যে কোনো কাজ?
হ্যাঁ, যে কোনো কাজ। কাজটা বড় কথা নয়, কাজের ভেতর ভগবানের দেখা পাওয়াটাই আসল। তিনিও যে তোর কাজে তোর সঙ্গে হাত লাগিয়েছেন, হাতে হাতে ছোঁয়াছুঁয়ি হচ্ছে, হাতে হাতে তার প্রমাণ পাবি, তুই চলেছিস আর তোর সঙ্গে তিনিও চলেছেন সাথে সাথে, পদে পদে টের পাচ্ছিস সেটা–মুহূর্তে মুহূর্তে তার পরিচয় পাবার জন্যই তো আমাদের জন্মানো, এই বেঁচে থাকা, আমার আমি হয়ে ওঠা–সম্পূর্ণ হয়ে ওঠা। এই পুনঃ পুনরাবৃত্তি। জন্মে জন্মে এই অমৃতমতে। এই অমরত্ব।
আমি কাজে লাগলেই আরেকজন অলক্ষ্যে আমার কাজে এসে হাত লাগাবে, বলছ তুমি? আমি কই, সমক্ষে সেই প্রমাণ পাবো?
পাবি বইকি। ভেতর থেকে তিনি তো আসবেনই, বাহির থেকেও আসবে কতজনা তোর সাহায্যে এগিয়ে–তাদের মধ্যেও সেই তিনিই। বিরাট কর্মীদের বড় বড় কাজ সব এই করেই তো হয়েছে রে!
আমি বাইরের লোকদের কথা ভাবছি না মা, আসুক না আসুক, বয়েই গেল আমার। আমি ভাবছি ভেতরের…
নিশ্চয়। ঠাকুর কি তবে মিছে কথা কয়েছেন নাকি? বলেননি যে, একজন ধান মাপতে বসলে আরেকজন তার পাশে বসে ধানের রাশ ঠেলে দিতে থাকে–বলেননি তিনি?
হ্যাঁ, বলেছেন তো। তুমি বলছ এই রাশলীলা সেই ভগবানের?
বলছি কি তবে? রামপ্রসাদ যখন নিজের ঘরের বেড়া বাঁধতে লাগলেন তখন ভেতর থেকে তাঁর হাতের কাছে দড়ি যুগিয়ে দিচ্ছিল কে? তিনি কাজটায় লাগলেন বলেই না ভেতরের যোগান পেলেন? এই বাগানদারিটা কার? আবার তিনি যখন নিজের গান বাঁধতে বসলেন তখন সেই গানের ধুনিও কে তাঁকে যোগালো বল্ দেখি?… ঠাকুর কি কখনো মিছে কথা কন?
আবার রবিঠাকুরের বেলাতেও এরকমটা ঘটেছিল মা। রিনি সেদিন একটা গান গাইছিল, শান্তিনিকেতনে শেখা…শুনবে? তার মতন অমন মিষ্টি সুর বার করতে পারব না আমি, তবে কথাগুলো কোনোরকমে ছন্দ করে বলতে পারি
আমার এ গানের তরী ভাসিয়েছিলাম/চোখের জলে
সহসা কে/এলে গোকে এলে গো/সে তরী বাইবে বলে…
রিনি গাইছিল তাই আমার মিষ্টি লাগছিল, কিন্তু গানটার মানে আমি একদম বুঝতে পারিনি, তোমার কথায় বুঝতে পারছি এখন।
সেই একই মানে। কবি যখনই না সুরধুনীর স্রোতে নিজের নৌকো ভাসিয়েছেন, দেখেছেন যে, আরেকজন এসে তাঁর পাশে বসে দাঁড় বেয়ে চলেছে তাঁর সঙ্গে। গীত রচনাই ছিল তাঁর বৃত্তিতে, নিজের বৃত্তিতে তিনি প্রবৃত্ত হলেন বলেই না … গানের পথে পা বাড়াতেই সঙ্গীতের সঙ্গী এসে হাত মেলালেন তাঁর সঙ্গে …এত সুর, এই অফুরন্ত গান কি একজনের কাজ! বলে মা গুনগুন করে সুর ধরলেন তারপর…পথিক, তুমি পান্থজনের সখা হে,/পথে চলা, সেই তো তোমার পাওয়া/যাত্রাপথের আনন্দ গান যে গাহে/তারই কণ্ঠে তোমারই গান গাওয়া…
তাঁর গানে সেই একই কথা মা এখানেও। আমি সায় দিলাম মার কথায়। সত্যি মা, এত গান, এত রকমের গান কখনই একজনের সৃষ্টি নয় সত্যি। এত কাজ একজনের পক্ষে সম্ভব হয় না।
