সব অনর্থ থেকে সব সময় সামলে রাখবেন-বাঁচাবেন তোকে সব সময়।
নিশ্চয় নিশ্চয়। আমিও মাকে ভরসা দিই : এখন তুমি গোড়াতেই যে কথাটা বলছিলে … বলে অন্য কথায় গড়িয়ে যাই। শুধুই যে শব্দের মোহে পড়িনি, শব্দের মতন রূপ রস গন্ধ স্পর্শ সব কিছুর মহিমাতেই আমি কাতর, তার দৃষ্টান্ত মার কাছে তুলে ধরিনে আর।
গোড়ার কথা হচ্ছে মা-ই। সবের গোড়ায়–সব কিছুর গোড়াতেই। মার গুঁড়ি ধরেই উঠতে হবে আমাদের।
গোড়াগুড়িই মা? আগাতেও সেই মা-ই আবার? আমার বাগাড়ম্বর-মা আমার ফলেও আছেন ফুলেও রয়েছেন।
হ্যাঁ, মার বোধন করেই আমাদের সব কাজের উদ্বোধন। মাকে ডাকার সাথে সাথেই মার সাড়া পাওয়া যায়-মাতৃসম্বোধনের সঙ্গে সঙ্গেই তোর বোধোদয়-বুঝেছিস? সম্বোধতে কী হয়? প্রথমা। প্রথমা-ই তো? পড়িসনি তোর উপক্রমণিকায়? সব কাজের উপক্রমেই তাই। মা-ই। তিনিই তো এই বিশ্বের আদ্যাশক্তি–প্রথমতমা–তাই প্রথমা। তাই উপক্রমণিকার সম্বোধনেও স্বয়ং তিনিই। আর, সম্বোধনের সাথে সাথেই তাঁর সঙ্গে তোর সম্বন্ধ স্থাপিত। সম্বন্ধে ষষ্ঠী। আর তার পরেই কিনা পরস্পরের প্রতি অধিকারবোধ জাগ্রত-মার তোকে আর তোর মাকে অধিকরণ। অধিকরণে সপ্তমী। আর তার পরেকার ব্যাপার হল গিয়ে তাদের দুজনের সন্ধি-তুই তাঁর বাহন সিংহ হলেও–কি, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী অসুর হলেও– সেই অষ্টমীতে।
তারপর? আমার প্রশ্ন। সন্ধিপূজার পর?
তারপরই নবমী। তোর নবীকরণ-নবরূপান্তর। আর সবশেষে তোদের নিরঞ্জন-মার মধ্যে তোর আর তোর মধ্যে মার। আমাদের জীবনের প্রতি মুহূর্তের মাতৃপূজার এই-ই নির্ঘন্ট।
ওব্বাবা কটমট ওই ব্যাকরণের মধ্যেও আবার সেই ভগবান? আমি হাঁ হয়ে যাই। সেটাও তোমার গিয়ে দর্শন শাস্ত্র?
আমাদের সব কিছুই দর্শনভিত্তিক। আমাদের সঙ্গীত, আয়ুর্বেদ, জ্যোতিষ, ব্যাকরণ –সব। আর দর্শন মাত্রেই ভগবদ্দর্শন। ভগবানকে দেখা–তাঁর মূলে এবং তাঁর মায়ায়–তস্মিন দৃষ্টে পরাগরে–সেই পরে তাঁতেই–আর এই অপরে–আর সবকিছুতে। কথাটা পরাবরেও হয় মতান্তরে–এখানে পর হলো তিনি আর আবর হচ্ছে তাঁর মায়া–এই বিশ্বসৃষ্টির আবরুল। এই উভয়ের মধ্যেই, সর্বত্র, সব ক্ষেত্রে তাঁকে দেখাটাই হচ্ছে সত্যিকারের দেখা। এবং সেই কথাটাই আমাদের সব শাস্ত্রে, সব মহাকাব্যে। এবার যা বলছিলাম… মা আবার তাঁর গোড়ার কথায় আগান; তত্ত্বব্যাখ্যার পর মার দৃষ্টাতের আখ্যান : মহাকবি কালিদাসও তাঁর কাব্য রচনার আদিতে পার্বতী পরমেশ্বরের বন্দনা করেছিলেন…।