একজনৈর জন্যে কি হয় কিছু কখনো? গাহিতে হবে দুইজনে। পরাবিদ্যায় গায়ক গাইছেন পরমাত্মার সঙ্গে। আর অপর বিদ্যমানতায় এক শ্রোতার জন্য–তার সঙ্গেই। তাকেই বলে গানের সঙ্গত।
নইলে গান গাওয়াটাই অসঙ্গত। তাই না মা? বলে আমি মার উল্লেখিত কবিতাংশটা আজড়ে নিজের স্মৃতিশক্তির পরাকাষ্ঠা দেখাই-কেবল গায়কের নহে তো গান, গাহিতে হবে দুইজনে/একজন গাবে ছাড়িয়া গলা আরেকজন গাবে মনে।
— হ্যাঁ। তেমনি তুই যদি কখনো কবি হোস…কবি হতে চাস নাকি তুই? তাহলে তোর বেলাও এমনটা ঘটবে দেখবি। রবিবাবুর মতন অত বড় অঘটন হয়ত ঘটবে না, শতদল পদ্ম যেমন তার একশ দলে বিকশিত হয়ে ওঠে তা হয়তো হবে না তোর বেলায় আমার মনে হয় এটা। যার যেমন আধার। না হোক, দুচার দলের ফুলের মতন ফুটতে পারবি তো তুই-তাতেই তুই সম্পূর্ণ হবি, সার্থক হবি।
হলে তো মা! মার কথার পিঠে আমি দীর্ঘনিশ্বাস পাড়ি হওয়াই যাচ্ছে না যে।
হবেই। না হয়ে যায়? ঠিক প্রবৃত্তিটির বৃত্তে তুই এক-পা এগুলেই দেখবি, মা দুপা এগিয়ে এসেছেন, সাথী হয়েছেন তোর পথযাত্রায়, তুই দুহাত বাড়ালেই মা দশ হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিয়েছেন তোকে। দেখবি তুই।
কবিতা লেখা, গল্প লেখা কি কারো বৃত্তি হতে পারে মা? আমি শুধাই।
কেন হবে না? যেখানে পরাবিদ্যায় আর অপরাবিদ্যায় মিলেছে, মাকে ডাক দিয়ে পাচ্ছিস, মার কাছ থেকে আসছে, আর অপরের যোগে প্রকাশিত হচ্ছিস-ডাকিনী আর যোগিনী, মার দুই সখি এসে মিলেছেন যেখানে, সেখানেই আমাদের বৃত্তি, সেই আমাদের বৃত্তপথ-সেইখানেই আমরা প্রবৃত্ত। যেখানে যেখানে এমনটা হয় মার সেখানে এই ছিন্নমস্তারূপ–নিজের কণ্ঠের রুধির ধারা নিজে পান করছেন, পান করাচ্ছেন তাঁর ডাকিনী যোগিনীদের।.সেই ত্রিবৃত্ত এসে মিলেছে যে পথে–সেইখানেই। কোথায় কোথায় এমনটা হয় রে?
কোথায় হয় কে জানে! তুমিই জানো আর মা-ই জানেন।
সঙ্গীতে হয়, সেখানে মা নিজের সুর নিজে শোনেন, যে সেই সুরঙ্গমাকে ডাকে, ডেকে আপন গলায় আনে-সেও শুনতে পায়, আর পায় বিশ্বজন সবাই-তার শ্রোতারা-সেই সুরধুনীতে স্নান করে ধন্য হয় যারা। ডাকিনী আর যোগিনী হল না? মা একটুখানি থামেন : লেখাটেখার বেলাতেও তো তাই হয়ে থাকে, তাই না?
আবার ভালোবাসার বেলাতেও বোধ হয় তাই মা। ভাবলে, প্রায় সঙ্গীতের মতই সন্তুরাগ সমন্বিত সেটাও। কিন্তু সঙ্গদোষে দুষ্ট সেই পঞ্চম ম-কার মার সম্মুখে উচ্চারণ করতে বাবে আমার। একটু ঘুরিয়েই বলি-তাতেও মা একজন ডাক দেয়, আরেকজনা যোগ দেয়, আর মা তাদের মাঝখানে থেকে মিলিয়ে দেন দুজনাকে। প্রায় তাই হল না মা? আমার পুনশ্চ যোগ হয়–মা-ও তো সেই ভালোবাসার ভাগ পান, পান নাকি?
